Published : 06 Jun 2026, 12:19 PM
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগের সরকারের আমলের ‘চুরি, পাচার ও অলিগার্কদের সুবিধা দেওয়ার’ নীতির দায় বর্তমান সরকারকে ‘বহন করতে হচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে শনিবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ আগে নেওয়া হলে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হত না।
তিনি বলেন, “আমরা যদি আমাদের এখান থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণের দিকে তাকাই, আমরা যদি আমাদের ইনফরমাল ইকোনমির সাইজের দিকে তাকাই, তাহলে এই ৪১ হাজার কোটি টাকা কিছুই না। এই অপরাধগুলো করে যারা দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, সেই অপরাধের বোঝাই এখন বহন করতে হচ্ছে।”
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকায় সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে তথ্য উপদেষ্টা ও তথ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে।
সেখানে বলা জয়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও আগামী অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, বিইআরসি সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও সরকার আপিল করে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের আগের মূল্যহার বহাল রেখেছে।
তিনি বলেন, “এই গ্রাহকের সংখ্যা হচ্ছে ৬৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুতের বেশি যে মূল্য আছে সেটা তারা দেবেন না।”
জাহেদ বলেন, শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহক এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি।
“সবচেয়ে ভালনারেবল যে মানুষগুলো আছে, তাদের পাশে সরকার দাঁড়িয়েছে।”
জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের প্রসঙ্গ টেনে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিবেচনায় ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
“ডিজেলের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। আন্তঃজেলা বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ গণপরিবহনের বড় অংশ ডিজেলে চলে। ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি হয়নি।”
তিনি বলেন, অকটেন ও পেট্রোল তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত যানবাহনে ব্যবহৃত হয়। সে কারণেই মূল্য সমন্বয়ে সরকার ভিন্ন পন্থা নিয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার একদিন পর নিম্ন ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে জাহেদ বলেন, বিইআরসি একটি স্বাধীন ও আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান।
“বিইআরসি তো একটা কোয়াজি জুডিশিয়াল প্রসেস। ওটা সরকার না, ওটা একটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তারা শুনানি করেছে, তাদের কাছে মনে হয়েছে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা দরকার।”
তিনি বলেন, সরকার পরে মনে করেছে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য সুরক্ষা প্রয়োজন। সে কারণেই আপিল করে তাদের মূল্যবৃদ্ধির বাইরে রাখা হয়েছে।
সরকার একমাত্র বিদ্যুৎ বিক্রেতা হওয়ায় মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় শুনানি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই বিইআরসি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন করেন তিনি।
উৎপাদন ও শিল্প খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ পড়বে কী না, এমন প্রশ্নে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, কিছু প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে তিনি বলেন, “মূল্যবৃদ্ধির একটা প্রবণতা তো আছেই। কিন্তু ভালনারেবল মানুষদের জন্য আমাদের সোশ্যাল সেফটির প্রোগ্রামগুলো আছে।”
তিনি জানিয়েছেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ, আইপিপি চুক্তি ও অতীতের কাঠামোগত সমস্যার বিষয়ে প্রশ্নে জাহেদ বলেন, পুরো ব্যবস্থা কয়েক মাসে বদলে ফেলা সম্ভব নয়।
“সিস্টেমটা বিদ্যুতে দাঁড়িয়েছে। এটা তিন মাসে একেবারে চেঞ্জ বা সিগনিফিকেন্ট চেঞ্জ করা যাবে না। আপনি যদি সিস্টেমটাকে ডিসরাপ্ট করেন, দেখা যাবে তার কয়েক গুণ বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অফশোর বিডিং এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
“কিছু অলিগার্ককে সুবিধা দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর করে রাখা হয়েছিল। আমরা অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করেছি, অনশোরেও কাজ হবে। একই সঙ্গে সোলার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।”
ঈদের সময় গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
“এটা আমরা খোঁজ নেব। বিদ্যুৎ বিভাগের কেউ থাকলে তারা আরও ভালো জবাব দিতে পারতেন। আমি এটা নোট করছি।”
তথ্যমন্ত্রী বলেন, “বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে দুর্নীতি, লুটপাট ও অলিগার্কদের প্রভাব তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসাটা সময়সাপেক্ষ। একটা দুর্নীতিগ্রস্ত দীর্ঘমেয়াদি অপরাধী ও দুর্নীতি চক্র, অলিগার্কদের কাছ থেকে এই খাতকে বের করে এনে ধীরে ধীরে সুস্থ জায়গায় আনতে হচ্ছে। একদিকে বর্তমান সংকট সামাল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কাজ করতে হচ্ছে।”
সরকার প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিষয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।