Published : 23 Dec 2025, 08:56 PM
শতাধিক গুম-খুনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে আগামী ৪ জানুয়ারি।
বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মঙ্গলবার এ দিন ঠিক করে দেয়।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। তিনি এ মামলায় জিয়াউলকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের পাশাপাশি অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানির জন্য সময় চান।
পরে তার আবেদন মঞ্জুর করে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে আগামী ৪ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানি রাখা হয়।
এ সময় ট্রাইব্যুনালের প্রথম সদস্য মো.শফিউল আলম মাহমুদ হেসে হেসে বলেন, “আপনারা আমাদের হ্যাপি নিউ ইয়ারও পালন করতে দেবেন না।”
তখন প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম হাসির ছলে বলেন, “মাই লর্ড, হ্যাপি নিউ ইয়ার না হয়ে আবার হ্যাপি জানাজা না হয়ে যায়।”
এর আগে টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডায় এজলাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
পরে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী সাংবাদিকদের বলেন, “শতাধিক গুমের অভিযোগে একটি মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে আগামী ৪ জানুয়ারি। এই মামলায় আজ তাকে কোর্টে প্রডিউস করার তারিখ ছিল। তাকে কোর্টে হাজির করে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।”
সকালে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় গত ২১ ডিসেম্বর জিয়াউলকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার কথা ছিল। কিন্তু কারাগারে আদেশ না পৌঁছানোয় তাকে হাজির করতে পারেনি কারা অধিদপ্তর। এতে ওইদিন ট্রাইব্যুনাল ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং মঙ্গলবার হাজির করার নির্দেশ দেয়।
গত ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১।
ওইদিন শুনানিতে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, “জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ১০০-এর বেশি মানুষকে গুমের পর হত্যার প্রমাণ পেয়েছি আমরা। তিনিসহ তার অনুগতদের কাজই ছিল রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষকে গুমের পর বিভিন্নভাবে হত্যা করা। এসব হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে নাটক মঞ্চায়ন করতেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। এসব বাস্তবায়নের মাস্টারমাইন্ড বা মহানায়কও ছিলেন তিনি।”
বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান সবশেষ টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে রদবদলের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৬ অগাস্ট তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে ১৬ অগাস্ট তাকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ।
প্রথমে তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হকার শাহজাহানকে হত্যার অভিযোগে ঢাকার নিউ মার্কেট থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গতবছর ১২ নভেম্বর তাকে জুলাই-অগাস্টের হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সেদিন বলেছিলেন, “বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ও গুমের সাথে তার সম্পৃক্ততা। আমাদের তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছে।”
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার ছিলেন। ২০০৯ সালে মেজর থাকাকালে তিনি র্যাব-২ এর উপঅধিনায়ক হন।
ওই বছরই তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন এবং র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান। র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই জিয়াউল আহসান হয়ে উঠেছিলেন সংবাদমাধ্যমে পরিচিত নাম।
কর্নেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক করে তাকে র্যাবেই রেখে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে জিয়াউল আহসানকে পাঠানো হয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালকের দায়িত্বে।
পরের বছরই এনটিএমসির পরিচালক করা হয় জিয়াউল আহসানকে। ২০২২ সালে সংস্থাটিতে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টির পর তাকেই সংস্থাটির নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেনের’ অভিযোগে জিয়াউল আহসান এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুদক।
দুদকের আবেদনে ঢাকার জজ আদালত জিয়াউল আহসানের তিনটি ফ্ল্যাট, পাঁচটি বাড়ি ও প্রায় ১০০ বিঘা জমি জব্দ এবং তার নয়টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করারও আদেশ দিয়েছে।