Published : 17 Nov 2025, 08:41 PM
নির্বাচন কমিশন দৃঢ়তা দেখাতে পারিনি দাবি করে সংলাপের তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় পর্বে মতবিনিময়ে বসা রাজনৈতিক দলগুলো বলেছে, এই কারণে সাংবিধানিক সংস্থার স্বাধীনতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
দলগুলোর মতে, এমন নির্বাচন কমিশন-ইসির অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে ‘সংশয়’ রয়েছে।
সোমবার দুপুরের পর্বে জাকের পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, খেলাফত মজলিস ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার প্রতিনিধিরা ছিলেন।
তাদের দিক থেকে আচরণবিধির যথাযথ প্রয়োগ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এর অপব্যবহার রোধে এখন থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এসেছে।
ইসির সমালোচনা কম করার আহ্বান জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বলেছেন, নানাবিধ ‘প্রতিকূলতার’ মধ্যেও সফলভাবে প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন; তাদের নিয়ত ‘পরিষ্কার’। সবার সহযোগিতা পেলে ভালো নির্বাচন সম্ভব হবে।
অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের ধারাবাহিকতায় তিন দিনে দুই পর্বে মতবিনিময় করেছে ইসি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপে বুধবার বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ আরও ১২ দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এ পর্যন্ত চার দিনে ৪৮ দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইসি।
নানা প্রতিকূলতায় এগোচ্ছি: সিইসি
সোমবার সংলাপের দুপুরে পর্বে স্বাগত বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, “অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সব ভেঙ্গে বলার দরকার নেই, নানাবিধ প্রতিকূলতা।”
ধীরে ও ধারাবাহিকতার নীতি অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছেন দাবি করে সিইসি বলেন, “সফলভাবে এগোতে পেরেছি এ পর্যন্ত। জাতিকে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
ভোট প্রস্তুতির অগ্রগতি তুলে ধরে নাসির উদ্দিন বলেন, প্রবাসীদের ভোটগ্রহণ করা বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের। ইসি একটি লাগসই মডেল করেছে। সেই সঙ্গে দেশের ভেতরে তিন ধরনের ব্যক্তিদের ভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে পোস্টাল ব্যালটে।
“আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই, আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। সব ধরনের চ্যালেঞ্জ আন্তরিকতা, ধৈর্য্য সাহসের সাথে মোকাবেলা করছি। ভবিষ্যতেও মোকাবেলা করতে প্রস্তুত রয়েছি। এক্ষেত্রে দলগুলোর সহযোগিতা দরকার। ভোটের আগে, ভোটের দিন ও ভোটের পরেও সহযোগিতা নিয়ে এগোতে হবে।”
তিনি বলেন, ভোটারদের উপর দলের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। ইসির পক্ষ থেকে সভা, সেমিনারসহ নানা উদ্যোগ থাকবে। পাশাপাশি দলের সহযোগিতা তৃণমূলেও প্রয়োজন।
‘ইসি স্বাধীন নয়’
জাকের পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার বলেন, “এত সুন্দর আচরণবিধির উপর আস্থা রাখতে চাই আমরা। যত ধরনের নির্বাচনি আইনকানুন করি না কেন, ভোটের মাঠে তফসিল ঘোষণার পর বড় দল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করলে দুটি উপাদান মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কালো টাকার প্রভাব ও পেশীশক্তির দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে।”
সত্যিকার অর্থে বিতর্কমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে যে কোনো মূল্যে কালো টাকার প্রভাব বন্ধ করতে হবে; তা না পারলে তামাশার নির্বাচন হবে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব আব্দুস সামাদ বলেন, “দেশ শুধু নয়, পৃথিবীর মানুষ নির্বাচনের দিকে চেয়ে রয়েছে। বিতর্কমুক্ত নির্বাচন আশা করি। ভালো নির্বাচন জাতিকে হতাশামুক্ত করবে, মুখ উজ্জ্বল করবে।”
ইসির স্বাধীনতা, কৌশল যত মজবুত হবে প্রায়োগিক দিক থেকে ভালো হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এখনও ইসির ‘স্বাধীনতা প্রমাণের’ সময় রয়েছে।
সামাদ বলেন, “ইতোমধ্যে দেখেছি, (ইসি) আজ একটা সিদ্ধান্ত নেন, বিশেষ করে একটি দলের প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে; কিন্তু দেখলাম ওনারা ওনাদের অবস্থান ঠিক রাখতে পারেনি। এতে ইসির স্বাধীনতা, দৃঢ়তা প্রশ্নবদ্ধ হয়েছে।

“ইসি স্বাধীন নয় বুঝতে পেরেছি, ইসি স্বাধীন না হলে জাতির কাছে সে নির্বাচন জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না,” বলেন মহাসচিব।
সবক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার আহ্বান জানান তিনি।
জাগপার সহ সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, “জোটবব্ধ নির্বাচন করলেও নিজ প্রতীকে ভোট করার বিধান সাহসী সিদ্ধান্ত হয়েছে ইসির।”
জামানাত কমানো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার বন্ধ ও মনিটরিং টিম গঠনের দাবি জানান তিনি।
তফসিল ঘোষণার দিন থেকে যৌথ বাহিনীকে মাঠে রাখার দাবি জানান খেলাফত মজলিশের যুগ্ম মহাসচিব মুনতাসীর আলী।
তার মতে, নির্বাচনের তিন দিন আগে সেনা মোতায়েন ও ইউনিয়নে একটি করে ক্যাম্প রাখলে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। কালো টাকার প্রভাব বন্ধে প্রত্যেক জেলা উপজেলায় ইসির নিজস্ব গোয়েন্দা টিম রাখলে ভালো হবে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ আচরণবিধিতে সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে দাবি করে বলেন, আইন ও আচরণবিধি ইসির কর্মপরিকল্পনা আরও স্পষ্ট করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় বহন না করলেও অনুদান নেওয়া বন্ধ রাখায় সমালোচনা করেন তিনি।
এআই এর অপব্যবহার শুরু হয়ে গেছে তুলে ধরে তার শিকার হওয়ার বিষয়ে ফুয়াদ বলেন, “পর্নগ্রাফি থেকে শুরু করে হেন কোনো বাজে কাজ নেই যা আমার নামে ছড়ানো হচ্ছে না। কীভাবে করবেন (বন্ধ)? কিছু একটা করে দেখান না। আপনি যদি এটা এখনই করতে না পারেন, আমি আস্থা পাবো কীভাবে।”
নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, “সব দলের লোকেরা এটা প্রচার করছে। মোবাইলে নিয়ে নিয়ে চায়ের দোকানে গ্রামবাসীকে দেখাচ্ছে, দেখায় ওই যে টাক আছে না? টাকলু, এসেছে কত ভালো ভালো কথা বলে, কী করে দেখ। দোকানে দোকানে গিয়ে এখনই দেখাচ্ছে।”
কৃত্রিম বুদ্ধি বা এআই ব্যবহার করে এমন অপতথ্য ছড়ানো কীভাবে বন্ধ করবে ইসি, এই প্রশ্ন রেখে তিন বলেন, কয়টা চায়ের দোকানে যাবেন। এ চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করবেন।
এআই গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে তুলে ধরে ফুয়াদ বলেন, ব্যবস্থা নেওয়ার কথা যত সহজে লেখা হচ্ছে, বাস্তবতার সাথে এর অনেক পার্থক্য।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি-বিডিপি চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সংসদ ও গণভোট একসাথে হচ্ছে। একসাথে দিলে ‘হ্যাঁ’/‘না’ ভোট খালি আসবে বলে ধারণা করেন তিনি।
‘সহযোগিতা করলে আলহামদুলিল্লাহ, অসহযোগিতা করলে ইন্নালিল্লাহ’
নির্বাচন কমিশনার মো. আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ৫ অগাস্ট ও আগে লুট হওয়া বা খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারের কাজ চলমান উদ্ধার চলমান রয়েছে। তফসিলের পর থেকে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী নিয়োজিত থাকবে মাঠে।
১৮ নভেম্বর ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নিবন্ধন অ্যাপ উদ্বোধনের কথা তুলে ধরেন তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার, মিথ্যা তথ্যের বিষয়ে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “ভালো তথ্য দিয়ে খারাপ তথ্যকে মোকাবিলা করতে হবে। যেসব চিহ্নিত করতে পারবো তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। মিথ্যা তথ্য শেয়ার করবেন না, সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের দিক থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
নির্বাচনী আইন-বিধির নতুন নতুন দিকগুলো তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “আমরা যে পারি-সেটার জন্য আমরা দলের সঙ্গে বসেছি। আপনাদের আচরণবিধি অনুসরণে সহযোগিতা করতে হবে। আচরণবিধি প্রতিপালনে আমরা কঠোর ভূমিকা যাবো, কাউকে ছাড় দেব না। তফসিল ঘোষণার পরে কঠোর হবো, অন্যায়ের ক্ষেত্রে আমরা চিনবো না।”
নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, “গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার অক্ষমতার কথা বলি। অক্ষমতাটা কোথায়? আপনাদের অসহযোগিতা। আপনার সহযোগিতা করলে আলহামদুল্লিাহ! আর অসহযোগিতা করলে ইন্নালিল্লাহ।
“গোটা জাতি একাট্টা থাকলে, গোটা জাতি চাচ্ছে নির্বাচন সুন্দর হোক। আশা করি, সবাই তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, আমরা পারবো ইনশাহআল্লাহ। আপনারা সহযোগিতা করবেন।”
‘বেশি সমালোচনা করবেন না’
দলগুলোর নানাধরনের প্রশ্নের প্রসঙ্গ ধরে সমাপনী বক্তব্যে সিইসি বলেন, “তফসিল ঘোষণার পর অনেকগুলো পরিপত্র জারি হবে, সব বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে।…সব কিছু মিলিয়ে আমাদের প্রস্তুতি, সীমাবদ্ধতার মধ্যে চেষ্টার ত্রুটি নেই। মুখে যা বলছি তা-ই নিয়ত। সবাইকে নিয়ে নিয়ত পূরণ করতে পারবো। আল্লাহ তাআলা সাহায্য করবেন, যেহেতু আমাদের নিয়ত সাফ। সবার সহযোগিতা চাই।”
ইসির সমালোচনা কম করার অনুরোধ জানিয়ে সহাস্যে সিইসি বলেন, “আমাদের বেশি সমালোচনা করবেন না। যেটুকু ভালো কাজ এটুকু প্রশংসা করবেন। ব্যারিস্টার ফুয়াদ সাহেবেরে যে বাক্য টকশো তে দেখি, এটা তো মানুষকে বুলেটের মতো বিদ্ধ করে।
“আশা করি, আপনি আমাদের একটু প্রশংসা করবেন ইনশাহআল্লাহ। আমাদের সীবাদ্ধতা, ত্রুটি থাকতে পারে এটা অনিচ্ছাকৃত। সবার সহযোগিতা চাই।”
আরও পড়ুন:
রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা না পেলে ভোট 'প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে': সিইসি