Published : 01 Jul 2026, 12:03 AM
দেশি বিদেশি ২০ জনকে হত্যার মধ্য দিয়ে বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া হোলি আর্টিজান হামলার ঘটনার ১০ বছর পূর্ণ হল।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে একদল তরুণের সেই নৃশংসতার ঘটনায় পুরো বিশ্ব তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশের দিকে। তাদের দমনে নামানো হয়েছিল সেনাবাহিনী।
রাজধানীর গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িটি হোলি আর্টিজান বেকারি নামে পরিচিত ছিল সেমময়। ইফতারের পরপর সেখানে ঢুকে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় বাংলাদেশের পাঁচ তরুণ, যারা ‘নব্য জেএমবির’ জঙ্গি বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য।
রাতভর সেই উত্তেজনার অবসান ঘটে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে। সেই অভিযানে পাঁচ হামলাকারীও নিহত হয়। জানানো হয়, তাদের নাম নিবরাজ ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। তারা হামলার বেশ কিছুদিন আগেই বাসা থেকে বেরিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিল।
তাদের হাতে নিহত হয় ওই বেকারিতে খেতে যাওয়া নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয়, দুজন বাংলাদেশি, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক। হামলা ঠেকাতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তার প্রাণ যায়।

সেই দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ভাস্কর্য ‘দীপ্ত শপথ’ ২০২৪ সালের অন্দোলনের সময় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যা আর পুননির্মাণ করা হয়নি।
প্রতিবছর তাদের স্মরণে পুলিশের পক্ষ থেকে যে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ কর্মসূচি পালন করা হত, বিগত অন্তবর্তী সরকারের সময় সেটাও ছিল না।
আগে প্রতিবছর হোলি আর্টিজানের সেই ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা জানাতে যেতেন জাপান ও ইতালি দূতাবাসের কর্মকর্তারা। গত বছর সে কর্মসূচিও দেখা যায়নি।
তবে এবার সব দূতাবাস সমন্বয় করে ইতালি দূতাবাসে একটি স্মরণসভা করার কর্মসূচি নিয়েছে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ কমিশনার এম তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “দূতাবাসগুলো সমন্বয় করে ইতালি দূতাবাসে এ দিনটি স্বরণ করবে। তবে ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো কর্মসূচি নেই।”
নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন হবে কি না এবং ‘দীপ্ত শপথ’ পুর্ননির্মাণ হবে কি না জানতে চাইলে তানভীর আহমেদ বলেন, “তাদের ব্যাপারে এই দিনে কোনো কর্মসূচি নেই। সব পুলিশের আত্মত্যাগের বিষয়ে আমরা নির্ধারিত কর্মসূচি পালন করে থাকি, পৃথকভাবে কিছু করা হয় না।”
গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ায় ওই হামলায় দেড় ডজন বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে বড় পরিসরে সেই খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ওই ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার বিচার চলে প্রায় সাড়ে তিন বছর। পুলিশ ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করে।
ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর সাতজনের ফাঁসির রায় দেয়। কিন্তু ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ে ওই সাতজনের সাজা পাল্টে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় হাই কোর্ট।
দণ্ডিতরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।
তবে হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের অধিকাংশই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর এসেছিল।
এখন আর ‘জঙ্গি’ নেই!

২০২৫ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার বার্ষিকীতে তখনকার পুলিশ কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন “দেশে কোনো জঙ্গি নাই, এখন ঠেকাতে হবে ছিনতাই। জঙ্গি থাকলে না জঙ্গি নিয়ে ভাবব। আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারছে, কীসের জঙ্গি?”
হোলি আর্টিজান হামলা কি তাহলে সাজানো ঘটনা ছিল?
এমন প্রশ্নের উত্তরে সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, “ওটা সম্পর্কে আমি জানি না; তবে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নাই। বাংলাদেশে পেটের দায়ে লোকে ছিনতাই করে।”
অথচ ২০২৪ সালে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) তখনকার প্রধান ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেই অভিযানে সাফল্য এলেও ‘জঙ্গিবাদের বীজ’ এখনও রয়ে গেছে। সে কারণে মাঝে মধ্যেই তারা নাম বদলে তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যের সুর পাওয়া যায় বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের কথাতেও।
গত এপিল মাসে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি, কিন্তু আমি ওই শব্দকে (জঙ্গি) রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এরকম কোনো তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ থাকে—পৃথিবীর সব দেশেই এরকম অ্যাক্টিভ থাকে।
“র্যাডিক্যাল কিছু ফোর্স থাকে, ফান্ডামেন্টাল কিছু পলিটিক্যাল পার্টি থাকে—এগুলো আমরা ইউজড টু, এগুলো থাকে। কিন্তু সে বিষয়ে আপনি যে শব্দ উচ্চারণ করলেন, আমাদের দেশের বর্তমান কালচারে সেটা এখন আর নাই।”


তিনি বলেন, “আগে সেই শব্দটা উচ্চারিত হত ফ্যাসিবাদী আমলের সময়; তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর এক্সিস্টেন্স নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আবার তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন “বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিটেন্সি- জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই। এই সতর্কতার মানে হচ্ছে এটা খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করেছে, কারণ দেড় বছর ইন্টেরিম সরকারের সময় আমরা খেয়াল করেছি এই প্রবণতার মানুষদের অনেক বেশি সংগঠিত হওয়া বা পাবলিকলি আসা বা ওপেনলি আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।”
পুরনো খবর
হোলি আর্টিজানে হামলার ৮ বছর: এখনো রয়ে গেছে 'জঙ্গিবাদের বীজ'
হলি আর্টিজান মামলায় ৭ জঙ্গির ফাঁসির রায়, একজন খালাস
গুলশান হামলা: ১২ ঘণ্টার বিভীষিকা
গুলশান হামলা: প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশ কর্মকর্তাদের বর্ণনায় সেই রাত