Published : 30 Jun 2026, 03:23 PM
বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের চলে যাওয়া ‘মাথার ওপরে ছাদ সরে যাওয়া’ মন্তব্য মন্তব্য করে নাট্যকার অভিনেতা রামেন্দু মজুমদার বলেন, এই বিরাট শূন্যতা পূরণের নয়।
কেন্দ্রীয় শহীর মিনারে মঙ্গলবার মুস্তাফা মনোয়ারের কফিনে শ্রদ্ধা জানিয়ে কথা বলছিলেন রামেন্দু মজুমদার।
মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বরেণ্য এই শিল্পীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয় বেলা ১১টায়। ওই সময়ের আগে থেকেই সেখানে জড়ো হন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকে। পাশাপাশি এসেছিলেন বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও।

মুস্তাফা মনোয়ারের কফিনে শ্রদ্ধা জানিয়ে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, ছাত্র ও অনুগামীরা এই শিল্পীর কর্মময় জীবনের জানা-অজানা কথা তুলে ধরেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আপ্লুত হন কেউ কেউ।
প্রয়াত শিল্পীকে নিয়ে রামেন্দু মজুমদার বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতায় বিজ্ঞান পড়তে গিয়েছিলেন। তার আঁকা দেখে সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, 'এই কেন জীবনটা নষ্ট করছে বিজ্ঞান পড়ে?’ এরপর তাকে আর্ট কলেজে নিয়ে যান। কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন।”
মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পীসত্তার প্রশংসা করে রামেন্দু মজুমদার বলেন, “জলরঙের ক্ষেত্রে তার আঁকার জুড়ি ছিল না। পরবর্তীতে কিছুদিন চারুকলায় শিক্ষকতা করার পর তিনি ঢাকা টেলিভিশনে যোগ দেন। টেলিভিশনের শুরুর সময়ে হাতে-কলমে যারা এই মাধ্যমটিকে গড়ে তুলেছেন, তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

“বিশেষ করে শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণে মুস্তাফা মনোয়ারের জুড়ি খুব কমই ছিল। তার প্রযোজিত ‘রক্তকরবী’ ও ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটক দুইটি আজও ঢাকা টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে অনন্য স্বাক্ষর হয়ে আছে।”
পাপেট শিল্পে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তিনি পাপেটকে নতুন জীবন দিয়েছেন। বাংলাদেশের পাপেট শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন তিনি। পাপেটের মাধ্যমে শিশুদের জন্য বিনোদনের পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। এমন মানুষের চলে যাওয়া আমাদের মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে যাওয়ার মত। এই বিরাট শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়।"
তার সৃষ্টির শত বছর প্রভাবিত করবে: মামুনুর রশীদ
মুস্তাফা মনোয়ারকে নিয়ে অভিনেতা নির্দেশক মামুনুর রশীদ বলেন, তার মধ্যে ছিল একটা প্রগতিশীল মন।

“তৎকালীন পাকিস্তান আমলে যখন টেলিভিশন প্রযুক্তি এ দেশে আসে, তখন আমরা ভাবতেই পারিনি যে এটার প্রেজেন্টেশন কেমন হবে। তিনি একজন উঁচুমাপের ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে এসেই সেই সময়ের স্ক্রিনটার একটা রূপ সন্ধান দিতে পেরেছিলেন। শিশুদের অনুষ্ঠান ও পাপেট ছাড়াও ওই ছোট্ট স্টুডিও এবং বাইরের বারান্দা মিলিয়ে তিনি যে অসাধারণ দুইটি নাটক নির্মাণ করেছেন, তা আগামী ১০০ বছর আমাদের দর্শককে প্রভাবিত করবে।"
মামুনুর রশীদ আরও বলেন, "স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধেও তিনি আমাদের সঙ্গে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাকিস্তান টেলিভিশন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ টেলিভিশন যে আমাদের মধ্যবিত্তদের একটা উন্নতমানের রুচি দিতে পেরেছিল, তার অন্যতম কারিগর ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।"
আগামী প্রজন্মকে তার কাজ দেখে শিখতে হবে: কেরামত মাওলা
টেলিভিশনে তার দীর্ঘদিনের কাজের সঙ্গী ও চারুকলার ছাত্র অভিনেতা কেরামত মওলা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "যারা দেশ ও সমাজকে অনেক কিছু দিয়ে যান, সে জীবন মরে না। জয়নুল আবেদিন স্যারের পর আমি মুস্তাফা মনোয়ার স্যারের সঙ্গে টেলিভিশনে যোগ দিই। আমার ৩৫ বছরের টেলিভিশন জীবনে যা কিছু শিখেছি, সব উনার কাছ থেকেই।”

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান তুলে ধরে কেরামত মওলা বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপারে গিয়েও তিনি অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে গানের অনুষ্ঠানে ইন্টারলিউডের (বিরতি) সময় চার দেয়ালের ভেতরেই তিনি যেভাবে স্ক্রিনে কখনো সূর্য ওঠা, কখনো ফুল ফোটা বা আলোর খেলা দেখাতেন, তা ছিল বিস্ময়কর।"
চিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন বলেছেন, শিক্ষক মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন বহু গুণে গুণান্বিত একজন শিল্পী। তার সৃষ্টিশীলতার কথা বলে শেষ করা যাবে না।
তিনি বলেন, “আর্ট কলেজে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। তার আঁকা চারকোলের একটি ছাগলের ছবি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। মনে হয়েছিল ছবিটি যেন জীবন্ত। তার শিল্পীসত্তা ছিল অসাধারণ। তার গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না।”
চিত্রশিল্পী হাশেম খান ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনের সূচনালগ্নে মুস্তাফা মনোয়ারের ভূমিকাকে ‘বৈপ্লবিক’ বলে মন্তব্য করেন।

তার কথায়, "চারুকলায় যোগ দেওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি ছাত্রদের প্রাণের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। এরপর ১৯৬৪ সালে যখন কলিম শরাফীর নেতৃত্বে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়, তখন আইয়ুব খানের দোর্দণ্ড প্রতাপের মধ্যেও মুস্তাফা মনোয়ার, জামিল চৌধুরী, শহীদ কাদরীরা মিলে টেলিভিশনের সমস্ত নথিপত্র, নিয়োগপত্র এবং শিল্পীদের সম্মানীর কাগজ সম্পূর্ণ বাংলায় করেছিলেন। এটি ছিল এক নীরব শৈল্পিক বিপ্লব।
“টেলিভিশন যে রেডিও বা মঞ্চের মত নয়, তা তিনি শিল্পীদের হাত-পা নাড়া ও উপস্থাপনার ঢং শিখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। মাত্র ১৮ থেকে ২১ ফুট জায়গার মধ্যে তিনি দোতলা বাড়ির সেট তৈরি করে নাটক দেখাতেন। প্রত্যেকটি প্রযোজক ও শিল্পী তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।"
সংস্কৃতি অঙ্গন ও সংগঠনের শ্রদ্ধা
মঙ্গলবারের এই শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে আরও উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা তারিক আনাম খান, অভিনেত্রী নিমা রহমান, ত্রপা মজুমদার, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দীন স্টালিন, শিল্পী মনিরুল ইসলাম, চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, শারমিন এস মুরশীদ, কাজী তামান্না, গোলাম রাব্বানী, মোর্শেদুল ইসলাম, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, খায়রুল আলম সবুজ, শহীদুজ্জামান সেলিম, খায়রুল আনাম শাকিল ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বুলবুল ইসলাম।
ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান গকুল ভিকে।

এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিকভাবে বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ছায়ানট, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গোলাম মোস্তফা একাডেমি, পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট, কর্মজীবী নারী, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, প্রাচ্যনাট, বটতলা, কণ্ঠশীলন, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, নৃত্যশিল্পী সংস্থা, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি, দূরন্ত স্টেশন, ডিরেক্টরস গিল্ড বাংলাদেশ, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মফিদুল হক এবং বঙ্গরঙ্গ নাট্যদল পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে গুণী এই শিল্পীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে।
শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের শেষভাগে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় মুস্তাফা মনোয়ারের প্রিয় গান ‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা’।
গান শেষে তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মুস্তাফা মনোয়ারকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হয়। এস আই সাইফুল আলমের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা 'গার্ড অব অনার' দেওয়া হয়। শহীদ মিনারের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে জানাজা শেষে শিল্পীর এক সময়ের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে আনা হয় দুপুর ২ টায়।
সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
এছাড়া শিল্পী মনিরুল ইসলাম, শিল্পী হাশেম খান, শিল্পী ফরিদা জামানসহ আর্ট ফাউন্ডেশন, স্টুডিও ফোর্টি এইট, সেলিম শিক্ষালয়, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়।
চারুকলা অনুষদের শিক্ষক কাউসার হাসান টগর বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশে শিল্পকলা জগতে বরেণ্য শিল্পী। শিল্পকলার মাইলফলকও তিনি। তার এ চলে যাওয়া এদেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাকে হারিয়ে ফেলা অর্থই শিল্পাঙ্গনে এক নক্ষত্রকে হারানো।”
সবশেষে এক মিনিট নীরবতা জানিয়ে চারুকলা অনুষদ থেকে বিদায় জানানো হয় এ শিল্পীকে।
বিকালে বনানী কবরস্থানে শেষ শয্যায় শায়িত হবেন মুস্তাফা মনোয়ার।
দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই সব্যসাচী শিল্পীর মৃত্যু হয়।
শহীদ মিনারে রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধায় মুস্তাফা মনোয়ারকে বিদায়
শহীদ মিনারে মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ শ্রদ্ধা
শেষবারের মত চেনা আঙিনায় 'পাপেটম্যান', বিটিভিতে মুস্তাফা মনোয়ারের
বাবা পাপেটের মাধ্যমে আনন্দের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন: মুস্তাফ
মুস্তাফা মনোয়ারের শূন্যতা 'সহজে পূরণ হওয়ার নয়'
মুস্তাফা মনোয়ার: শিল্পের জন্য এক জীবন
বনানীতে মঙ্গলবার সমাহিত হচ্ছেন মুস্তাফা মনোয়ার
সব্যসাচী শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের চিরপ্রস্থান
'শিল্পী ভাই' নেই, রইল তার 'পাপেট বাড়ি'
'স্যার কারও সঙ্গে কঠিন করে কথা বলেননি'
পাপেট সংস্কৃতি যেন নতুন প্রজন্ম পায়: সাদাত মনোয়ার