Published : 25 Jul 2026, 06:51 PM
রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার করা যে ‘শক্তিশালী বোমাটি’ (আইইডি) পুলিশ নিষ্ক্রিয় করেছে, সেটি পাতা হয়েছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টোরথ যাত্রার পথে।
শোভাযাত্রাটি যখন সেই পথ অতিক্রম করছিল, তখন পুলিশ সেটি ঘিরে রেখেছিল। আর শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষদের উদ্দেশে পুলিশের ভাষ্য ছিল, ‘এখানে শর্ট সার্কিট হয়েছে’।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
‘উল্টো রথযাত্রাকে টার্গেট করে’ সেখানে বোমাটি পাতা হয়েছিল বলে তারা ধারণা করছে পুলিশ। সেটি আগেই শনাক্ত করতে পারায় বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মোহাম্মদ শামসুল হকের ভাষ্য, ছাতার সঙ্গে বোমাটি এমনভাবে লাগানো ছিল যে, ছাতাটি ফোটালেই বিস্ফোরণ হত। তাতে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারত।
এ ঘটনার পেছনে কারা আছে এবং তাদের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অন্যান্য সংস্থা তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এ ঘটনায় মতিঝিল থানার এসআই মো. মুক্তা বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করেছেন।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার। তখন ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হুসাইন মুহাম্মাদ ফারাবী অবশ্য বলেছিলেন, মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার মধ্যে ‘ককটেল পাওয়া গেছে’।
তিনি বলেছিলেন, “ছাতার ভেতরে থাকা লাইট জ্বলতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। পরে আমরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলি এবং বোম ডিসপোজাল ইউনিট এসে সেটা নিষ্ক্রি করে। কারা সেখানে ককটেল ফেলে গেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
আর ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের একজন কর্মকর্তা শুক্রবার রাতে জানিয়েছেন, মেট্রো স্টেশনের নিচে ওই ছাতার মধ্যে পাতা ছিল একটি শক্তিশালী 'পাইপ বোমা'। কেউ কৌতুহলবশত ছাতাটি খোলার জন্য বোতাম টিপলেই বড় ধরনের বিপদ হতে পারত।
মামলায় যা আছে
মামলায় বলা হয়েছে, মামলার বাদী উল্টো রথযাত্রার নিরাপত্তায় 'হোন্ডা মোবাইল' কল সাইনে ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলেন। উল্টোরথ যাত্রার শোভাযাত্রাটির রুট ছিল ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রম পর্যন্ত। সন্ধ্যার দিকে ট্রাফিক বিভাগ থেকে ডিএমপি কন্ট্রোল রুমে সেখানে একটি বোমা সদৃশ বস্তু পাওয়ার কথা জানানো হয়।
“একটি ছাতার মধ্যে রাখা ওই বোমায় মিটমিট করে আলো জ্বলার কথা বলা হয়। এরপর খবর পেয়ে ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে এসআই মুক্তা ও তার সহকর্মীরা ৬টা বিশ মিনিটে মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের জেনারেটর রুমের পাশে উপস্থিত 'ছাতা বোমা' পাওয়ার জায়গাটি ঘিরে রাখেন। সেখানে রথ যাত্রার মিছিল উপস্থিত হলে পুলিশ সদস্যরা তাদেরকে 'শর্ট সার্কিট' হয়েছে বলে জায়গাটি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে।”
এরপর মিছিলটি শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমের দিকে চলে যায়। শোভাযাত্রা চলে যাওয়ার পর ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা এসে সেটি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে বলে মামলায় বলা হয়েছে।
এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে বোমার আলামত হিসেবে, জি আই পাইপের খন্ডিত অংশ, ব্যাটারি, বিয়ারিং এর বল পাওয়ার কথা মামলায় উল্লেখ করেছে পুলিশ।
বোমা কতটা শক্তিশালী
ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের একজন কর্মকর্তা কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "ওটা ছিল একটা পাইপ বোমা (আইইডি বা ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস)। এর ভেতরে দেড় কেজির মতো সালফার ছিল, আর ছিল প্রচুর তারকাঁটা ও ধারালো লোহার টুকরো।
“ব্যাটারি ও সার্কিট জোড়া দিয়ে ডিভাইসটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে কেউ ছাতা খোলার জন্য বোতামটি চাপলে এটার বিস্ফোরিত হত। তখন লোহা লক্করের টুকরোগুলো স্প্লিন্টার হয়ে আশপাশের লোকজনকে ক্ষতবিক্ষত করত।"
পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন উল্টো রথযাত্রাকে টার্গেট করে ওই বোমাটি পাতা হয়েছিল। মামলায় বলা হয়েছে, সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনগণের জীবন বিপন্ন করার লক্ষ্যে বোমাটি সেখানে পাতা হয়েছিল।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম রথ শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে বোমাটি রাখা হয়েছিল বলে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, "এ কারণে বোমাটি পাতা হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত চলছে।"
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, "বোমাটি ছাতাটির সাথে এমনভাবে লাগানো ছিল, কেউ নিয়ে আগ্রহবশত খুললেই বিস্ফোরণ ঘটত। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটত।"
তবে কারা করেছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী এখনও পরিস্কার নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
শামসুল হক বলেন, "শুধু আমরা নই অন্য সংস্থাও এই ঘটনা নিয়ে তদন্ত করছে।"
এদিকে শুক্রবার রাতে ওই বোমাটি নিষ্ক্রিয়করণের সময় একজন পথচারী আহত হয়েছেন।
৬৬ বছর বয়সি মিরাজ আহমেদ নামের ওই ব্যক্তি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী। তার বাম চোখে স্প্লিন্টার লেগেছে। রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে আগারগাঁওয়ে চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে মিরাজকে।
আরও পড়ুন-