১১২১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: সালমান, শায়ানসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক
তিনটি মামলায় যথাক্রমে ২২ জন, ২২ জন ও ২৫ জনকে আসামি করা হবে।
জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ভুয়া আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে ১১২১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করবে দুদক।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সোমবার এক ব্রিফিংয়ে কমিশন সচিব সাইদুর রহমান খান সাংবাদিকদের এসব মামলা অনুমোদনের তথ্য দিয়ে বলেন, “বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, তার ছেলে শায়ান, পরিবারের অন্য সদস্য, বেক্সিমকোর পরিচালক, সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং জনতা ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এসব মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
“তিনটি মামলায় যথাক্রমে ২২ জন, ২২ জন ও ২৫ জনকে আসামি করা হবে। তবে একই ব্যক্তির নাম একাধিক মামলায় রয়েছে।”
দুদকের অনুসন্ধানের বরাতে ব্রিফিংয়ে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের ঢাকা লোকাল অফিস থেকে স্প্রিংফুল এপারেলস লিমিটেড, আরবান ফ্যাশনস লিমিটেড ও মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনায় আগের অভিজ্ঞতাও ছিল না। কিন্তু ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) সুবিধাসহ ঋণ মঞ্জুর করা হয়। পরে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছিল।
এসব বিলের বিপরীতে ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়। এর একটি অংশ বিদেশে পাচার এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপন করা হয়েছিল বলেও দুদকের অভিযোগ।
দুদক সচিব বলছেন, স্প্রিংফুল এপারেলসের মাধ্যমে ১৪১ কোটি ২৮ লাখ, আরবান ফ্যাশনসের মাধ্যমে ৪১৭ কোটি ৪ লাখ এবং মিডওয়েস্ট গার্মেন্টসের মাধ্যমে ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগের পরিমাণ ১ হাজার ১২১ কোটি ৪৯ লাখ ৪ হাজার ৭৫৫ টাকা।
প্রথম মামলায় স্প্রিংফুল এপারেলস লিমিটেডের নামে ১৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সালমান এফ রহমান ও তার ছেলে শায়ানসহ ২২ জনকে আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠিত স্প্রিংফুল এপারেলসের পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এরপরও ক্ষমতার অপব্যবহার ও পরস্পর যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ইডিএফ সুবিধাসহ ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে ১ কোটি ৭০ লাখ ৬১ হাজার ৫৮২ দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলারের ভুয়া বিল তৈরি করে।
এর বিপরীতে দেশে আনা হয় মাত্র ৪ লাখ ৪০ হাজার ৩৯২ দশমিক ৫০ ডলার। বাকি ১ কোটি ৬৬ লাখ ২১ হাজার ১৯০ দশমিক ২৫ ডলার দেশে আনা হয়নি। তৎকালীন হিসাবে প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরলে এর পরিমাণ ১৪১ কোটি ২৮ লাখ ১ হাজার ১৭১ টাকা ২৫ পয়সা। এই অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমান এফ রহমান, তার ভাই এ এস এফ রহমান, বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ইকবাল আহমেদ, এমডি ওসমান কায়সার চৌধুরী ওরফে ও কে চৌধুরী, পরিচালক এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহা।
এছাড়া স্প্রিংফুল এপারেলসের এমডি মোহাইমিনুল ইসলাম ও পরিচালক কোহিনুর আবেদিন, ক্রিসেন্ট এক্সেসরিজ লিমিটেডের এমডি আবু নাঈম মাহমুদ সালেহিন ও পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান তানভীরকে আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আসামির তালিকায় আরও রয়েছেন সালমানের ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং এ এস এফ রহমানের ছেলে আহমেদ শাহরিয়ার রহমান। দুদকের নথিতে তাদের সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আরআর গ্লোবাল ট্রেডিং এফজেডইর স্বত্বাধিকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের সাবেক এমডি আব্দুছ ছালাম আজাদ, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল জব্বার, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির ঢালী, অবসরপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক আব্দুর রহিম, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং প্রিন্সিপাল অফিসার শ ম মাহাতাব হোসাইন বাদশাও এ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন।
দ্বিতীয় মামলায় আরবান ফ্যাশনস লিমিটেডের নামে ৪১৭ কোটি ৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সালমান ও শায়ানসহ ২২ জনকে আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, আরবান ফ্যাশনসও নতুন প্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানি ছিল। এর পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়। ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটির নামে ইডিএফ সুবিধাসহ ঋণ মঞ্জুর করা হয়। এরপর ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে ভুয়া বিল তৈরি করা হয়।
দুদকের হিসাবে, এসব বিলের বিপরীতে ৪ কোটি ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৫৭৭ দশমিক ১৩ মার্কিন ডলারের পেমেন্ট নেওয়া হয়। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে এর পরিমাণ ৪১৭ কোটি ৪ লাখ টাকার বেশি দাঁড়ায়। ভুয়া আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। পরে অর্থের একটি অংশ নগদে উত্তোলন এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে করা হয় মানিলন্ডারিং।
এ মামলায় সালমান এফ রহমান, এ এস এফ রহমানসহ বেক্সিমকো লিমিটেডের ৬ পরিচালক ও কর্মকর্তা রয়েছেন। অন্য আসামিদের মধ্যে আছেন আরবান ফ্যাশনসের এমডি হেলাল উদ্দিন ও পরিচালক সাহিদা রহমান, ক্রিসেন্ট এক্সেসরিজের এমডি আবু নাঈম মাহমুদ সালেহিন ও পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান তানভীর।
এ ছাড়া আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ও আহমেদ শাহরিয়ার রহমানকেও আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের সাবেক এমডি আব্দুছ ছালাম আজাদ, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেন, সাবেক মহাব্যবস্থাপক শহিদুল হক, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক মমতাজুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, ব্যবস্থাপক সালেহ আহম্মেদ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামও এ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন।
তৃতীয় মামলায় মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে সালমান ও শায়ানসহ ২৫ জনকে আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, মিডওয়েস্ট গার্মেন্টসও নতুন প্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানি। এর পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এরপরও জনতা ব্যাংকের ঢাকা লোকাল অফিস থেকে প্রতিষ্ঠানটির নামে ইডিএফ সুবিধাসহ ঋণ মঞ্জুর করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটি ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে ভুয়া বিল তৈরি করে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে ৬ কোটি ৬২ লাখ ৫৫ হাজার ২৮৮ দশমিক ৫৬ মার্কিন ডলারের পেমেন্ট নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার দেশে ফেরত আনা হয়নি। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে ফেরত না আনা মোট অর্থের পরিমাণ ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকার বেশি দাঁড়ায়।
দুদক বলছে, এই অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং করা হয়েছে। এ মামলায় সালমান এফ রহমান ও এ এস এফ রহমান ছাড়াও বেক্সিমকোর পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আসামি করা হচ্ছে। মিডওয়েস্ট গার্মেন্টসের এমডি মোহাইমিনুল ইসলাম, পরিচালক কোহিনুর আবেদিন, ক্রিসেন্ট এক্সেসরিজের এমডি আবু নাঈম মাহমুদ সালেহিন ও পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান তানভীরও আসামির তালিকায় রয়েছেন।
এ ছাড়া সালমানের ছেলে আহমেদ শায়ান এবং এ এস এফ রহমানের ছেলে আহমেদ শাহরিয়ার রহমানকেও আসামি করা হচ্ছে।
আসামির তালিকায় আরও রয়েছেন জনতা ব্যাংকের সাবেক এমডি আব্দুছ ছালাম আজাদ, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল জব্বার, সাবেক মহাব্যবস্থাপক শহিদুল হক, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক মমতাজুল ইসলাম ও আব্দুর রহিম, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, ব্যবস্থাপক সালেহ আহম্মেদ, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম, প্রিন্সিপাল অফিসার শ ম মাহাতাব হোসাইন বাদশা এবং অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির ঢালী।
তিন মামলাতেই সালমান এফ রহমান, এ এস এফ রহমান, বেক্সিমকোর কয়েকজন পরিচালক, সালমানের ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং জনতা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদের নাম রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান দলের নেতৃত্ব দেন সংস্থার উপপরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন। দলের অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক মিনহাজ বিন ইসলাম ও সাজ্জাদ হোসেন এবং উপসহকারী পরিচালক এলমান আহমেদ অনি ও রুমান উদ্দিন।
