Published : 20 Aug 2025, 07:13 PM
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছর আন্দোলনের সময় আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার কথা বলেছেন একজন চিকিৎসক।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মো. মাহফুজুর রহমান নামে এ চিকিৎসক বলেন, ১৮ জুলাই থেকে তাদের হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ রোগী আসতে শুরু করে।
ডা. মাহফুজুর রহমান ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্স অ্যান্ড হসপিটালের নিউরো ট্রমা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন এই চিকিৎসক।
জুলাই অভ্যুত্থান দমনের চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলায় ষষ্ঠ দিনে এই চিকিৎসকসহ চারজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।
অপর তিনজন হলেন-ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহনাজ পারভীন, ঢাকার শ্যামলী এলাকার ইবনেসিনা হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসানুল বান্না ও চানখাঁরপুলে মেহেদী হাসান জুনায়েদের মা সোনিয়া জামাল।
মামলার ৮১ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৫ জন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিলেন।
এ মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ-আল মামুন আসামি।
আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহফুজুর রহমান ট্রাইব্যুনালে বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার বিষয়ে জানার পরে তিনি হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে পরামর্শ করেন। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে আশঙ্কায় প্রস্তুত থাকা দরকার বলে মনে করেন তিনি। তাই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পরিচালকের নির্দেশনায় একটি জরুরি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়।
১৮ জুলাই থেকে হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ রোগী আসতে থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, “রোগীদের মাথা, হাত, পা, পিঠ, মুখ ও গলায় গুলি ও পিলেট বিদ্ধ ছিল। গুলিগুলো ছিল বড় আকারের।
“৪/৫ অগাস্ট যেসব রোগী আসে তাদের অধিকাংশের মাথা, বুক, মুখ ও গলায় গুলিবিদ্ধ ছিল। বেশির ভাগের মাথার খুলি ছিল না। আমাদের হাসপাতালে ৫৭৫ জন গুলি ও পিলেটবিদ্ধ রোগীকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।”
এদের মধ্যে অনেককেই হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও শয্যা সংকুলান না হওয়ায় এবং গুরুতর আহত রোগীর চাপ বেশি থাকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান মাহফুজ।
তিনি বলেন, “গুরুতর আহত ১৬৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের বেশির ভাগেরই মাথার খুলি ছিল না। তাদের মধ্যে চারজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। ২৯ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়।”
পুলিশের বিরুদ্ধে তার অভিযাগ, “১৯ জুলাই যখন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল তখন ডিবির লোকেরা এসে নতুন গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের ভর্তি না করার জন্য আমাকে চাপ দেয়। বলে–আপনি অতি উৎসাহী হবেন না, আপনি বিপদে পড়বেন।
“তারা আরও বলে – যাদের ভর্তি করেছেন তাদেরকে রিলিজ করবেন না; এ বিষয়ে উপরের নির্দেশ আছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই চিকিৎসক বলেন, “তখন আমরা কৌশলে ভর্তি রেজিস্টারে রোগীদের জখমের ধরণ পরিবর্তন করে গুলিবিদ্ধের স্থলে সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কারণ লিপিবদ্ধ করে ভর্তি করি। আহত রোগীদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ৩০ এর মধ্যে। তাদের অধিকাংশই ছিল শিক্ষার্থী।”

ডাক্তার মাহফুজ নিজের নেতৃত্বে প্রায় ৩৩টি অস্ত্রোপচার করেছেন তুলে ধরে বলেন, “অনেকগুলো বুলেট ও পিলেট আহত আন্দোলনকারীদের শরীর থেকে বের করেছি। অনেকগুলো গুলি ও পিলেট রোগীরা চেয়ে নিয়ে যায়। তদন্তকারী কর্মকর্তা জব্দ তালিকামূলে দুটি পিলেট, একটি বড় বুলেট ও আরও একটি গোলাকার বুলেট জব্দ করেছে।”
এই পর্যায়ে জব্দ তালিকার সেই বুলেট ও পিলেট আদালতে প্রদর্শন করা হয়।
সাক্ষ্যে মাহফুজ বলেন, যেসব রোগীর মাথার খুলি ছিল না, তাদের কয়েকজনের আইসিইউতে যন্ত্রণাকাতর অবস্থার ভিডিও ধারণ করেন ৭১ টিভির একজন সাংবাদিক এবং তা ৭১ টিভিতে প্রচার করা হয়।
এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালে একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। ভিডিওতে সাক্ষীকে চিকিৎসারত অবস্থায় দেখা যায়।
মানবতাবিরোধী এসব অপরাধের প্রধান নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম তুলে ধরেন মাহফুজ।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতসহ যারা শেষ হাসিনার নির্দেশ কার্যকর করে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নিহত ও আহত করা হয়েছে, তাদের বিচার ও ফাঁসি দাবি করেন এই চিকিৎসক।
এর আগে সোমবার আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যার পর ছয়জনের লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সাক্ষ্য দেন তিনজন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন এনাব নাজেজ জাকি, যার ছেলে আশুলিয়ার ওই ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
এদিন সকালে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তিনি দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেছেন। তিন আসামির মধ্যে একমাত্র তিনিই কারাগারে আটক আছেন, বাকি দুজনকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার কার্যক্রম চলছে।
গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট পাঁচ অভিযোগে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল নির্বাচনের আগেই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিচার শেষ করার দাবি জানিয়ে আসছে।
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সম্প্রতি এক ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলেই এ বিচার শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
পুরনো খবর:
ট্রাইব্যুনালে ছেলের লাশ পোড়ানোর ভিডিও, কাঁদলেন বাবা
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু, ট্রাইব্যুনাল থেকে সরাসরি
ট্রাইব্যুনালে হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য শেষ হতে পারে অক্টোবরে, আশা