Published : 19 Nov 2025, 01:19 AM
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর দিল্লিতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত কী পদক্ষেপ নেবে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত পেতে বাংলাদেশ কতটা চাপ দিতে পারবে ভারতকে, এমন আলোচনাও চলছে।
প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ চাইলে অপরাধীকে ফেরত দেওয়ার কথা ভারত সরকারের। কিন্তু সেই অপরাধী যখন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দিল্লির ‘ঘনিষ্ঠ’ বন্ধু, তখন প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা নিয়ে চলছে নানান আলোচনা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের ইতিবাচক সাড়া আসবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা।
এ ক্ষেত্রে চুক্তি নয়, বরং ‘রাজনৈতিক’ বিবেচনা প্রাধান্য পাবে বলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আমেনা মহসীন বলেছেন, “ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরতে দেবে, সেটা আমি মনে করি না। আপনি যদি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখেন ভারতের, ভারতের মিডিয়াগুলোকে ফলো করেন, সেই জায়গাগুলো থেকে এবং ভারতের সাথে শেখ হাসিনার যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ওখানে তেমন তো না যে, শুধু শেখ হাসিনা আছে, অনেক আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ওখানেই আছে।
“সেখানে ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করবে না। আমার মনে হয় যে, ভারত এটাকে রাজনৈতিকভাবে দেখবে হয়ত।”
ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে গত বছরের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারত সরকারের ‘অতিথি’ হিসেবে দিল্লিতে তার অবস্থানের কথা লিখেছে ভারতীয় গণমাধ্যম।
ওই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সোমবার শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ফাঁসির রায় হয়েছে তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালেরও।
একই মামলায় তৃতীয় অভিযুক্ত সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হয়েছিলেন। অপরাধ ‘স্বীকার’ এবং বিচার কাজে ‘সহযোগিতা’ করায় অপরাধ প্রমাণ হওয়ার পরও তাকে পাঁচ বছরের লঘুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

গত বছরের অক্টোবরে হাসিনার বিচারের উদ্যোগ নেওয়ার পর দুদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে ডিসেম্বরে দিল্লিকে ‘নোট ভারবাল’ (কূটনৈতিকপত্র) পাঠিয়েছিল ঢাকা।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলতি বছর জুনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর মধ্যে একটি মামলায় বিচারকাজ শেষ হয়ে গেলেও তাকে ফেরত চেয়ে পাঠানো চিঠির কোনো জবাব দেয়নি ভারত সরকার।
ঢাকার পাঠানো চিঠির বিষয়ে গত মাসে এক প্রশ্নে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছিলেন, আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে দিল্লি।
সোমবার জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির সাজা হওয়ার পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে আবারও ফেরত পাঠানো আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আজকের রায়ে পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত এই ব্যক্তিদের দ্বিতীয় কোনো দেশ আশ্রয় দিলে তা হবে অত্যন্ত অবন্ধুসুলভ আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞার সামিল।
“আমরা ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই তারা যেন অনতিবিলম্বে দণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই ব্যক্তিকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে এটি ভারতের জন্য অবশ্য পালনীয় দায়িত্বও বটে।”
আর রায়ের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এবং আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, হাসিনাকে ফেরত চেয়ে আবারও দিল্লিতে চিঠি পাঠাবে সরকার।
প্রত্যর্পণ চুক্তির পাশাপাশি ইন্টারপোলের মাধ্যমে পলাতক শেখ হাসিনা এবং কামালকে ফেরত আনার প্রচেষ্টা চালানোর কথা সেদিন বলেছেন প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম।
শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ভারতকে চিঠি পাঠিয়ে আলাপ-আলোচনা চালু রাখাকে একমাত্র পথ মানছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, “বাংলাদেশ অন্য কারো সাহায্য নিয়ে কিছু করবে, সে সম্ভাবনাটাও খুব কম। সুতরাং, যেটা দ্বিপাক্ষিকভাবে ভারতের সাথে আলাপ-আলোচনা করে, ভারতকে চিঠিপত্র লিখে যদি চেষ্টা করে, সেই চেষ্টা তারা করতে পারে। কিন্তু চেষ্টার ফলাফল কী হবে, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে যে, কোনো ইতিবাচক ফল আসবে কিনা।”

ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর এক সাদামাটা বিবৃতিতে দিলেও রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শেখ হাসিনার বিষয়ে রায় ঘোষণার কথা অবগত হওয়ার কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, নিকট প্রতিবেশি হিসেবে বাংলাদেশের ‘সর্বোত্তম স্বার্থের’ প্রতি দিল্লি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভূক্তি এবং স্থিতিশীলতার মিশেলে সেই স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে ‘সব অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে আলোচনায় সম্পৃক্ত’ হওয়ার ইচ্ছার কথা বলা হয় ওই বিবৃতিতে।
প্রত্যর্পণ চুক্তি, কী হতে পারে ভারতের অবস্থান
অন্য দেশে থাকা অপরাধীদের নিজ দেশে প্রত্যর্পণের জন্য ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রত্যর্পণ চুক্তি করে বাংলাদেশ এবং ভারত সরকার। মূলত জঙ্গিবাদ নির্মূলের জন্য করা ওই চুক্তির আওতায় নিজেদের মধ্যে অন্য বন্দিদেরও বিনিময় করেছে দুই দেশ।
এই চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালের নভেম্বরে নারায়ণগঞ্জে সাত খুন মামলার আসামি নূর হোসেনকে কলকাতা থেকে ফিরিয়েছিল সরকার।
একই সময়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াসহ তিনজনকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছিল বাংলাদেশ। তবে, অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তরে ওই চুক্তির অনুসরণ না করার কথা সেই সময় বলেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল।
প্রত্যর্পণ চুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশ যে চিঠি গত ডিসেম্বরে দিয়েছে, তার কোনো জবাব দেয়নি ভারত সরকার। চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করলেও জবাব না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা লিখেছে দেশটির গণমাধ্যম।
আবার অভিযোগের ‘রাজনৈতিক চরিত্র’ থাকলে প্রত্যর্পণের অনুরোধে সাড়া না দেওয়ার কথা বলা আছে, চুক্তির ৬ নম্বর ধারায়। দিল্লি সেই ধারাটি ব্যবহার করতে পারে বলে ধারণা দিয়ে আসছেন ভারতের বিশ্লেষকরা।

ফাঁসির দণ্ড পাওয়া শেখ হাসিনা বলে আসছেন, তার বিরুদ্ধে এই রায় ‘পক্ষপাতমূলক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।
তবে, ওই ধারাতেই ১৩টি বিষয়কে ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহুপাক্ষিক চুক্তিতে বিবেচিত অপরাধ, হত্যা, হত্যার উস্কানি, জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করে এমন বিস্ফোরণ প্রভৃতি।
জুলাই অভ্যুত্থানে ড্রোন, হেলিকপ্টার, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ, চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা, আশুলিয়ায় পাঁচজনকে হত্যার পর পোড়ানো ও একজনকে জীবিত অবস্থায় পোড়ানোর তিন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে শেখ হাসিনার।
প্রত্যর্পণ চুক্তির সাত ধারায় বলা হয়েছে, যে দেশের কাছে কোনো ব্যক্তির প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা হয়েছে, ওই ব্যক্তি যদি প্রত্যর্পণ নিয়ে ওই দেশের আদালতে যায়, মামলা চলাবস্থায় প্রত্যর্পণ হবে না।
সেদিকে ইঙ্গিত করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্টে এক কলামে সাবেক কূটনীতিক প্রভু দয়াল লিখেছেন, “যে কোনো প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারতে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে, শেখ হাসিনা হয়ত আদালতে সেটা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। যে প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যাবে।
“সব মিলিয়ে প্রত্যর্পণ খুব অসম্ভব একটা ব্যাপার। কেননা, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি অনুরোধে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লি আইনি এবং কূটনৈতিক স্বাতন্ত্র্যকে প্রাধান্য দিতে চাইবে। আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক বিবেচনা এবং মানবাধিকারের উদ্বেগ থাকায় বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।”
কুয়েত ও মরক্কোতে ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রদূত লিখেছেন, “কেবল আইনি বাধ্যবাধকতার উপরে নয়, ভারতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বেশি নির্ভর করছে ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনার উপর।
“শেখ হাসিনা ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ শাসনকালে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন অবিচল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।”
প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা স্বত্বেও অনেক সময়, সেটা বাস্তবায়ন হয় না মন্তব্য করে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, “প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশ অনেক দেশে প্রত্যর্পণ করে না। সুতরাং চুক্তিটা আছে, নিশ্চিতভাবে সেটা ব্যবহার করে বাংলাদেশ কিন্তু ‘কমপ্লায়েন্টের’ ব্যাপারে কোনো চাপ প্রয়োগ করতে পারবে, সেটা মনে করার কোনো খুব বড় কারণ নাই।
“বিশেষ করে এখন যে সম্পর্ক আছে দুই দেশের মধ্যে। বাংলাদেশ সেজন্য এইটার পিছনে না ছুটে, সাধারণভাবে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কী করতে পারে, সেটা দেখা উচিত। সম্পর্ক ভালো থাকলে অনেক কিছু করা সম্ভব। সম্পর্ক যখন ভালো থাকে না তখন আমি চাইলাম, সাথে সাথে ওরা সব করে দিল, এসব মনে করার কোনো কারণ নাই।”

কোন পথে দুদেশের সম্পর্ক
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং তার বক্তব্য ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে দুদেশের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তার প্রত্যর্পণ এবং সেখান থেকে চালানো কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্পর্ক আরও শীতল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আমেনা মহসীন।
আর মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেছেন, শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের একটি ইস্যু নিয়ে লেগে না থেকে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে সামগ্রিক দিক বিবেচনায় এগিয়ে নেওয়া উচিত।
শেখ হাসিনার রায়ের পর ভারতের দেওয়া বিবৃতির প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক আমেনা মহসীন বলেন, “এটা ঠিক যে, ভারত একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছে যে, তারা সব স্টেকহোল্ডারের সাথে, সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চায়। এখন সেই সবাইটা কারা, সেটা আমাদের দেখার ব্যাপার। এবং ভারত বারবারই বলছে ওরা একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চায়।
“বাংলাদেশের সাথে এমনিতে একটা টানাপোড়েন চলছে জুলাই পরবর্তী সময় এবং এটায় হয়তো জনগণের চাপ থাকবে, সেটা ভারতের প্রতি। সম্পর্ক আরো শীতলতা আমরা দেখতে পারি ভবিষ্যতে।”
আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, “বন্ধুত্বতো অনেকদিন ধরেই শীতল হয়ে আছে। আর ভারত তো আমাদের সাথে পার্টি-কেন্দ্রিক একটা সম্পর্ক রেখেছে, তাই না? এটা আমরা দেখে এসেছি। আমাদেরকে একটুখানি অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু আমার মনে হয় সম্পর্কের একটা অবনতি হতে পারে।
“কারণ এখান থেকে চাপ থাকবে, এখানে যারা নির্বাচিত সরকার হবে ভবিষ্যতে, তারাও চাপটা রাখবে ভারতের উপরে। কিন্তু সেটা যে ভারত মেনে নেবে, সেটা আমি মনে করি না।”
ভারত থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য-বিবৃতি বন্ধ রাখার বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতকে যে আহ্বান জানিয়ে আসছে, সে প্রসঙ্গ টেনে এই বিশ্লেষক বলেন, “উনি যে ওখান থেকে বিভিন্ন ধরনের স্টেটমেন্ট দিচ্ছেন, ভারতের প্রতি বলা হচ্ছে যে, ওইগুলো যেন একটু বন্ধ হয়। মানে, কী ধরনের কার্যকলাপ ওখান থেকে হয়, সেগুলার উপরে অনেক কিছু করছে আর কি।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, “আমি মনে করি যে, সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত যে, এই একটা বিষয় আমাদের যা করার সেটা তো আমরা করব, আমাদের পক্ষ থেকে নিশ্চয়ই করবে, চিঠিপত্র লিখবে, ‘উনাকে ফেরত দাও’।
“কিন্তু তারপরে তাতে ভারত যদি কোনো ইতিবাচক সাড়া নাও দেয়, তার জন্য কি আমরা আমাদের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটাকে এখানে রেখে দেব, নাকি সম্পর্কটাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব, একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক গঠনের চেষ্টা করব?”

স্বাভাবিক সম্পর্ক হলে যেসব বিষয় এখন এগোনো সম্ভব হচ্ছে না, সেটা নিয়ে অগ্রগতি করা যাবে বলে মত দিয়ে তিনি বলেন, “এই একটা বিষয়ে যা করার সেটা করে, চুপচাপ, এটা নিয়ে বেশি হৈচৈ না করে ‘কম্প্রিহেন্সিভলি’ বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কীভাবে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা যায়, সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে আমাদেরকে এবং সেই উদ্যোগগুলো নিতে হবে। অন্য জিনিসটা জাতীয় স্বার্থের জন্য সবচেয়ে বড়, এটা মনে করার কোনো কারণ নাই।”
বিচারের জন্য শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার পাশাপাশি দিল্লিতে বসে বাংলাদেশকে ‘অস্থিতিশীল’ করার প্রচেষ্টার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে এনেছে ইউনূস সরকার।
অপরদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ‘নিরাপত্তার’ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ভারত সরকার। পাশাপাশি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও অপতথ্য’ এবং ‘অতিরঞ্জিত প্রচারণার’ অভিযোগ বাংলাদেশ সরকার করেছে।
বিভিন্ন বিষয়ে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সীমান্তের বিষয়ে এবং দিল্লি থেকে দেওয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক ‘তলবের’ ঘটনাও ঘটেছে।
কূটনৈতিক এ টানাপোড়নের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার ঘটনাও ঘটে। সবশেষ ১৭ মে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য আমদানি বন্ধের ঘোষণা দেয় ভারত।
সর্বশেষ, দিল্লি থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়া থেকে শেখ হাসিনাকে রাখার আহ্বান জানাতে ১২ নভেম্বর ঢাকায় ভারতের উপ-হাই কমিশনারকে ‘তলব’ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আগের খবর:
জুলাই হত্যা: 'মানবতাবিরোধী অপরাধে' শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড
হাসিনাকে প্রত্যার্পনে ভারতে আবার চিঠি লিখবো: আইন উপদেষ্টা
মানবতাবিরোধী অপরাধ: অভিযোগ আমলে নিয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা