Published : 20 Jun 2026, 06:06 PM
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাওয়ার ঠিক আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।
শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাদের এ বৈঠককে রুটিন হিসেবে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ এড়িয়ে শুক্রবার রাতে ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিজয়ের প্রসঙ্গ টেনেছেন রাষ্ট্রদূত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হওয়ার সুযোগ থাকার দাবিও ইঙ্গিতে তুলে ধরলেন তিনি।
ক্রিস্টেনসেন বলেন, “একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণে আমি এখানে এসেছি। গতরাতে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দারুণ একটা জয় পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরবর্তী পর্বে চলে গেছি।
“সুতরাং আমি এখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সব বাংলাদেশিকে উৎসাহিত করতে এসেছি, যাতে সামনের দিনে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেন। কেননা, দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাজি ধরলে আপনাকে কখনো পস্তাতে হবে না।”
একইদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকায় ব্রিটিশ হাই কমিশনার সারাহ কুকও পৃথক বৈঠক করেছেন।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও এগুলোকে ‘নিয়মিত বৈঠক’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে সেটা সবাই দেখেছে।
“সুতরাং ঢাকায় বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পররাষ্ট্র বিষয়ক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এগুলো নিয়মিত বৈঠক।”
মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর ছয় দিনের সফর শুরু হচ্ছে রোববার। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর এটিই হচ্ছে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর।
চীন সফরের প্রথম দুইদিন ২৩ থেকে ২৪ জুন দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-ডব্লিউইএফের সম্মেলনের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বৈঠকে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে ২৫ জুন বিকালে চীনের গ্রেট হলে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার তথ্য দেন পররাষ্ট্র সচিব। পরদিন ২৬ জুন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে।
চীনের সঙ্গে শিক্ষা, কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, মিডিয়া কোঅপারেশন এবং গ্রিন এনার্জি খাতে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও দুটি চুক্তি সই হওয়ার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যকে প্রভাবিত করার মতো যেসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে থাকে চীনকে সেটার মূল লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা মিশনের দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে পাওয়ার আগেই সেনেট শুনানিতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতাকে ‘ঝুঁকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন।

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ওই শুনানিতে এক প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, চীন এবং তার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজে ‘ঝুঁকি’ কী, তা বোঝাতে বাংলাদেশের সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করবেন।
চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের সাবমেরিন ঘাঁটি ‘সংস্কার’ এবং ‘২০টি চীনা যুদ্ধবিমান কেনার’ প্রসঙ্গে টেনে ওই প্রশ্ন করা হয়েছিল তাকে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ‘চীনা প্রভাব’ নিয়ে এক সেনেট সদস্যের ‘উদ্বেগের’ সঙ্গে একমত হওয়ার কথাও ওই সময় বলেছিলেন রাষ্ট্রদূত।
ঢাকায় আসার পর গত জানুয়ারিতে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে মতবিনিময়ে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্ততায় ঝুঁকির যে বিষয়টি রয়েছে, তা তিনি স্পষ্টভাবে অন্তর্বর্তী সরকার বা নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে তুলে ধরবেন।
তাকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লেখা হয়েছে, “শুনানিতে আমি যেমন বলেছিলাম, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
“বাংলাদেশে আমি সব বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখব, সেটা অন্তর্বর্তী সরকার বা নতুন নির্বাচিত সরকার হোক। এখানে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্ততায় ঝুঁকির যে বিষয়টি রয়েছে, সেটা আমি স্পষ্টভাবে তুলে ধরব।”
ওই বক্তব্যের পর এক বিবৃতিতে এটাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকায় চীনা দূতাবাস।
দূতাবাসের এক মুখপাত্র তখন বলেছিলেন, “চীন ও বাংলাদেশের সহযোগিতা দুদেশ ও জনগণের বিষয় এবং এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হস্তক্ষেপ বা আঙ্গুল তোলার সুযোগ নেই।
“আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে তার দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও সহযোগিতার জন্য সহায়ক এমন কাজের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
এমন পেক্ষাপটে নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরে যখন তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনে যাচ্ছেন, এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে গেলেন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন।
সরকারপ্রধানের বেইজিং সফরে সামরিক সহযোগিতার বিষয়ও আলোচ্যসূচিতে থাকার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। চীনা প্রেসিডেন্টের বৈশ্বিক চার উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার বিষয়ও বাংলাদেশ সরকারের ‘বিবেচনায়’ থাকার কথাও বলেছেন তিনি।

এ সফরের আগে মার্কিন ও ব্রিটিশ দূতদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এক প্রশ্নে বলেন, রাষ্ট্রদূতরা এখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে এসেছেন। তৃতীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে নয়।
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো পররাষ্ট্র সম্পর্কের অবস্থায়, আমাদের সব দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াশিংটনের সাথে বলেন, বেইজিংয়ের সাথে বলেন, ইউরোপের সাথে বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বলেন। কেন? এটা সম্ভব কীভাবে হল?
“হইছে… আমরা দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছি। আমরা সাহসী ও জোরালো অবস্থান থেকে দরকষাকষি করতে পারি। এটা গত ১৫ বছরে কোনো সরকারই পারেনি, কেননা বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও বৈধতার ঘাটতি তাদের ছিল। এই সরকার বাংলাদেশের জনগণের মালিকানার সরকার।”
‘উত্তাপ নামলে ভারতেও যাব’
শনিবার মন্ত্রণালয়ে দেখা করতে আসা কোনো রাষ্ট্রদূতের চীন সফরের কোনো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ ছিল কি-না- এমন প্রশ্নে হুমায়ুন কবির বলেন, “আমরা যাব, তাদের উদ্বেগ কেন হবে? আমরাতো যে দেশে যেতে চাই, ওই দেশে যাব। যেখানে আমরা দ্বিপাক্ষিকভাবে মনে করব যে, আমরা এই মুহূর্তে যাওয়া দরকার।
“যুক্তরাষ্ট্রে যখন যাব, অন্যের কী মাথাব্যথা, আমরাতো তাকাব না। আমরাতো তাকাব, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অংশীদার। আমাদের দেশের স্বার্থে যখন যাইতে হবে, আমরা যুক্তরাষ্ট্রে যাব।”
এরপর তিনি বলেন, “যখন আমাদের যাইতে হবে বেইজিংয়ে, বেইজিংয়ে যাব। তখন আমাদের যাইতে হবে, যখন টেম্পারেচার ডাউন হবে, যখন কনডিউসিভ অ্যাটমোসফেয়ার হবে, আমরা ইন্ডিয়াতেও যাব, অসুবিধা নাই।
“মানে বিভিন্ন জায়গায় যাব, পশ্চিম এশিয়ায় যাব। আমাদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে যাব। কখন, কোথায় যেতে হবে, কেউ আমাদের নির্দেশ করবে না। আমরাতো কোনো লেজুড়ভিত্তিক বা অবৈধ সরকারও না, গত ১৫ বছর দেখেছেন গোলামির সরকার, (আমরা) গোলামির সরকারতো না। আমাদেরকেতো কেউ নাচাবে না।”
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “বৈশ্বিক বিষয়াবলিতে আমরা এখন খেলোয়াড়, যে সফট পাওয়ার দিয়ে প্রভাবিত করবে। অংশীজনদের সঙ্গে আমরা অর্থবহভাবে সম্পৃক্ত হব, আমাদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে সবার সঙ্গে সম্পৃক্ত হব।”
পুরনো খবর:
চীনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশে ‘সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির প্রস্তাব’ দেবে যুক্তরাষ্ট্র