Published : 25 Jun 2026, 08:16 AM
গ্রামটির নাম এস্তানিওল। যেখানে নেই কোনো স্কুল, নেই কোনো ফুটবল মাঠ। পাও কুবার্সিরও বেড়ে ওঠার মঞ্চ তাই ছিল রাস্তা-ঘাট, মেঠো পথ। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ এখন বিশ্বকাপের আঙিনায়। স্পেনের জার্সিতে ছড়াচ্ছেন আলো। বিস্ময়করই!
অল্প বয়সে কুবার্সি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসে, স্পেনের রক্ষণ আগলে রাখছেন দারুণ দৃঢ়তায়। ‘লা রোজা’দের জাল এখন পর্যন্ত অক্ষত। কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের হতাশার বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে, সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে, ছুটছে সাবেক চ্যাম্পিয়নরা।
ক্লাব পর্যায়েও গত মৌসুম দারুণ কেটেছে কুবার্সির। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জিতেছেন। দলটির দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে ছুঁয়েছেন ১০০ ম্যাচ খেলার মাইলফলক। এ তালিকায় প্রথমজন, কুবার্সিরই জাতীয় দল ও ক্লাব সতীর্থ লামিন ইয়ামাল।

কুবার্সির এই পথচলা শুরু হয়েছিল, স্পেনের উত্তর-পূর্ব প্রদেশ জিরোনার ছোট্ট গ্রাম এস্তানিওলে। যে গ্রামের অধিবাসীর সংখ্যা দুইশরও কম। যেখানে নেই কোনো ফুটবল মাঠ কিংবা স্কুল। পাশের গ্রাম ভিলাব্লারেশের স্কুলে যেতে হতো কুবার্সিকে। সেখানকার এক স্থানীয় ক্লাবে বাবা-মা রবের্ত-গ্লোরিয়া ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন। লক্ষ্যের পথে ছোটার সেই শুরু।
স্থানীয় ওই ক্লাবের জুনিয়র নারী ফুটবল দলের সদস্য ছিলেন হানা রেদোনদো। তিনি এখন জিরোনার মূল নারী দলের ডিফেন্ডার। তবে, রেদোনদো ভিয়াবারেক্সের তরুণদের বয়সভিত্তিক দলের কোচিংও করান। কুবার্সির সময়টা উঠে এলো তার কথায়, “সে রক্ষণে খেলত, কিন্তু বল পেলে দৌড়ে চলে যেত গোল করার জন্য। পাউ দলে থাকায় আমরা সবসময়ই লিগে জিততাম।”
সেই সময়ের এক মজার স্মৃতিও আওড়ালেন রেদোনদো। মূলত ডিফেন্ডার হলেও, মাঝেমধ্যে তিনি গোলকিপার হিসেবে খেলতেন। তো, এক ম্যাচে গোল হজম করে কেঁদে ফেলেছিলেন। কুবার্সি বল নিয়ে উপরে উঠে, সবাইকে পেছনে ফেলে গোল করে, ফিরে এসে তাকে নিয়ে উদযাপন করেছিলেন। এখনও অনেকে রেদোনেদোকে এই গল্প শোনান।
ভিলাব্লারেশে কুবার্সিকে আজও মনে করা হয়, চমৎকার একজন দলঅন্তপ্রাণ খেলোয়াড় হিসেবে। কুবার্সি সেই বিরল শিশু, যে বল পেলে মাথা নিচু না করে, বরং উঁচু করে ছুটত। বার্সেলোনার হয়ে খেলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার ছিল ছেলেবেলা থেকেই। লিওনেল মেসি ও নেইমার তার ছেলেবেলার নায়ক, যারা খেলতেন কাতালুনিয়ার ক্লাবটিতে একসময়।
স্বপ্নবাজ হলেও, কুবার্সি ছোটবেলা থেকেই বিনয়ী, রেদোনদো স্মৃতি আওড়ে বললেন, “আমরা একই স্কুলে যেতাম এবং সে কখনও নিজেকে অন্যদের চেয়ে ভালো মনে করত না। সে একটু আড়ালেই থাকতে চাইত।”
বন্ধুদের নিয়ে কুবার্সির বাড়িতে বসে বার্সেলোনার ম্যাচ দেখতেন রেদোনদো। চলতি উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপও তিনি দেখছেন গর্ব নিয়ে। দেখছেন, তার ছোট বেলার সতীর্থের ছুটে চলা।
জিরোনাতে কিছু দিন থাকার পর, ২০১৮ সালে, ১১ বছর বয়সে বার্সেলোনার একাডেমিতে যোগ দেন কুবার্সি। ইয়ামাল ও জিরোনার ডিফেন্ডার জিবের্ত জর্দানার সাথে আগে থেকে জানাশোনা ছিল তার। জর্দানা বললেন, ছোটবেলা থেকেই রক্ষণে দুর্দান্ত ছিলেন কুবার্সি।

“সে অবিশ্বাস্য। সে ভীষণ ভালো (খেলোয়াড়) ছিল। তাকে ফাঁকি দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল- তাকে পরাস্ত করতে হলে অন্তত দুই ‘বনাম এক লাগত’। সে ছিল স্পষ্টভাষী, একজন নেতা। ওই বয়সে যে কারোর চেয়ে, সে বেশি উদ্যোমী ও দৃঢ়চেতা ছিল।”
প্রতিপক্ষকে নিখুঁত ট্যাকল করায় কুবার্সির পারদর্শিতা ভোলেননি জর্দানা, “তবে, মাঠের বাইরে সে ছিল খুব শান্ত প্রকৃতির, কিন্তু খেলতে নামলেই সে ভিন্ন এক মানুষ হয়ে উঠত।” এ কারণে, এত অল্প বয়সে বার্সেলোনার হয়ে ১২৮টি এবং স্পেনের হয়ে ইতোমধ্যে ১৪টি ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে কুবার্সির। ২০২৪ সালে স্পেনের হয়ে অলিম্পিকসে ফুটবল ইভেন্টে সোনাও জিতেছেন তিনি।
একটা ক্ষেত্রেই কুবার্সি পারদর্শী ছিলেন না। জর্দানা সে গল্প শোনালেন, কিন্তু সেখানে উঠে এলো, কৈশরে কুবার্সির শখের ভিডিও গেমস না পাওয়ার কথাও।
“যখন আমরা অন্য কারো বাড়িতে যেতাম বা টুর্নামেন্ট খেলতে যেতাম, তখন সে ভিডিও গেমস খেলার সুযোগ পেত। কেননা, বাড়িতে তার এগুলো ছিল না। ভিডিও গেমস খেলায় সে ছিল যাচ্ছেতাই।”
ভিডিও গেমস তো আর কুবার্সির আঙিনা নয়। ফুটবলের সবুজে দাপিয়ে বেড়ানোর স্বপ্ন ছিল তার। এখন, বেড়াচ্ছেনও। জর্দানা অবশ্য এতে অবাক নন একটুও। তিনি উপভোগ করছেন, বিশ্বকাপে ইয়ামালের পারফরম্যান্সও। কুবার্সির মতো ইয়ামালও রাস্তায় ফুটবল খেলে, বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এতদূর এসেছেন। ২০১০ সালে প্রথম ও সবশেষ বিশ্বকাপ জেতা স্পেন এবার এই তরুণদের কাঁধে সওয়ার হয়েই পৌঁছাতে চাইছে চূড়ায়।