Published : 25 Jun 2026, 08:43 AM
ক্যানসাস সিটিতে যখন মুখোমুখি হবে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া, ম্যাচটি তখন যেন কেবল দুই দলের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব নিশ্চিত করার উপলক্ষ হয়ে উঠবে না! এই ম্যাচের আগে যে, ফিরে আসছে ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপের গিহনের সেই কলঙ্কিত স্মৃতি! যেদিন স্বপ্ন ভেঙেছিল প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা আলজেরিয়ার; পশ্চিম জার্মানি-অস্ট্রিয়ার ‘আতাঁতের’ কারণে!
যদিও, সেই স্মৃতির পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই ক্যানসাসে। গিহনের কাণ্ডের পর নিয়ম বদলে দেয় ফিফা। গ্রুপ পর্বের নানা সমীকরণ মেলাতে কোনো দল যেন ছলচাতুরির আশ্রয় না নিতে পারে, এজন্য শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ফিফা। এ কারণে, বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল ৮টায়, ‘জে’ গ্রুপের ম্যাচে যখন খেলতে নামবে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া; একই সময়ে ডালাসে লড়বে আর্জেন্টিনা-জর্ডান।
আর্জেন্টিনার নকআউট পর্ব অবশ্য নিশ্চিত হয়েছে আগেই। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে লিওনেল স্কালোনির দল ৬ পয়েন্ট নিয়ে পেরিয়ে গেছে গ্রুপের বৈতরণী। এই গ্রুপ থেকে পরের ধাপে যাওয়ার লড়াইটা মূলত চলছে, অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার মধ্যে। দুই দলেরই পয়েন্ট সমান ৩ করে। জর্ডান পয়েন্টের খাতায় আঁচড় ফেলতে পারেনি এখনও।
বিশ্বকাপে সবশেষ অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া একই গ্রুপে ছিল সেই ১৯৮২ সালের আসরে। ৪৪ বছর পর আবার যখন মুখোমুখি দুই দল, তখন আলোচনায় গিহনের পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে হওয়া সেই ম্যাচটি।
ওই আসরে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল আলজেরিয়াই। পশ্চিম জার্মানিকে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল তারা। অথচ, সেবারই প্রথম বিশ্বকাপের আঙিনায় পা পড়েছিল আলজেরিয়ানদের!
২৪ দলের প্রতিযোগিতায়, ছয় গ্রুপের সেরা এবং রানার্সআপের পরের ধাপে যাওয়ার নিয়ম ছিল। অস্ট্রিয়ার কাছে হারলেও পশ্চিম জার্মানি ও চিলিকে হারিয়ে পরের ধাপে এক পা দিয়ে রেখেছিল আলজেরিয়া। দুই জয়ে অস্ট্রিয়াও ছিল গ্রুপ পর্ব পেরুনোর পথে। ছিটকে যাওয়ার ভয় প্রবলভাবে জেগে উঠেছিল পশ্চিম জার্মানির আকাশে।
গিহনের ম্যাচটি হয়ে উঠেছিল পশ্চিম জার্মানির জন্য অগ্নিপরীক্ষা। তখন আলজেরিয়ার পয়েন্ট ৪, গোল ব্যবধান ০। অস্ট্রিয়ার পয়েন্টও ৪, গোল ব্যবধান +৩। পশ্চিম জার্মানির পয়েন্ট ২, গোল ব্যবধান +২। অর্থাৎ জয়ই একমাত্র পথ ছিল জার্মানির জন্য। অন্যদিকে, বড় ব্যবধান হারলে ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল অস্ট্রিয়ারও।
কিক অফের বাঁশি বাজতেই দর্শক, সমর্থক, বোদ্ধা-সবাই দেখলেন অবিশ্বাস্য সব কাণ্ড ঘটতে। দশম মিনিটে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। এরপর শুরু হয় ‘নাটক’। গ্রুপ সেরা হওয়ার কোনো তাড়নাই দেখায়নি অস্ট্রিয়া। ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টাও করেনি পশ্চিম জার্মানি। পুরোটা সময় যেন ‘মিলেমিশে’ বল চালাচালি করে সময় কাটিয়ে দেয় দুই দল।
পশ্চিম জার্মানি ১-০ গোলে জিতে, সব সমীকরণ মিলিয়ে, আলজেরিয়ার হৃদয় ভেঙে, ফুটবলপ্রেমীদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, অস্ট্রিয়াকে সাথে নিয়ে উঠে যায় পরের ধাপে। গ্রুপ পর্ব শেষে তিন দলের পয়েন্ট সমান ৪ করে, গোল পার্থক্যে পশ্চিম জার্মানি (+৩) গ্রুপ সেরা, অস্ট্রিয়া (+২) রানার্সআপ; ছিটকে যায় আলজেরিয়া (গোল পার্থক্য, ০)।
গিহনের ওই দুঃস্মৃতি নিয়ে আলজেরিয়ার সাবেক ফুটবলার রাবাহ মাজের বলেন, তারা কিছুটা অনুমান করতে পারলেও হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
“যদিও এটা কিছুটা প্রত্যাশিত ছিল, তবুও আমরা সবাই ক্ষুব্ধ, হতাশ ও হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আলজেরিয়ার মতো একটা ছোট দেশ, যারা বিশ্বকাপে প্রথম খেলতে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করছে, তাদেরকে বিদায় করে দেওয়ার জন্য ফুটবলের দুটি বড় দেশ সমঝোতা করতে পারে, আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।”
জার্মানির ক্রীড়া সাময়িকী কিকার ওই ম্যাচের বর্ণনায় লিখেছিল, “২০ মিনিট পর, আক্রমণের তীব্রতা কমে যায়। অন্যদিকে, অস্ট্রিয়া আক্রমণে ওঠার সময় সামনে পাওয়া বাড়তি জায়গা কাজে লাগানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। হঠাৎ করেই মনে হতে থাকে, কেউ যেন সিরিয়াস ফুটবলটা খেলতে আর আগ্রহী নয়। এরপর যা ঘটল, পাস দেওয়া-নেওয়ার এক অন্তহীন খেলা, খুব কম চ্যালেঞ্জ দেখা গেল এবং কোনো তাড়নাই ছিল না কারো মধ্যে। মূলত ভুল পাসের কারণে পজেশন হাতছাড়া হচ্ছিল।”
ফ্রেঞ্চ দৈনিক লেকিপ তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে লিখেছিল, দুই দলের খেলোয়াড়দের ২২টি লাল কার্ড দেওয়া উচিত ছিল। স্পেনের দর্শকরা, বিশেষ করে দেশটিতে থাকা আলজেরিয়ান সমর্থকেরা তাদের সাদা স্কার্ফ নেড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, সাদা স্কার্ফ নাড়ানো ঐতিহ্যভাবে চূড়ান্ত অপমান, অসম্মতির প্রতীক। অস্ট্রিয়ান টেলিভিশনের ধারাভাষ্যকার রবার্ট সেগার তার দর্শকদের রাগে-ক্ষোভে বলেছিলেন ‘টিভি বন্ধ করুন’।
১৯৭৪ বিশ্বকাপ জয়ী জার্মান ডিফেন্ডার পল ব্রেইটনার অবশ্য গিহনের ওই কাণ্ডে সামান্য ভুলই দেখেন। বলেন, ‘মানুষ বোকা, তারা যদি এটা না বোঝে যে, এখানে যোগ্যতা অর্জন করাই (পরের ধাপে যাওয়া) আসল কথা।”
আলজেরিয়ার প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে, সেসময় ফিফার রায়ও ছিল অদ্ভূত। সংস্থাটি বলেছিল, দলগুলোর তাদের মতো করে নিস্ক্রিয়ভাবে খেলার অধিকার আছে।
সেবার ইংল্যান্ড ও আয়োজক স্পেনকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় ধাপের গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে সেমি-ফাইনালে উঠেছিল পশ্চিম জার্মানি। ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর, তারা হেরেছিল ইতালির কাছে। দ্বিতীয় ধাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় ঘণ্টা বেজেছিল অস্ট্রিয়ার।
ওই কাণ্ডের পর ফিফা নিয়ম বদলায়। কেউ যেন সুবিধা না নিতে পারে, এ কারণেই গ্রুপের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে মাঠে গড়ায়।
কিন্তু গিহনের সেই কলঙ্কিত অধ্যায় এখনও ভোলেনি ফুটবল বিশ্ব, বিশেষ করে আলজেরিয়ানরা। মাজেরের কথাতেই আছে অকাট্য প্রমাণ, “ওই ঘটনার পর অনেকে ক্ষমা চেয়েছে। আপনি কারো ক্ষতি করলে সেটা স্বীকার করা ভালো, কিন্তু এতে আমাদের জন্য কিছুই বদলায়নি।”
বদলায়নি বলেই, ক্যানসাসের ম্যাচের আগে গিহনের কলঙ্কিত স্মৃতি ফিরে আসছে।