Published : 29 May 2026, 10:35 PM
ঈদুল আজহার পরদিন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আহসান মঞ্জিলে দেখা গেল শিশু থেকে মধ্যবয়সী শত শত দর্শনার্থীর উচ্ছ্বসিত ভিড়।
শুক্রবার বিকেলের দিকে রোদের তীব্রতা কমতেই ঐতিহাসিক এ স্থাপনা ঘিরে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। আহসান মঞ্জিলের প্রধান ফটকে দেখা যায় টিকিট সংগ্রহের দীর্ঘ লাইন।
ঈদের ছুটি ও সাপ্তাহিক অবকাশের সুযোগে অনেকেই পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর এই ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে এসেছিলেন।
তারা রাজপ্রাসাদের আদলে নির্মিত এই ভবনের গোলাপি রঙের সৌন্দর্য উপভোগ করেন এবং নবাবি যুগের বিভিন্ন স্মারক ঘুরে দেখেন।
ঢাকা শহরের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত আহসান মঞ্জিল ঢাকার নবাব পরিবারের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষণ করে আসছে।
১৮৭২ সালে নওয়াব আবদুল গনি তার পুত্র খাজা আহসানুল্লাহর নামে এ ভবনের নামকরণ করেন 'আহসান মঞ্জিল'। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে প্রায় ১০০ বছর এই প্রাসাদ ছিল বাংলার একটি প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র।

স্বাধীনতার পর অবহেলায় ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। তবে ১৯৭৪ সালে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাসাদটি সংরক্ষণ করে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। সরকারের অধিগ্রহণ ও সংস্কার কার্যক্রম শেষে ১৯৯২ সালে ভবনটি জাদুঘর হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।
শুক্রবার বিকেলে আহসান মঞ্জিল দেখতে আসা ভিড়ের মধ্যে কথা হয় পুরান ঢাকার বাংলাবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীতে পড়ুয়া স্পর্শিয়া ইকবালের সঙ্গে।
অস্পষ্ট কন্ঠে সে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলে, “আমার এখানে অনেক ভালো লাগছে। নতুন জামা পড়ে ঘুরতে এসেছি। এখানে অনেক ছবি, ফুল আছে। আমি অনেক ছবি তুলেছি। সকালে পার্কে গিয়েছিলাম, আইসক্রিম খেয়েছি, দোলনায় উঠেছি-অনেক মজা করেছি।”
তার সাথে যোগ করেন বাবা জাফর ইকবাল। তিনি বলেন, “স্পর্শ ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। কিন্তু আমরা মা বাবা দুজনেই চাকরির ব্যস্ততায় তাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারি না। সাধারণত সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বের হলে স্পর্শ অনেক খুশি হয়। আসলে বাচ্চাদের যদি মনে আনন্দ না থাকে তাহলে তাদের বিকাশটা সঠিকভাবে হয় না। আর পুরান ঢাকার এদিকে আহসান মঞ্জিল ছাড়া আর কি-ই বা আছে?'
প্রাসাদের ৩১টি কক্ষের মধ্যে ২৩টি বর্তমানে প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে ৯টি গ্যালারি জার্মান আলোকচিত্রী 'ফ্রিটজ ক্যাপ' এর ছবির ভিত্তিতে মূল পরিবেশের আদলে সাজানো হয়েছে। বাকি ১৪টি কক্ষে প্রাসাদের ইতিহাস, নবাব পরিবারের বংশপরিচয়, নবাব সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক অবদান, ঢাকায় প্রথম বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে নবাবদের ভূমিকা এবং তৎকালীন সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক সৌন্দর্যের জন্য আহসান মঞ্জিল রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ।
খেলা ও ঘুরে বেড়ানোর ছলে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানকে বাংলার শতবর্ষী ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। নবাবদের বংশধর সম্পর্কে ধারণাসহ তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র, সরঞ্জাম ও যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।

মোহাম্মদপুর এলাকার ব্যবসায়ী শিপন তালুকদার আহসান মঞ্জিলের এসেছেন তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছেলের আম্মু অসুস্থ থাকায় ঈদে বের হতে পারেনি। কিন্তু ছেলের বায়না তো রাখতে হবেই। তাই আহসান মঞ্জিলে নিয়ে এলাম, যেন সময়টা ওর জ্ঞান আহরণেও ব্যয় হয়। আমি খেয়াল করে দেখলাম বইয়ের পাতায় যে জিনিসটা তার মনযোগ পায় না সেই একই বিষয়বস্তু দেখার ক্ষেত্রে তার আগ্রহ অনেক। এজন্য ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে বের হলে আমি এরকম জায়গাকেই প্রাধান্য দিই।”
নবপরিণীতা স্ত্রীকে নিয়ে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা থেকে আহসান মঞ্জিলে এসেছিলেন আহাদ মুন্সী। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা দুজন আপাতত ঢাকায় ঘুরছি। রবিবার ঢাকার বাইরে যাব। আমার ওয়াইফ পুরান ঢাকা তেমন দেখেনি। তাই তাকে নিয়ে আশপাশটা একটু ঘুরছি। ঈদের ছুটিতে মানুষের ভিড়ে বেশিক্ষণ ভেতরে থাকা যাবে না। কিছুক্ষণ ঘুরেই বের হতে হবে।”

একটি ছবির মূল্য ৫ টাকা, বেছে নিলে ৭ টাকা
দর্শনীয় স্থানে দর্শনার্থীদের ভিড় যেখানে, পেশাগত ফটোগ্রাফারদের আনাগোনাও সেখানে। গলায় একটি আধুনিক ক্যামেরা ঝুলিয়ে দর্শনার্থীদের কাছে কাছে যাচ্ছিলেন আর ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করছিলেন তারা।
একটি ছবি তুলতে পাঁচ টাকা আর বাছাই করে ছবি নিলে প্রতিটির দাম সাত টাকা করে চাইছিলেন এই আলোকচিত্রীরা। অবশ্য ঈদ কিংবা কোন বড় জমায়েতের দিনে দুই থেকে তিন টাকাতেও ছবি তুলে দেন তারা।
এমনি একজন ফটোগ্রাফারের নাম অনিক কুমার দাস। স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন কবি নজরুল সরকারি কলেজে।
অনিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূলত শখের বশে ক্যামেরা কিনেছিলাম। এরপর দক্ষতা তৈরি হলে দেখলাম, এই ক্যামেরা দিয়ে উপার্যনও করা যায়। বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি তুলে ক্যামেরার দাম অনেক আগেই উঠে গেছে। রমনা পার্ক, আহসান মঞ্জিল, চিড়িয়াখানাসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে গেলে কিছু আয় রোজগার হয়। আমি আমার এই কাজ উপভোগ করি।”
আহসান মঞ্জিলের প্রধান ফটকে দায়িত্বরত আনসার সদস্য জুয়েল বলেন, “দর্শনার্থীর চাপ এত বেশি যে অনেকেই ভুলবশত প্রবেশপথের বদলে বহির্গমনপথে চলে আসছেন। তাদের সঠিক পথনির্দেশনা দিতে হচ্ছে। অধিকাংশ দর্শনার্থী সরাসরি এসে টিকিট সংগ্রহ করেন বলে মূল ফটকের সামনে ভিড় তুলনামূলক বেশি।”
সিকিউরিটি ইনচার্জ মানিক চন্দ্র দে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বৃহস্পতিবার সপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও ঈদের দিন হওয়ার কারণে এবার আহসান মঞ্জিল খোলা রাখা হয়েছিল।

“তবে সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ হওয়ার কারণে ঈদের দিন তেমন ভিড় ছিল না। আজ ৩টা থেকেই দর্শণার্থী প্রবেশ করতে পেরেছেন। আবার শনিবার, রোববার সকাল ১০টা থেকে সারাদিন খোলা থাকবে।”
বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীদের জন্য আহসান মঞ্জিলের প্রবেশমূল্য ৪০ টাকা। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ছাড়ে টিকেটের দাম ২০ টাকা।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রতি টিকেটের দাম ৫০০ টাকা, আর সার্কভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ৩০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
অনলাইনে টিকেট কেনার ক্ষেত্রে টিকেট দামের সঙ্গে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করতে হয়।
শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত আহসান মঞ্জিল দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। শুক্রবার প্রবেশের সময় বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি।