Published : 04 Mar 2026, 07:48 PM
চব্বিশের আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা শেষ হয়েছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা।
সাক্ষ্যে তিনি এ অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ ও আলামত কবে, কখন ও কোথা থেকে জব্দ করেছেন তা আদালতের সামনে তুলে ধরেন। এছাড়া জয় ও পলকের ফোনালাপসহ অন্যান্য ডিজিটাল আলামত কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, সেটির বিস্তারিত বিবরণ দেন তিনি।
প্রথম সাক্ষীর জেরা শেষে ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ১০ মার্চ দিন ধার্য করেছে।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে বুধবার এ কার্যক্রম শেষ হয়। ট্রাইব্যুনালের বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন প্রধান কৌঁসুলী আমিনুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, সুলতান মাহমুদ, গাজী এম এইচ তামিমসহ অন্য প্রসিকিউটররা।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামি পলকের পক্ষে তানভীর হাসান জোহাকে জেরা করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। অন্যদিকে পলাতক আসামি জয়ের পক্ষে জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী মনজুর আলম।
জেরায় টিটোর এক প্রশ্নের জবাবে জোহা বলেন, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) তাদের নিজস্ব সার্ভার থেকে এ মামলা সংক্রান্ত রেকর্ড সরবরাহ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি সরকারের আইসিটি বিভাগের অধীন একটি প্রকল্পে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পলকের কণ্ঠস্বর সংবলিত কোনো অডিও-ভিডিও বা মোবাইল ফোন সরাসরি জব্দ করেছেন কি না¬–আইনজীবীর এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা না সূচক উত্তর দেন।
তবে তিনি বলেন, “সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কল রেকর্ড জব্দ করা হয়েছে। তাদের কথোপকথনের মধ্যে বি-পার্টি হিসেবে পলকের কণ্ঠস্বর রয়েছে। পলকসহ এ মামলার সব অডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে।”
জেরার সময় জোহা কখনও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) বা পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) কর্মরত ছিলেন কি না, তা জানতে চান আইনজীবী টিটো। জবাবে তিনি এসব সংস্থায় কাজ করেননি বলে জানান।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার তদন্ত শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ৩২ জনের সাক্ষীর তালিকা ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে।
এর মধ্যে আহত ভুক্তভোগী, নিহতদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বিটিআরসি ও টেলিযোগাযোগ কর্মকর্তা, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা রয়েছেন।
পাশাপাশি দালিলিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ, জব্দ তালিকা, আলামত এবং বিশেষজ্ঞ মতামতও দাখিল করা হয়েছে।
সাক্ষ্য ও জেরা শেষে প্রসিকিউটর জোহা সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে মূলত দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। লাইভ সিস্টেম থেকে সংগ্রহ করা ‘লগের’ মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। কীভাবে এলাকাভিত্তিক ইন্টারনেট শাটডাউন কার্যকর করা হয়েছিল তা দেখানো হয়েছে।
তার ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে ধাপে ধাপে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ ও গুগলসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধের নির্দেশ ইমেইল ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরদের কাছে পৌঁছানো হয়। এসবের সম্পূরক সমন্বিত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এনটিএমসি থেকে জব্দ করা তথাকথিত ‘গ্যাং অব ফোর’- এর সদস্যদের কথোপকথনের অডিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি লাইভ সিস্টেম থেকে জব্দ করা ভয়েস ডেটার অডিট লগসহ আনুষঙ্গিক তথ্যও জমা দেওয়া হয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধে জয় সরাসরি কোনো নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না– সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে জোহা বলেন, “সাবেক আইসিটি উপদেষ্টা ওই সময় দেশের বাইরে ছিলেন এবং অধিকাংশ যোগাযোগ অনলাইনে হয়েছে। জব্দ করা মোবাইল ফোনগুলোর ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে। কিছু টেক্সট ও ভয়েস মেসেজ এরই মধ্যে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেলে তা পরবর্তী ধাপে দাখিল করা হবে।”
জয় ও পলকের নির্দেশ প্রমাণের বিষয়ে তিনি বলেন, “সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। উচ্চপর্যায়ের কমান্ড স্ট্রাকচারকে পাশ কাটিয়ে এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বিদ্যমান তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হবে।”
মোবাইল অপারেটর রবির জমা দেওয়া নথির বিষয়ে তিনি বলেন, “অপারেটরটিকে ইমেইল করা হয়েছিল এবং একটি বিশেষায়িত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিক করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের নোটও তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে।”