Published : 01 Mar 2026, 01:05 AM
ফরিদপুর থেকে আসা মো. রুবেল যাবেন সৌদি আরবে। রাত ১টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে তার যাওয়ার কথা। একই গন্তব্যের সৌদিয়া এয়ারলাইন্সে যাত্রী ওঠানো শুরু হলেও বিমান থেকে তাদের কিছু জানানো হয়নি।
বিমানের যে হটলাইন নম্বরে (১৩৬৩৬) যাত্রীদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে, সেটাও রাত ৮টা থেকে বন্ধ। অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগ নিয়ে রুবেল অন্যদের সঙ্গে বসেছিলেন ২ নম্বর টার্মিনালের উল্টোপাশের ফুটপাথে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হঠাৎ করে অনেকগুলো ফ্লাইট স্থগিত হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে শত শত যাত্রী।
দাম্মাম, কুয়েত, দুবাই, আবুধাবি, দোহা, বাহরাইনসহ বিভিন্ন গন্তব্যের ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনেক ওমরাহ যাত্রীও আটকে পড়েছেন।
শনিবার রাত ১০টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায় হাজার হাজার মানুষ টার্মিনালের সামনে আর উল্টোপাশের ওয়াকওয়েতে দাঁড়িয়ে বা বসে রয়েছেন।
পুলিশ ও আনসার সদস্যরা বাঁশি বাজিয়ে, মাইকে অনুরোধ করে, ধমক দিয়ে তাদের সরানোর চেষ্টা করছে। যাত্রীদের বেশিরভাগই ঢাকার বাইরে থেকে আসায় তারা কোথায় ফিরে যাবেন এমন দিশাও পাচ্ছেন না।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আটকে পড়া যাত্রীদের রাতযাপনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাত ১১টা পর্যন্ত বিমান বন্দরে এমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সন্ধ্যায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক বার্তায় বলা হয়, “মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির কারণে কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে, সম্মানিত যাত্রীদেরকে নিজ নিজ এয়ারলাইন্স ও ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ পূর্বক যাত্রা নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”
এরপর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে কয়েকটি রুটের ফ্লাইট স্থগিত করার বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিমানের পক্ষ থেকে পাঠানো বার্তায় বলা হয়, “মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দাম্মাম, জেদ্দা, মদিনা, রিয়াদ, শারজাহ, আবুধাবি, দুবাই, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল গন্তব্যে বিমানের সকল ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। উক্ত গন্তব্যে যাত্রা করতে ইচ্ছুক সকল যাত্রীদের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাথে যোগাযোগ না করে বিমানবন্দরে না আসার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।”
ওই বার্তায় যাত্রীদের ১৩৬৩৬ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

তবে যাত্রীরা বলছেন, বিমানের ওই হটলাইন নম্বর কার্যকর না। তাদের ভাষ্য একই গন্তব্যের অন্য রুটের ফ্লাইট যাচ্ছে। কিন্তু বিমানের ফ্লাইটের কোনো তথ্য ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে মনিটরে নেই।
বিমানের যাত্রীরাই মূলত ওই মনিটরের সামনে ভিড় করেছেন বেশি। মনিটরের নিচে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্থগিত সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি সাঁটানো রয়েছে।
ডিসপ্লে বোর্ডে দেখাচ্ছে সৌদি আরবের জেদ্দা, রিয়াদের উদ্দেশ্যে সৌদিয়া, এয়ার এরাবিয়ার ফ্লাইট যথাসময়ে ছেড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। কোনোটার চেক-ইন চলছে তো কোনটাতে যাত্রী ওঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিমানের কাছ থেকে তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ তুলে রুবেল নামের এক যাত্রী বলেন, “আমিও পয়সা দিয়ে টিকিট কাটছি আর সৌদিয়ার যাত্রীরাও টিকিট কাটছে। সৌদিয়ার যাত্রীদের এয়ারলাইন্সের লোকেরা আইসা ভেতরে নিয়ে গেছে। ওদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতেছে।
“আর আমরা ভাইসা বেড়াইতেছি। হটলাইন একটা নম্বর ধরায় দিছে (১৩৬৩৬)। ওইটা রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এখন বাজে রাইত ১০টা। এখন ফোন করলে থ্যাঙ্কিউ কইয়া কাইটা দেয়।”
তিনি বলেন, “কিছুক্ষণ আগে ভিতরে গেলাম। প্রচুর মানুষ সেখানে, ভীষণ গরম। কিন্তু ফ্লাইট কখন ছাড়বে সেই তথ্য দিচ্ছে না তারা। এই মনিটরেও বিমানের টাইমে ফাঁকা দেখাচ্ছে। ক্যান্সেল হইছে এমন কথাও তারা বলতেছে না। এখন আমরা কী করব বলেন।”

সৌদি আরবের জেদ্দায় যাওয়ার জন্য ইমিগ্রেশন শেষ করে বেলা ৩টায় বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইটে চেপে বসেছিলেন আব্দুল জলিল। ৩টা ৫০ মিনিটের ফ্লাইট সন্ধ্যা পর্যন্ত ওড়েনি। উড়োজাহাজের ভেতরেই তাদের ইফতার দেওয়া হয়। এরপর মাগরিবের নামাজের পরে তাদের উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে আনা হয়।
আব্দুল জলিলের সঙ্গে যখন দেখা হল, তখন তিনি বিমান বন্দরের বাইরে লাগানো মনিটরে ফ্লাইটের সময়সূচি দেখছিলেন। তিনি বললেন, “এইখানে (মনিটরে) দেখাইতেছে সৌদিয়ার জেদ্দার ফ্লাইট যাইতেছে। এয়ার এরাবিয়ার জেদ্দার ফ্লাইটে চেক-ইন শুরু হইছে। শুধু বিমানের কুনো খবর নাই। ভিতরে গেলেও খবর দিতেছে না।”
২৩ বছর ধরে সৌদি প্রবাসী আব্দুল জলিল বলেন, তার ভিসার মেয়াদ আছে একদিন। আর তিনি টিকিট কেটেছিলেন সৌদি আরব থেকে। তার টিকিটে সৌদি আরবের নম্বর দেওয়া। এখন তার হাতে যে ফোনটি রয়েছে সেটিতে কোনো সিমও নেই। যে কারণে এয়ারলাইন্স থেকে কোনো বার্তা দিলেও তিনি পাবেন না। কাজেই তথ্য পেতে এই মনিটরের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে।
সরকারে উদ্যোগ থাকলেও সুফল নেই যে কারণে
রাত ৮টার দিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, আটকে পড়া যাত্রীদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের বার্তায় বলা হয়, “মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কিছু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সম্মানিত যাত্রীদের অপ্রত্যাশিত অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে। যে সকল যাত্রীর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, তাদের রাত্রিযাপন সুবিধা প্রদান করা হবে। এজন্য প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক অথবা লাউঞ্জ-এ যোগাযোগ করার জন্য যাত্রীদেরকে অনুরোধ করা হল।”
তবে রাত ১১টা পর্যন্ত টার্মিনাল এলাকায় এরকম উদ্যোগের বাস্তবায়নের কোনো চিত্র দেখা যায়নি। মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমকে বিষয়গুলো জানালেও টার্মিনালে আটকে থাকা যাত্রীরা বেশিরভাগই গণমাধ্যম বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেই তথ্যগুলো পাচ্ছেন না।

অনেকের কাছে ফোন থাকলেও ইন্টারনেট সংযোগ নেই। আবার অনেকেই টিকিট কেটেছেন তিনি যে দেশে থাকেন সেই দেশ থেকে সেই দেশের ব্যবহৃত নম্বর দিয়ে। ফলে এয়ারলাইন্স তার সঙ্গে সেই নম্বরে যোগাযোগ করলেও তিনি সেই তথ্য পাবেন না।
এসব অনিশ্চয়তার কারণে বিমানবন্দরে এসে আর ফিরে যাচ্ছেন না যাত্রীরা। আবার অনেকে বলছেন তাদের কাছে ফিরে যাবার টাকাও নেই।
ইউএসবাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রী ইব্রাহিম খলিলেল ফ্লাইট ছিল রাত সোয়া ১০টায়। তিনি যাচ্ছিলেন মাস্কাট। তিনি বলেন, “সকাল বেলা বাড়ি থাইকা বাইর হইছি। এখন বাজে রাত ১০টা। আমরা বাড়ি যামু না এইখানে বইসা থাকমু বুঝতাছি না।”
ফ্লাইট ইনফর্মেশন ডিসপ্লেতে দেখাচ্ছে ইউএসবাংলা এয়ালাইন্সের ফ্লাইটটি ‘ক্যান্সেল’ করা হয়েছে। জানানো হলে ইব্রাহিম পকেট থেকে ৩০০ টাকা বের করে দেখিয়ে ইব্রাহিম বলছেন, “আমি তো বাংলা টাকা সব দিয়া আসছি। কিছুই রাখিনি। এখন বাড়ি যাব কীভাবে, এখানে থাকব কোথায়, এসব নিয়া চিন্তায় আছি।”
একজন নারী যাবেন জেদ্দায়। দুই ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে বসে ছিলেন একটি ট্রলির ওপর। তিনি বললেন, “আমারে থুইয়া পোলারা যাইব না। আবার আমি ভিতরে গিয়াও জানতে পারিনি ফ্লাইট কখন যাইব। এজেন্সির ধারে ফোন দিছি, দেখি ওরা কী করে।”

যাত্রীদের পাশে আছে সরকার: ধর্মমন্ত্রী
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের পাশে থাকার কথা বলেছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।
তিনি বলেন, “সরকার মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।”
রাতে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধর্মমন্ত্রী বিমানবন্দর পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হন। আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্বেগের কথা শোনেন এবং এই কঠিন সময়ে সরকার তাদের পাশে রয়েছে বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করেন।
যাত্রীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণেই যে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সে বিষয়ে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত তাদের যাত্রা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।”

তিনি সকলকে ধৈর্য ধারণেরও আহ্বান জানান।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আকাশপথ ও আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে আগ্রহী এবং বর্তমানে আটকে পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
কয়েকটি দেশ এক্ষেত্রে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে জানিয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, “বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে অবস্থানরত কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে, যাতে উদ্বেগ নিরসন করা যায়।”
তেহরানে বাংলাদেশ মিশনের স্থাপনা, কূটনীতিক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ইরানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরুর কথাও বলা হয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।