Published : 24 Jun 2026, 10:37 PM
রপ্তানি আয়ের ফোলানো-ফাঁপানো তথ্য প্রকাশের অভিযোগ নিয়ে শোরগোলের পর পেরিয়ে গেছে দুই বছর; আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেখা বাংলাদেশে এখন বিএনপির শাসন চলছে, কিন্তু পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যানে গরমিল রয়েই গেছে।
বিদায় নিতে চলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসের (জুলাই-মে) রপ্তানি তথ্য প্রকাশ করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) তথ্য প্রকাশ করেছে। এই দুই পরিসংখ্যান মেলালে দেখা যাচ্ছে, ১০ মাসে ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের পার্থক্য থাকছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার।
আর গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো সময়ে ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের পার্থক্য ছিল ৪৩১ কোটি ডলার।
এই গরমিল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “এত কিছুর পরও ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে কেন ব্যবধান হচ্ছে বুঝতে পারছি না। এটা মোটেও কাম্য নয়।”
রপ্তানি আয়ের হিসাবে বড় গলদ ধরা পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। তখন অভিযোগ ছিল, রপ্তানি আয় বেশি দেখাতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ফোলানো-ফাঁপানো তথ্য দিচ্ছে।
এ নিয়ে শোরগোলের পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইপিবি রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশই বন্ধ করে দেয়। তখন বলা হয়, পণ্য রপ্তানি থেকে আয়ের ‘প্রকৃত’ তথ্য প্রকাশ করা হবে, সেজন্য দুই-তিন মাস সময় লাগবে।
তার পরের মাসেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। মুহাম্মদ ইঊনূসের নেতৃত্বে দায়িত্বে আসে অন্তর্বর্তী সরকার।
এরপর ৯ অক্টোবর ইপিবি চার মাসের (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করে। ইপিবির তখনকার ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন সেদিন সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ইপিবি রপ্তানির তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে। সেখানে একই রপ্তানির তথ্য একাধিকবার হিসাব করা হয়েছিল বলেই গরমিল দেখা দেয়।
ইপিবি, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য সমন্বয় করে প্রতি মাস পরপর রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করা হবে বলেও সে সময় জানিয়েছিলেন তিনি।
তারপর দুটি আর্থিক বছর শেষ হতে চলল, পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যান নিখুঁত হল না।
২০২৫ সালের ৩০ জুন ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়; ২ জুলাই ওই আর্থিক বছরের রপ্তানি আয়ের তথ্য প্রকাশ করে ইপিবি।
তাতে দেখা যায়, পণ্য রপ্তানি থেকে সেবার ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ৩৯ লাখ (৪৮.২৮ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) চেয়ে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি।
এরপর ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালান্স অব পেমেন্ট-বিওপি) তথ্য প্রকাশ করে। তাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪ হাজার ৩৯৭ কোটি (৪৩.৯৭ বিলিয়ন) ডলার আয়ের তথ্য দেখানো হয়।
দুই হিসাব মেলালে দেখা যায়, ইপিবি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের যে হিসাব দিয়েছে, তার চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ৪৩১ কোটি ডলার কম।
২০২৬ সালের ৩ মে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করে ইপিবি। তাতে দেখা যায়, এই ১০ মাসে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৩ হাজার ৯৪০ কোটি (৩৯.৪০ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছেন রপ্তানিকারকরা, যা গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ কম।
অন্যদিকে গত ৮ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের তথ্য প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩ হাজার ৬০২ কোটি (৩৬.০২ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ইপিবি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের যে হিসাব দিয়েছে, তার চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ৩৯০ কোটি ডলার কম।
সবশেষ এপ্রিল মাসে ৪০১ কোটি ডলার রপ্তানির তথ্য দিয়েছে ইপিবি; বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য বলছে, পণ্য রপ্তানি থেকে ওই মাসে ৩ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে।
আগের মাস মার্চে ৩ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের তথ্য দিয়েছিল ইপিবি; কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মার্চে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার।
পণ্য রপ্তানির তথ্যে গরমিলের বিষয়টি ২০২৪ সালের ৩ জুলাই সামনে এনেছিল খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল, এত দিন ইপিবির পরিসংখ্যান ধরে রপ্তানির হিসাব করা হত। তবে সে অনুযায়ী দেশে রপ্তানি আয় আসছিল না। এ নিয়ে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা থেকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। সে কারণে প্রকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।

তখন দেওয়া দুই হিসাবের তুলনা করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির পণ্য রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানে গরমিল দাঁড়িয়েছিল ১ হাজার ৮১ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত সময়ে রপ্তানি আয় হয় ৪ হাজার ৭৩ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের (২০২২-২৩) একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ কম।
আর ইপিবি দাবি করেছিল, ওই ১১ মাসে (জুলাই-মে) রপ্তানি আয় হয়েছিল ৫ হাজার ১৫৪ কোটি (৫১.৫৪ বিলিয়ন) ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি।
পরে সংস্থাটি জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১২ মাসে ৪ হাজার ৪৪৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হযেছে ৪ হাজার ৮১ কোটি ডলার।
তার মানে ওই অর্থবছরে রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চেয়ে ৩৬৬ কোটি ডলার বেশি আয় দেখিয়েছিল ইপিবি।
সে সময় হিসাব করে দেখা যায়, তিন অর্থবছরের ৩৪ মাসে এনবিআরের চেয়ে ২ হাজার ২৬১ কোটি ডলার বেশি রপ্তানি আয় দেখিয়েছিল ইপিবি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, ইপিবির তথ্যে একই রপ্তানির পরিসংখ্যান বারবার দেখানোসহ কয়েকটি কারণে আয় বেশি দেখা যাচ্ছিল।
বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয় শুল্কায়নের পর। সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যভাণ্ডারে তা নথিভুক্ত হয়। স্থানীয় রপ্তানি (দেশের অভ্যন্তরে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল ও সরঞ্জাম সরবরাহ), নমুনা রপ্তানি ও প্রকৃত রপ্তানি—এই তিন ধরনের হিসাব থাকে এনবিআরে তথ্যভাণ্ডারে। রপ্তানি হওয়া পণ্য থেকে কত আয় দেশে আসে, তার হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া যায়।

এনবিআর ও ইপিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এনবিআরের কাছ থেকে হিসাব নিয়ে পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ইপিবি। এই পরিসংখ্যানের মধ্যে স্থানীয় রপ্তানি ও নমুনা রপ্তানির হিসাবও থাকে। সেগুলো বাদ দিলে প্রকৃত রপ্তানির তথ্য মিলবে।
তবে স্থানীয় রপ্তানি ও নমুনা রপ্তানির আলাদা কোনো কোড না থাকায় সেগুলো আলাদা করতে পারেন না ইপিবির কর্মকর্তারা।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা তখন বলছিলেন, রপ্তানির ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নীতি-নির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নিলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রপ্তানির হিসাব সঠিক না হলে ভবিষ্যতে এমন সঙ্কট আরও আসবে।
এখনও তথ্যের গরমিল থেকে যাওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ইভেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, “এখনও কেন ভুল-ত্রুটি হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করে যত দ্রুত সম্ভব সংশোধন হওয়া দরকার। ১০ মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের পার্থক্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তিনি বলেন, “পরিসংখ্যান সঠিক না থাকলে নীতি প্রণয়নে ভুল হবে, এটাই বাস্তবতা। ভবিষ্যতে রপ্তানি খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অনেক নীতিমালা লাগবে, তবে তথ্য পরিসংখ্যান সঠিক না থাকলে সেগুলো যথাযথ হবে না। এমনকি ব্যবসা সম্প্রসারণ ও লক্ষ্য নির্ধারণেও মারাত্মক ভুল হতে পারে।”

অর্থনীতির বিশ্লেষক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখনও বড় ব্যবধান কেন থাকবে? এটা ঠিক করা দরকার। এতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কাছে বাংলাদেশের ইমেজ নষ্ট হয়।
“আমার মনে হয়, ইপিবির তথেই সমস্যা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যই সঠিক। সামান্য ব্যবধান হতে পারে। কিন্তু ১০ মাসে ৪ বিলিয়ন ডলার গরমিল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
জানতে চাইলে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) গাইডলাইন মেনে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে ইপিবি পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যান প্রতি মাসে প্রকাশ করে। আমি নিজে কয়েক মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছি, খুব পার্থক্য নেই।”
তাহলে ১০ মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের গরমিল কেন–সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, “এত পার্থক্য থাকার কথা নয়। আচ্ছা আমি চেক করে দেখব।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেক আগেই তো এনবিআর, ইপিবি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বসে বিষয়টির সমাধান করেছিল। তারপরও কেনো এত গ্যাপ বুঝতে পারছি না। আমি আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে দেখব সমস্যাটা কোথায়?”