Published : 14 Jul 2025, 10:05 PM
জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী নারীদের অনেকে কেন এখন সামনে আসছেন না, সে বিষয়টি ভেবে দেখার তাগিদ দিয়েছেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ।
তিনি বলেছেন, “যারা এত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করল, তারা কেন মুখ লুকিয়ে ফেলল—এটাও বোঝা প্রয়োজন।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালার বিস্তারিত তুলে ধরতে সোমবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন উপদেষ্টা।
শারমীন এস মুরশিদ বলেন, “অনেক আহত নারী যারা ঘর বন্ধ করে লুকিয়ে আছে, সামনে আসছে না, ডিপ্রেশনে আছে, তারা কেমন আছে, দেখার কিন্তু আমাদের দায়িত্ব।”
সামাজিকভাবে এবং সাইবার স্পেসে নারীদের যে ‘অবিরাম বুলিংয়ের’ শিকার হতে হচ্ছে, সেই বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অনেক আজেবাজে কথা বলা হয়। কিন্তু এই মেয়েরা তো বীর যোদ্ধা। আমি বিশ্বাস করি, তারা এটার থেকে বেরিয়ে আসবে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।”
জুলাইয়ের নারী যোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এবং তালিকা করার জন্য মন্ত্রণালয় গবেষণার কাজে হাতে নিয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “সেটার মধ্য দিয়ে আমরা আশা করছি, প্রত্যেকটি নারীর চরিত্র, নারী যোদ্ধাকে আমরা খুঁজে পাব।”
এর মাধ্যমে তাদেরকে চিহ্নিত করা, কাউন্সেলিং দেওয়া, পাশে থাকা এবং কীর্তি সংরক্ষণের জন্য সেবা চালু করার কথা বলেন শারমীন মুরশিদ।
তিনি বলেন, "এত বড় পরিসরে (নারীদের অংশগ্রহণ) কনটেম্পোরারি হিস্ট্রিতে নেই, যেখানে এত নারী একসাথে আন্দোলনে নেমেছে। আন্দোলনকারীরা নিজেরাই আমাকে বলেছেন, প্রায় ৬৫ থেকে ৭৯ ভাগ মেয়ে ছিল, এবং এটা বিস্ময়কর। এর সূচনাও করে মেয়েরা—প্রথম স্লোগান, প্রথম ঘর থেকে বের হওয়া, প্রথম হোস্টেল থেকে বের হয়ে আসা—এটা যেমন আমাদের সকলের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
“ঠিক তেমনি আরেকটা অপূর্ব আমরা লক্ষ করেছিলাম, সেটি হচ্ছে ছেলেদের উপরে যখন আক্রমণ হচ্ছিল, মেয়েরা কীভাবে ছুটে গিয়ে ছেলেদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। ঠিক তেমনি আমরা এটাও দেখেছি যে, মেয়েদের উপরে যখন হামলা চালাচ্ছিল, ছেলেরা তখন দৌড়ে গেছে সেখানে মেয়েদেরকেও রক্ষা করার জন্য।”
জুলাইয়ের নারীরা বিভিন্ন রকমের বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে, তারা নিজেদের আড়ালে রেখেছে–এই অবস্থা থেকে তাদের বের করা যেত কিনা—এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, “এই বিষয়গুলো আমাদের গোচরে আসতে সময় লেগেছে। ১০ মাস হয়েছে, কিন্তু এখনো কিন্তু আমরা প্রতিটি যোদ্ধার কাছে পৌঁছাতে পারিনি।
“কারণটা হচ্ছে, যত সহজে আমরা বলে ফেলি, বাস্তবায়ন তার চাইতে অনেক বেশি কঠিন। এই ১০ মাসে আমাদের নারী যোদ্ধা, নারী শহীদদের বিষয়ে খুব একটা কাজ করেছি বলতে পারিনি। এখানে আমার বলা প্রয়োজন যে, আমরা নারী শহীদদের উপরে কাজ হাতে নিয়েছি এবং একটা ছোট্ট ভিডিও আমরা তৈরি করেছি, যেটা আমাদের এই মূল অনুষ্ঠানের ভিতরে থাকবে।”
এর মধ্যে যে কাজগুলো হয়েছে, সেগুলো যথেষ্ট শ্রমসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল জানিয়ে শারমীন মুরশিদ বলেন, “খুবই খুশি হতাম, যদি আমরা দ্রুতগতিতে পৌঁছে যেতে পারতাম, কিন্তু আমাদের সময় লেগেছে। কারণ এই মেয়েগুলো তারা নিজেরাও সামনে আসতে চায়নি। এখন আমরা যেটা করেছি, আমরা প্রায় ১০০ জন মেয়েকে নিয়োগ করেছি, তাদেরকে খুঁজে বের করার জন্য।
“যে তথ্যগুলো আমি পাচ্ছি, সেই তথ্যটা সত্যি—আমি জানি, আমাদের সবারই কষ্ট লাগবে। অনেক মেয়ে ইতিমধ্যে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা সামনে আসতে রাজি নয়, তারা কথা বলতে রাজি নয়, এবং তারা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেও রাজি নয়।”
উপদেষ্টা বলেন, “এখন এটা আমাদেরকে অ্যানালাইসিস করতে হবে যে, কেন আমার সমাজে মেয়েদের এই অবস্থাটা ঘটল। এবং আমাদের অবশ্যই দায়িত্ব আছে—তাদের পাশে গিয়ে, তাদেরকে কাউন্সেলিং করে, তাদেরকে নরমাল একটা জায়গায় আবার ফিরে আনা।
“এই জায়গাটায় সব প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই। তবে এই জিনিসটা খুব জরুরি—তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো এবং তাদেরকে সেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। যে মেয়েরা অল্প কিছুদিন আগে যুদ্ধ করল, তারা কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? তারা কেন ঘরে লুকোচ্ছে?”
এর সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “একটা হচ্ছে, যে হিংস্রতাটা আমরা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি—পলিটিক্যাল কারণে। অনেক কিছু, সেটাও তোমরা অনেকে জানো। এবং সেখানে মেয়েরা যে একটা শিকারে পরিণত হচ্ছে।
“তোমাদেরকে আবারও আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পরেও কিন্তু মেয়েরা হারিয়ে গিয়েছিল। এবার আমরা হারাতে দেব না বলেই আমরা তাদেরকে ঘরে ঘরে গিয়ে খুঁজছি। সময় লাগবে একটু, কিন্তু আমরা ওদেরকে ঠিকই বের করে আনব, ওদের প্রত্যেকজনের কাছে আমরা পৌঁছাব।”
অভ্যুত্থানের পরেও কেন ‘বুলিংয়ের সংস্কৃতি’ বন্ধ করা গেল না– এমন প্রশ্নে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বলেন, “জুলাই সবকিছু একেবারে ম্যাজিকের মত হয়ে যাবে—এটা ভাবা যেমন একটু অযৌক্তিক, অন্যদিকে আমার মন্ত্রণালয় একটি সাইবার ইউনিট খুলছে এই মাসে, যেটা চালাবে আমাদের জুলাই কন্যাদের একটা টিম।
“কাজ হচ্ছে দুটো—এটাকে ২৪ ঘণ্টা আমরা মনিটর করব, যে ভাষা ব্যবহার হচ্ছে, যে অ্যাবিউস হচ্ছে—সেই জায়গাটিতে। এগুলো কিন্তু ক্রিমিনাল কাজ। এগুলোকে যতখানি শাস্তির ভেতরে আনা যেত, ততখানি আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।”
তিনি বলেন, “পুলিশের একটা ইউনিট আছে, তারা কিন্তু চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এটাকে জোরদার করার জন্য। আমরা আমাদের মন্ত্রণালয়ে একটা ইউনিট খুলে এটা ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং-এর ভেতরে আনব।
“আমরা যেন অ্যাবিউসিভ ল্যাঙ্গুয়েজ, মেয়েদেরকে ছোট করা, হেয় করা, খারাপ ভাষায় গাল দেওয়া—এটাতো একটা রাজনৈতিক টুল। এটাতো আমরা যুগ যুগ ধরে জানি। এই জায়গাটি থেকে অল্টারনেটিভ ন্যারেটিভ আনতে হবে এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজটা আমরা শুরু করেছি, পুলিশের সাথে আমাদের একটা এমওইউ হতে যাচ্ছে, এবং আমরা দৃঢ়তার সাথে এই কাজটি করব।”
শারমীন এস মুরশিদ বলেন, “বট বলে একটা নতুন ফেনোমেনা আছে। এই বট কালচারটা কিন্তু খুব দৃঢ়ভাবে ব্যবহার হচ্ছে এই অপসংস্কৃতিটা ছড়ানোর ক্ষেত্রে। এবং তাদেরকে কিন্তু ধরা যায় না। বিদেশ থেকে যারা করছেন, তাদেরকেও ধরাটা আমাদের জন্য খুব কঠিন।
“কিন্তু দেশের যে অরাজকতা, দেশে যদি কেউ এই ক্রিমিনাল কাজগুলো করে, আমি বিশ্বাস করি যে আমরা যে কাজগুলো হাতে নিয়েছি, তার মধ্যে থেকে আমরা নিশ্চয় এটাকে আরেকটু ভালো অবস্থায় নিয়ে আসতে পারব।"
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা কিন্তু সাইবার প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্সটা করেছি, যাতে সাইবার স্পেসে নারীদের এবং শিশুদের... আমরা যেন এটাকে সেইফ স্পেস তৈরি করতে পারি, ওদের প্রোটেকশনটা এনশিওর করা হয়।
“আরেকটা হচ্ছে, আপনারা দেখেছেন মাগুরার ঘটনাটার পরে, ধর্ষণ মামলার পরে আমরা আমাদের আইনেও কিছু পরিবর্তন এনেছি নারী ও শিশুদের কেসের ক্ষেত্রে, এবং এটা খুবই আরও শক্ত করা হয়েছে।”