Published : 16 Mar 2026, 12:37 AM
বিদায় নেওয়ার কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দেশটি থেকে মাংস, পোলট্রি ও অন্যান্য প্রাণিজ পণ্য আমদানির ‘তীব্র বিরোধিতা’ করেছিলেন বলে দাবি করেছেন সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
শেষ দিন পর্যন্ত এই চুক্তির বিরুদ্ধে ‘লড়াই’ করেও তা ঠেকাতে পারেননি বলেও ‘আক্ষেপ’ করেছেন তিনি।
শনিবার রাজধানীর পান্থপথে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিম’ কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, “আমি শেষদিন পর্যন্ত এটার বিরোধিতা করেছি। কিন্তু আবার তখনকার সরকার হিসাবে আমি দায়ও নিচ্ছি যে ঠেকাতে পারিনি।
“এটার জন্য আপনারা দোষী করলে, আমার অবশ্যই কিছু করণীয় নাই। কিন্তু আমি এটা বলব।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি হয়।
ওয়াশিংটনে হওয়া এই চুক্তি ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়ক হবে’ বলে দাবি করেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
চুক্তিতে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতের জন্য ‘বিশেষ সুবিধা’ থাকার কথাও বলা হয়েছিল ওই সরকারের তরফে।
চুক্তিতে বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। কিন্তু চুক্তিতে এর বাইরে কী কী আছে, সে বিষয়ে সরকারের তরফে তখন কিছু বলা হয়নি।
‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ করার ছয়দিন পর ১৫ ফেব্রুয়ারি তখনকার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চুক্তির শর্ত, শুল্ক কাঠামো ও বাজার সুবিধার বিষয়গুলো তুলে ধরেছিল।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, প্রায় নয় মাসের ধারাবাহিক আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে সরকার শুল্ক হার ১৯ শতাংশে নামাতে সক্ষম হয়েছে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় সেই অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার চুক্তির গোপনীয়তা নীতির সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, “আপনারা একটা ভুল করছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তিটা নির্বাচনের তিনদিন আগে হয়নি। এটা প্রক্রিয়া কিন্তু আগে থেকে ছিল। যেটা নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট হওয়ার কারণে, মানে এটা, এটাই তো প্রশ্ন তোলা দরকার। যে একটা দেশের সাথে আরেকটা দেশের চুক্তি হচ্ছে সেখানে আমরা নন ডিসক্লোজার করার কথাটা মেনে নিয়ে বসে আছি।
“এটা আমরা কাউকেই বলতে পারবো না। সরকারের ভেতরেও, মানে সবাই সবটুকু জানতে পারবে না।”
সাবেক এই উপদেষ্টা বলেছেন, গত বছরের জুন মাসের দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাংস, পোল্ট্রির বাচ্চা, ক্যাটফিশসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির অনুমোদন পেতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি বলেন, “আমরা এটাতে বাধা দিয়েছিলাম। পরে আমরা শুনলাম যে যুক্তরাষ্ট্র ওদের, এটা এটা ঠিক যে ওদের অনেক হাই স্ট্যান্ডার্ডের টেস্টিং ফ্যাসিলিটি আছে, যেটা গ্লোবালি স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের দেশে আসতে হলে আমাদের তো কিছু টেস্টিংয়ের ব্যাপার আছে। বিশেষ করে জোনটিক ডিজিজের কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা, কোত্থেকে আসছে, এগুলো দেখার ব্যাপার আছে।”
তিনি বলেন, এ কারণে বাংলাদেশে আসতে হলে পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হলেও চুক্তিতে দেখা গেল তার বাইরে কিছু করা যাবে না।
“একদম মানে, ওটা মানতেই হবে।”
নাগরিক সমাজের একটি সভায় ‘এই চুক্তি গ্রহণযোগ্য না’ বলে মন্তব্য করেছিলেন, এমন দাবি তুলে ফরিদা আখতার বলেন, “তখন কিন্তু সরকার থেকে, মানে পাল্টা বক্তব্য দেওয়া হয়েছে যে আমি ঠিক বলিনি। এই যে ব্যাপার, এটা এত কঠিন।
“এত কঠিন একটা বিষয় সরকার মানতে বাধ্য, সেটা অন্য কথা। এখন বিএনপি কি করবে, সেটা আমি জানি না। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের তো কর্তব্য আছে। আমরা কেন এটা মেনে নেব?”
অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গেল ৪ মার্চ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির করার আগে এ বিষয়ে দুই রাজনৈতিক দল— বিএনপি ও জামায়াত থেকে ‘সম্মতি’ দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে এসে তিনি বলেন, “ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাদের প্রধান দুটি দলের প্রধানের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন এবং তারাও এতে সম্মতি দিয়েছিল।
“সুতরাং এমন না যে, এইটা আমরা অন্ধকারে করেছি।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য নাকচ করে সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সঙ্গে ‘আলোচনা করেনি’।
সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার দাবি করেছেন, গবাদিপশু পালনের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২ কোটি মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় স্বল্প দামে মাংস আমদানির ক্ষেত্রে তিনি ‘বেশি বাধা’ দিয়েছিলেন।
অতিরিক্ত উৎপাদনশীলতার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, “এগুলো তো ওভার প্রোডাকশন এবং এগুলো বিষ খাওয়া, সত্যি কথা বলতে কি এগুলো একেবারে বিষ খাওয়া।”
‘জেনেটিক্যালি মডিফাইড’ সয়াবিন ও ভুট্টা খাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অতিউৎপাদনশীল প্রাণীকে লালন-পালন করা হয় তুলে ধরে ফরিদা আখতার বলেন, “ওদের যেহেতু ওভার প্রোডাকশনকে, ওরা ওদের সমুদ্রে ফেলতে পারছে না, আমরা তাদের ডাম্পিং গ্রাউন্ড হতে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের খামারিদের মারাত্মক ক্ষতি হবে এজন্য।”
‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: ক্যাবের ১৩ দফা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক ওই আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বিএনপির চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য সাইমুম পারভেজ, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি এ কে এম ফজলুল হক, গবেষক ও লেখক মাহা মির্জা, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া এবং ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল সোহেল রানা।