Published : 07 Nov 2025, 12:02 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একের পর এক কাজ গুছিয়ে আনার মধ্যে এবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের অপেক্ষায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সংলাপের পর ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার কাজে নামার কথা রয়েছে সাংবিধানিক এ সংস্থাটির।
গত ৫ অগাস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন।
এ আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে পর দিন সরকারপ্রধানের দপ্তর চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশনকে।
এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন কমিশন জানিয়েছে, ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণা করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গুছিয়ে আনা হয়েছে।
ভোটার তালিকা, সীমানা নির্ধারণ, ভোটকেন্দ্র, নতুন দল নিবন্ধন (চূড়ান্ত ধাপে), পর্যবেক্ষক সংস্থা (চূড়ান্ত ধাপে), আইন সংস্কার, পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণসহ প্রধান কাজগুলো শেষ হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দলগুলোর নিবন্ধন দেওয়ার কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। সবশেষ আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। এখন দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা প্রস্তুত রয়েছে। শিগগির তা জারি হবে। আমাদের দিক থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ ধাপে রয়েছে।”
তফসিলের আগের ধাপে ইসি
ভোট সামনে রেখে অগাস্টে রোডম্যাপ ঘোষণার মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সূচি তুলে ধরে ইসি। সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী—
>> দল ও অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ শুরু হওয়ার কথা ছিল সেপ্টেম্বরে শেষ সপ্তাহে; শুরু হয় ২৯ সেপ্টেম্বর। দেড় মাসের মধ্যে সংলাপ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দলগুলোর সঙ্গে এখনো সংলাপ শুরু হয়নি।
>> ভোটার তালিকা হালনাগাদ: ২ মার্চ ও ৩১ অগাস্ট দুই ধাপে ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রকাশ করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত। তৃতীয় হালনাগাদ ভোটার তালিকার খসড়া শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ১৮ নভেম্বর।
>> নির্বাচনি আইন ও বিধি: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ কর্মপরিকল্পনা থেকে দুই মাস পরে ৩ নভেম্বর জারি হলো। এর আলোকে দুয়েক দিনের মধ্যে আচরণবিধি জারি হওয়ার কথা।
এছাড়া সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ আইন সংশোধন, ভোটার তালিকা আইন সংশোধন, সংসদ নির্বাচনের ভোটার কেন্দ্র নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা চূড়ান্ত; দেশি, বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সংবাদিক নীতামালা চূড়ান্ত করা, নির্বাচন পরিচালনা (সংশোধন) আইন ২০২৫, নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ সংশোধন অধ্যাদেশ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করেছে ইসি।
>> প্রশিক্ষণ : ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুত ও প্রশিক্ষণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
>> রাজনৈতিক দল নিবন্ধন: প্রাথমিক নিবন্ধন ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির কথা থাকলেও মধ্য নভেম্বরে শেষ হবে।
>> সীমানা নির্ধারণ: ৩০০ আসনের চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করেছে।
>> পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন: মধ্য অক্টোবরে শেষ করার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় বিলম্বিত হয়, নভেম্বরের মাঝামাঝি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
>> পোস্টাল ভোটিং ও ব্যালট: প্রকল্প অনুমোদন, সফটওয়্যার চূড়ান্ত, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, নিবন্ধন ও প্র্যাক্টিসিং মডিউল, প্রচারের কাজ অক্টোবরের মধ্যে গুছিয়ে আনে কমিশন। ১৬ নভেম্বর অ্যাপ উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রবাসে নভেম্বরে ব্যালট পেপার পাঠানো ও কারাবন্দিদের ভোটের দুই সপ্তাহ আগে ব্যালট পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
>> আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক কার্যক্রম ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা: অক্টোবরে প্রথম আইনশৃঙ্খলা সভা ও প্রথম আন্ত্রঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তফসিল ঘোষণার ১৫ দিন আগে এবং তফসিল ঘোষণার পর আবার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
টাইমলাইন থেকে ‘দুই-তিনটি বিষয়ে পিছিয়ে’
বুধবার কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা এগিয়ে গিয়েছি। মধ্য নভেম্বরের মধ্যে সব কিছু গুছিয়ে আনা সম্ভব হবে।
“দু-তিনটি বিষয়ে সম্ভাব্য বাস্তবায়নসূচি থেকে পিছিয়ে রয়েছি। একটি হলো—রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষণ সংস্থার নিবন্ধন। আরেকটি হলো—রাজনৈতিক দলের সংলাপ।”
নতুন দল ও পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত গড়ানোকে ‘যৌক্তিক’ দাবি করেন তিনি।
ইসি সচিব বলেন, “আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ পেয়েছি ৩ নভেম্বর। আরপিও ও আচরণবিধি ছাড়া সংলাপ করে লাভ নেই। তাই দলের সংলাপ করতে বিলম্ব। আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে শুরু করব আশা করি। এটা ছাড়া আর সবকিছু অনটাইমে আছে।”
ভোটপ্রস্তুতির প্রাথমিক কাজ শেষের বিষয়টি শতাংশে উল্লেখ না করে তফসিলের আগের কাজগুলো ‘সন্তোষজনক পর্যায়ে’ গুছিয়ে আনা হয়েছে বলে জানান আখতার আহমেদ।
এরই মধ্যে নিবন্ধন অ্যাপ চালু, আইন মেনে ম্যানুয়েল তৈরি, মুদ্রণ, ভোটার তালিকা মুদ্রণসহ ধারাবাহিক অন্যান্য কাজ চলবে।
ভোটের ক্ষণগণনা শুরু ও ইসির কর্তৃত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের পরিধি বিবেচনা করে ফের ‘চেকলিস্ট’ তৈরি করবে ইসি সচিবালয়।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “তফসিলের পরের কাজগুলো আরও গতি পাবে।”
পর্যবেক্ষক নিবন্ধনের অগ্রগতির বিষয়ে বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, "আজ আমরা ৬৬টি স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন চুড়ান্ত অনুমোদন করেছি।
“আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ ধরে আচরণ বিধিমালার গেজেট করার জন্য পাঠিয়েছি। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসার কর্মপরিকল্পনাও চূড়ান্ত। বলা যায়, সার্বিক প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছি আমরা।"
নভেম্বরের মাঝামাঝি দলগুলোর সঙ্ড়ে সংলাপ শুরু হবে বলে জানান তিনি।
গণভোট প্রসঙ্গ
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার অভিযান শুরু করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এ প্রচার অভিযানের অংশ হিসেবে দেশবাসীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে ২ নভেম্বর প্রচারিত ভিডিওতে বলা হয়, “নির্বাচন ২০২৬, দেশের চাবি আপনার হাতে। আপনার ভোট আপনি দিয়ে নির্ধারণ করুন, কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান।”
ইতোমধ্যে সংসদ নির্বাচনের আগে বা সংসদ নির্বাচনের দিন একসঙ্গে গণভোট করার সুপারিশ রয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের। গণভোট কবে, তা নিয়ে দলগুলোর বিতর্কের মধ্যে ‘ঐকবদ্ধ দিকনির্দেশনার’ জন্য সরকারের তরফ থেকে দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনার সময় দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লষ্টরা বলছেন, এটা যেহেতু সরকার আলোচনার মধ্যে রেখেছে, তাই সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে। এখন নির্বাচন কমিশনের কাছে বিষয়টি আসেনি। সরকারের নির্দেশ পেলে সে অনুযায়ী বাস্তবায়নের কথা বলে এসেছে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটির পক্ষ থেকে।
ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন, সংশয় কি কাটল?
তফসিলের পর প্রশাসন-পুলিশে রদবদল চায় ইসি
ভোটের প্রস্তুতি তুলে ধরলেন ইসি সচিব
ভোটের রোডম্যাপ: অক্টোবরের মধ্যে 'মূল প্রস্তুতি' সারতে চায় ইসি
সংস্কার নিয়ে বিরোধ: যা হয়নি আট মাসে, তা হবে সাত দিনে?
ভোটার স্থানান্তরের আবেদন: নিষ্পত্তি সারতে হবে ১৭ নভেম্বরের মধ্যে