Published : 04 Aug 2025, 06:23 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির সবশেষ অবস্থা তুলে ধরেছেন সংস্থাটির সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি বলেছেন, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে কেনাকাটা শেষ হয়ে যাবে। এরপরও কিছু কাজ থাকবে, যেগুলো সম্পর্কে তখন পর্যালোচনা করে বলা যাবে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ভোটের সম্ভাব্য সময়ের বিষয়ে ঘোষণা দিতে পারেন। এর মধ্যে নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানাতে সোমবার নির্বাচন ভবনে ব্রিফিংয়ে আসেন ইসি সচিব আখতার।
এক সাংবাদিক জানতে চান, তফসিল কবে নাগাদ হতে পারে?
উত্তরে ইসি সচিব আখতার বলেন, “তফসিল ঘোষণার ব্যাপারটা একান্তভাবে নির্বাচন কমিশনের উপর। যখনই ইসি সিদ্ধান্ত নেবে আমরা জানাব। আমাদের সব প্রস্তুতি জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।
“আমাদেরও গোছানোর সময় দিতে হবে। যেগুলো একটু একটু হচ্ছে জানাচ্ছি, যেগুলো চলমান জানাচ্ছি। ভবিষ্যতে কী আসবে, জানাব।”
মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারসহ সব ধরনের প্রস্তুতি শেষে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমভাগে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। তবে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও তফসিলের দাবি জানিয়ে আসছে।
ইসি সচিব বলেন, “আজি আমি বেশ কিছু টাইমলাইন ধরে কথা বলেছি। টাইমলাইন, কর্মপরিকল্পনা, অ্যাকশনপ্লান বলেন- কাজের ব্যপ্তিটাই আসল। আমি কোন সময়ের মধ্যে ভোটের প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি, কতটুকু এগোচ্ছি। আমার মনে হয়, এ পর্যন্ত সময়সীমা বলেছি, আমাদের বাস্তবায়নের কথা বলেছি।”
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আখতার আহমেদ বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা যে টাইমলাইন দিয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ করছি। আমরা আমাদের প্রস্তুতি জানাচ্ছি। নির্বাচন কমিশন যেসব সিদ্ধান্ত নেন তা তুলে ধরা হচ্ছে।”
দলের নিরীক্ষা প্রতিবেদন: নিবন্ধিত ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি গত ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ১৫টি দল সময় বাড়াতে আবেদন করেছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, বাকি ছয়টি দলের মধ্যে পাঁচটি প্রতিবেদন দেয়নি। একটি এ বছর নিবন্ধন পাওয়ায় সেটি এবার প্রতিবেদন দেয়নি।
দল নিবন্ধন: ১৪৫টি দল নিবন্ধন আবেদন করেছে। তথ্য ঘাটতি চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর ৩ অগাস্টের মধ্যে এর মধ্যে ৮০টি দল প্রয়োজনীয় নথি দিয়েছে। সময় বাড়াতে আবেদন করেছে ৬টি দল। ৫৯টি দল কোনো জবাব দেয়নি।

ইসি সচিব বলেন, “সময় বাড়ানো ও তথ্য ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়ে কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। ৮৯টি দলের আবেদন ফারদার রিভিউ করছি; ঠিক মতো দিয়েছে কি না, কোনটা মাঠ পর্যায়ে যাবে বা আরও তথ্য ঘাটতি থাকলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ভোটার তালিকা: ইসি সচিব জানান, বছরের শুরুতে ২ মার্চ হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে হালনাগাদ তথ্যের তালিকা প্রকাশ করা হবে ১০ অগাস্ট এবং ভোটের এক মাস আগে সম্পূরক আরেকটি তালিকা প্রকাশ করা হবে।
২ মার্চের চূড়ান্ত তালিকায় ১২ কোটি ৩৭ লাখেরও বেশি ভোটার রয়েছে। ১০ অগাস্ট বাদ পড়া সাড়ে ৪৪ লাখের মতো ভোটারের খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং মৃত ভোটারদের বাদ দেওয়া হবে। দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি করে ৩১ অগাস্টের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান ইসি আখতার আহমেদ।
তিনি বলেন, “এবার তিনটি তালিকা হচ্ছে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, সবশেষ ভোটের একমাস আগে সম্পূরক তালিকা প্রকাশ করা হবে; যাতে নতুন ভোটাররা যুক্ত হবেন।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সব মিলিয়ে পৌনে ১৩ কোটি ভোটার হতে পারে বলে ধারণা করছেন ইসি কর্মকর্তারা।
সীমানা নির্ধারণ: ইতোমধ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানার খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। ১০ অগাস্টের মধ্যে দাবি-আপত্তি জানানোর সময় রয়েছে। এরপর শুনানি শেষে অগাস্টের মধ্যেই সীমানা চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্যবেক্ষক সংস্থা: ইতোমধ্যে আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। ১০ অগাস্টের মধ্যে আবেদন পেলে বিধি অনুযায়ী চূড়ান্ত করা হবে।
আইন-বিধি সংস্কার: ইতোমধ্যে সীমানা আইন সংশোধন অধ্যাদেশ, ভোটার তালিকা সংশোধন অধ্যাদেশ, ভোটকেন্দ্র স্থাপন নীতিমালা, স্থানীয় পর্যবেক্ষক নীতিমালা, বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যম নীতিমালা, পর্যবেক্ষক সংস্থা নীতিমালা জারি ও আবেদন আহ্বান করা হয়েছে।
ইসি সচিব সচিব আখতার আহমেদ জানান, বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের সভা রয়েছে। এতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা চূড়ান্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, “আরও তিনটি আইন-বিধি আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ উইংয়ে ভেটিংয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধন, নির্বাচন কর্মকর্তা বিশেষ বিধান সংশোধন ও ইসি সচিবালয় আইন সংশোধন ভেটিং শেষে উপদেষ্টা পরিষদে উপস্থাপন করা হবে।”
আচরণবিধিতে এআই অপব্যবহার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা রোধেও কারিগরি ও বিধিতে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নির্বাচনি ম্যানুয়াল: আইনবিধি অনুসরণ করে দ্রুত সম্পন্ন করা হবে বলে জানান ইসি সচিব আখতার আহমেদ।
প্রশিক্ষণ: নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ একটু একটু করে আগাচ্ছেন বলে জানান ইসি সচিব। তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের যথাসময়ে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচনি সরঞ্জাম ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স: ভোটের জন্য সব ধরনের নির্বাচন সামগ্রী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কেনাকাটা শেষ করা হবে।
সচিব আখতার বলেন, “৮টা আইটেম দরকার রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওয়া যাবে। ইসির হাতে থাকা স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ব্যবহার উপযোগী ও যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করা হবে।”
প্রবাসী ভোট: অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোটদান সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। এতে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
সচিব আখতার জানান, শিগগিরই পরিকল্পনা কমিশনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যাবে। নিবন্ধনের প্লাটফর্ম তৈরি করার কাজ চলমান রয়েছে।
ইইউ টিম আসছে সেপ্টেম্বরে
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অগ্রবর্তী পর্যবেক্ষক দল নির্বাচনের প্রাক-পরিবেশ দেখতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশে আসছে। সাতজনের এ দলের আসার কথা রোববার নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণায়।
ইসি সচিব আখতার বলেন, “ইইউ পর্যবেক্ষণ টিম মিড সেপ্টেম্বরে দেশে আসবে। এর মধ্যে তিনজন বিদেশি ও চারজন স্থানীয় পর্যবেক্ষক থাকবেন। এটা আজ আমাদের জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এটা জেনেছি।”
সচিব বলেন, “প্রি-ইলেকশন এনভায়রনমেন্ট অবজারভেশনের জন্য তারা আসবেন। ইসির নির্বাচনী প্রস্তুতি কি আছে তা দেখার জন্য আসবেন।”
‘মেরুদণ্ড ঠিক আছে’
ইসি সচিব আখতার জানান, আস্থা ফেরানোর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন একটি মেরুদণ্ডহীন প্রতিষ্ঠান- এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এমন মন্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় ইসি সচিবের।
স্মিত হেসে তিনি বলেন, “মেরুদণ্ড সোজ না থাকলে দাঁড়িয়ে আছি কীভাবে? রাজনৈতিক বক্তব্য আমরার এরিয়া নয়, আমরা জায়গাটা প্রশাসনিক ব্যাপার। এখন পর্যন্ত সোজাই দাঁড়িয়ে আছি। দোয়া করেন এভাবে যেন দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।”
আখতার আহমেদ বলেন, “আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কি প্রমাণ করে না আমার মেরুদণ্ড আছে?”