Published : 27 Jul 2026, 11:02 PM
ইরান যুদ্ধে মার্কিন সেনা হতাহতের প্রকৃত তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগনের বিরুদ্ধে।
পেন্টাগন মার্কিন সেনা হতাহতের তথ্য প্রকাশে ‘লজ্জাজনক পদ্ধতি’ অবলম্বন করছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সিআইএর সাবেক পরিচালক লিও পানেটা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এ খবর জানিয়েছে।
গত আড়াই মাস ধরে কোনও আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেনি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনরোষ এড়াতে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের প্রকৃত খেসারত গোপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের সময় নিয়মিত পেন্টাগন ব্রিফিং পরিচালনা করা পানেটা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে ফোনে বলেন, “আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে তথ্য লুকিয়ে রাখার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। যুদ্ধে আমাদের সবার যে যৌথ দায়িত্ব রয়েছে, সেটির ক্ষেত্রে এটি একটি লজ্জাজনক দৃষ্টিভঙ্গি।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এমাসে ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনা নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন প্রায় ৪৩০ জন সেনা।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ জুলাইয়ের পর থেকে ১০০ জন মার্কিন সেনা আহত হলেও পেন্টাগন প্রথমে তা প্রকাশ করেনি।
পরে সমালোচনার মুখে সামাজিক মাধ্যমে তা স্বীকার করে পেন্টাগন জানায়, আহত ওই সেনাদের ৯৬ শতাংশই পুনরায় কাজে যোগ দিয়েছেন। এরপর পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে নিহতের সংখ্যা ১৮ থেকে কমিয়ে ১৪ দেখানোর নতুন খবর সামনে এলে জোরাল প্রশ্ন তৈরি হয়।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল একে “সাময়িক ডেটা সমস্যা” বলে দাবি করলেও সমালোচকরা বলছেন, এটি ব্যর্থ সামরিক হস্তক্ষেপ আড়াল করার জন্য হিসাব-নিকাশ করা এক রাজনৈতিক কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেন, “যুদ্ধের প্রকৃত খেসারত থেকে আমেরিকানদের আড়াল করতেই এসব করা হচ্ছে।”
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সামরিক গোপনীয়তা বজায় রাখার ইচ্ছা এবং স্বচ্ছতার জন্য সংবাদমাধ্যমের দাবি নিয়ে টানাপোড়েন চলছে।
তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সংবাদের অবাধ প্রবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে পেন্টাগন, যাকে এখন 'ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার' বা যুদ্ধ দপ্তর হিসেবেও অভিহিত করা হচ্ছে।
পেন্টাগন থেকে নিউ ইয়র্ক টাইমস, এনপিআর ও পলিটিকোর মতো মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোকে সরিয়ে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ মাধ্যমগুলোকে জায়গা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অনুমতি ছাড়া তথ্য প্রকাশের বিরুদ্ধে নতুন নিয়ম জারির পর গত অক্টোবরে অধিকাংশ সাংবাদিক পেন্টাগন বয়কট করেন।
পরবর্তীতে সাংবাদিকদের চলাচলে নানা বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় এবং চলতি জুনে প্রেস অফিসকেই 'শ্রেণীবদ্ধ এলাকা' ঘোষণা করে সাংবাদিকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ওয়াশিংটন পরিচালক ক্লেটন উইমার্স বলেন, “সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই পেন্টাগন সংবাদমাধ্যমের প্রতি সবচেয়ে বেশি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করছে।”
ইরান যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে ক্রমশ অপ্রিয় হয়ে উঠছে। এ পর্যন্ত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে সম্প্রতি সেনেটের এক উত্তপ্ত শুনানিতে ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স এই যুদ্ধকে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থতা’ আখ্যা দিলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ স্টিভেন ক্যাশ সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ও পেন্টাগন নেতৃত্ব সাধারণ জনগণ বা সংবাদমাধ্যমকে তথ্য পাওয়ার অংশীদার মনে করে না, বরং তাদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে।
তবে পেন্টাগনের তথ্য গোপনের সব চেষ্টা সত্য প্রকাশে সাংবাদিকদের আরও মরিয়া করে তুলবে বলে মনে করেন লিওন পানেটা।
তিনি বলেন, “তারা যতই আড়াল করার চেষ্টা করুক না কেন, দিনশেষে সত্য সামনে আসবেই।”