Published : 17 Mar 2026, 12:06 AM
ঈদের লম্বা ছুটির আগের দিন দুপুর থেকে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে চিরচেনা সেই ভিড় না থাকলেও বিকালে বেড়েছে যাত্রী।
লঞ্চে ঈদযাত্রার প্রথম দিন ছিল সোমবার। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকার প্রধান এ নৌ ঘাট থেকে সকালে নিয়মিত ছাড়ে শুধু চাঁদপুরগামী লঞ্চ। বরিশালের পথেও কিছু যায় তবে সব পরিবহনের লঞ্চ সকালে ছাড়ে না। ঈদযাত্রার প্রথম দিনও এর বদল হয়নি। এদিনও সকালে যাত্রী কম নিয়ে গন্তব্যে গেছে লঞ্চগুলো।
সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের অন্য রুটের লঞ্চ সাধারণত বিকাল ৫টার পর থেকে ছেড়ে যেতে শুরু করে। সোমবার অফিস ছুটির পর ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলোতে যাত্রী বাড়তে দেখা গেছে। সন্ধ্যার দিকে তা আরও বেড়েছে।
সাত দিনের ঈদের ছুটি শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার থেকে। যে কারণে যাদের সুযোগ ছিল তারা সোমবার বিকাল বা সন্ধ্যার পর লঞ্চে উঠে পড়েছেন স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যেতে।
এক সময় ঈদে বাড়ি ফেরার লঞ্চে ধরার জন্য দুপুরের আগে থেকেই ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রীরা সদরঘাটের দিকে যাত্রা শুরু করতেন। তখন গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত তীব্র যানজট লেগে থাকত। অনেক যাত্রীকে সঠিক সময়ে লঞ্চে উঠার জন্য হাঁটতেও দেখা যেত। রোজার শুরু থেকেই সরগরম থাকত টার্মিনালের কাউন্টারগুলো। কর্মচারীদের দম ফেলার সুযোগ থাকত না। তবে পদ্মা সেতু চালুর পর চিরচেনা সেই চিত্র পাল্টেছে।

সোমবার বিকালে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল গিয়ে দেখা যায়, পন্টুনে বাঁধা সারি সারি লঞ্চ। চাঁদপুরগামী লঞ্চগুলোতে যাত্রীর কিছুটা চাপ থাকলেও বরিশাল-ঝালকাঠি-ভোলা-বরগুনা রুটের লঞ্চগুলো অনেকটাই ফাঁকা। যাত্রীদের টিকেট কেনার হিড়িক নেই। বন্ধ থাকতে দেখা গেছে অগ্রিম টিকেট কাউন্টার।
লঞ্চ পরিচালনার সঙ্গে যুক্তরা বলছেন, বিকাল থেকে যাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও লঞ্চের তুলনায় তা একেবারেই কম। তবে তুলনামূলকভাবে দক্ষিণাঞ্চলের রুটগুলোর মধ্যে বরিশাল, ভাণ্ডারিয়া ও ঝালকাঠির চেয়ে চাঁদপুর, ভোলা, চরফ্যাশন, লালমোহন ও বরগুনা রুটের লঞ্চে যাত্রী তেমন কমেনি।
২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চের যাত্রী কমলেও, ঈদের সময় বাসের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ও স্বস্তির যাত্রার জন্য অনেকে সড়ক পথ ছেড়ে নৌপথ বেছে নেন। সে কারণে ঈদযাত্রায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কিছুটা যাত্রীর চাপ বেশি, যে কারণে বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছেন লঞ্চ মালিকেরা।
এছাড়া এবার সাত দিন ছুটি থাকার কারণে বাড়ি ফেরার অনেক সময় পাওয়ায় এক সঙ্গে যাত্রীদের চাপ পড়ছে না বলেছেন লঞ্চের কর্মচারীরা।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিটিসি) কর্মকর্তারা বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটায় মোট যাত্রীর প্রায় ১৫ শতাংশ নৌপথে যায়, আগে যা ৩৫ শতাংশ ছিল। বর্তমানে ১৭০টি লঞ্চের রুট ৩৮টি। প্রতিদিন গড়ে ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ চলে বিভিন্ন পথে।
কয়েকটি লঞ্চের ব্যবস্থাপক ও তত্ত্বাবধায়ক বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা থেকে বরিশালগামী লঞ্চের ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু ঈদের সময় ডেকের ভাড়া ৩৫০, সিঙ্গেল কেবিন এক হাজার ২০০ ও ডাবল কেবিনের ভাড়া দুই হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক প্রদীপ বাড়ৈ বলেন, “সরকারের অনুরোধে আমরা প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া কম নিচ্ছি। ডেক থেকে শুরু করে বিলাসবহুল ভিআইপি কেবিন পর্যন্ত সব শ্রেণির ভাড়ার তালিকা টাঙানো আছে।“
এছাড়া ফ্যামিলি কেবিনের (এসি) ভাড়া ৫ হাজার টাকা, ভিআইপি ২ টিকেটের কেবিন ৬ হাজার টাকা, ভিআইপি ৩ টিকেটের ভাড়া ১০ হাজার টাকা এবং ভিআইপি ৪ টিকেটের ভাড়া ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান লঞ্চ কর্মকর্তারা।

বিকল্প দুই ঘাটে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস
সদরঘাটে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ কমাতে এবং যাতায়াত সহজ করতে এ বছর ঈদযাত্রায় দুটি বিকল্প ঘাট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিআইডব্লিটিসি।
বছিলা ব্রিজ সংলগ্ন লঞ্চঘাট (ব্রিজের নিচে) এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে বেশ কয়েকটি পরিবহনের এসব লঞ্চ ছাড়া হবে।
বিআইডব্লিউটিএ বলছে, মঙ্গলবার থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত বছিলা লঞ্চঘাট থেকে ছয়টি এবং শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে তিনটি লঞ্চ বিভিন্ন নৌপথে যাত্রী পরিবহন করবে।
যাত্রী বাড়ার আশা লঞ্চ কর্মীদের
ঢাকা-বরিশাল রুটের পারাবত-১৮ লঞ্চের সারেং খোরশেদ আলম বলেন, “কোম্পানির লঞ্চ দিনে দুই থেকে তিনটি ট্রিপ দিয়ে থাকে। ঈদের সময় সেটা ডাবল ট্রিপ হয়ে যায়। এবার হয়ত যাত্রী বাড়বে, তবে বিকাল পর্যন্ত তো তেমন যাত্রী দেখছি না।”
পারাবত ১৮ এর টিকিট বিক্রেতা সোহেল মিয়া বলেন, “আগে তো কেবিনের জন্য আগে থেকেই বুক দিতে হতো। আজকে এখনও অর্ধেক কেবিন ফাঁকা। আশা করি লঞ্চ ছাড়ার আগে কেবিন শেষ হয়ে যাবে।”
ঢাকা-চাঁদপুর রুটের রফরফ-৭ লঞ্চের কেবিন অপারেটর খন্দকার মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চাঁদপুরের লঞ্চ চলে। মালিকরা ঈদের সময় এই রুটে লঞ্চ বাড়িয়ে দেয়।

সড়কের ঝুঁকি এড়াতে লঞ্চে
যানজটের পাশাপাশি সড়ক পথে দক্ষিণাঞ্চলের যেকোন পথে যাতায়াতকে যাত্রীদের অনেকে ঝুঁকি বলে মনে করছেন। যে কারণে লঞ্চকেই বেছে নিয়েছেন তারা।
বরিশালগামী খন্দকার শাহিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার পরিবারের চারজন সদস্য সবাইকে নিয়ে রাতে কেবিনে ঘুমাতে ঘুমাতে বরিশাল চলে যাব, বাসে এমন ধরনের সুবিধা আছে? লঞ্চে নিরাপদ যাত্রা। এখানে কোনো ঝুঁকি নাই।”
ভোলা চরফ্যাশন যাবেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সুমাইয়া আক্তার। বলেন, “আমরা দুই বান্ধবী একটি কেবিনে করে চলে যাব। নদীপথে যাত্রা তুলনামূলক আরামদায়ক।”
বাড়তি নিরাপত্তা
বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঈদে যাত্রীদের চাপ গতবছরের চেয়ে কিছুটা বাড়তে পারে ধরে নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবার প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ নদীপথে যাতায়াত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তায় নৌ-পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), র্যাবসহ অন্যান্য সংস্থা যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া সদরঘাট এলাকায় চার থেকে পাঁচটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা কন্ট্রোল রুম সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল টিম ও ভ্রাম্যমাণ আদালত দায়িত্ব পালন করছে।
প্রতিটি লঞ্চে বিআইডব্লিউটিএ, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও র্যাবের হটলাইন নম্বর প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে, যোগ করেন তিনি ।