Published : 17 Jul 2025, 09:26 PM
গোপালগঞ্জে যেভাবে ‘বলপ্রয়োগ ও গুলি’ চালানোর ঘটনা ঘটেছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং সংবিধান- উভয়েরই ‘চরম লঙ্ঘন’ বলে মনে করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
এই চার মৃত্যুর দায় ‘সরকার এড়াতে পারে না’ মন্তব্য করে আসক সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে গোপালগঞ্জে পুলিশ ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহার করেনি। আসক বলছে, ছড়িয়ে পড়া অনেক ভিডিওতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার এবং গুলির শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তাহলে কারা এই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করল, সেই প্রশ্ন তুলেছে আসক।
বুধবার এনসিপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে প্রাণঘাতি সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে এ কথা বলেছে বেসরকারি সংস্থাটি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “এই ধরনের বলপ্রয়োগ, গুলি চালানো ও প্রাণহানির ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক পরিসর, মানবাধিকারের মূল্যবোধ এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি এক ধরনের হুমকি। নাগরিকের জীবন রক্ষা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। গোপালগঞ্জের ঘটনায় রাষ্ট্র সে দায়িত্ব পালনে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।”
আসক বলছে, “গোপালগঞ্জে এনসিপির রাজনৈতিক সমাবেশে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে চারজন নাগরিক নিহত ও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানাচ্ছে আসক। পাশাপাশি, সকল পক্ষকে সংযম ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে।
গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বুধবার গোপালগঞ্জ পৌর পার্কে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পূর্বঘোষিত একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শেষে হঠাৎ করে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ এই সমাবেশে হামলা চালায়। হামলার এক পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
“এরপর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় জনতার ওপর বলপ্রয়োগ করে এবং প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। এই ঘটনায় দীপ্ত সাহা (২৫), রমজান কাজী (১৮), সোহেল মোল্লা (৪১) ও ইমন (২৪) নামের চারজন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে, যাদের কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।”
আসক বলছে, “মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণভাবে সভা সমাবেশ করার অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানে নিশ্চিত মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব হল এই অধিকার সুরক্ষা করা এবং যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সময়ে উত্তেজনা প্রশমন ও মানুষের জীবনরক্ষা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা।
“গোপালগঞ্জে যেভাবে জনসাধারণের ওপর বলপ্রয়োগ ও গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং সংবিধান- উভয়েরই চরম লঙ্ঘন, যা একান্তই অগ্রহণযোগ্য।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “এ ঘটনা নিয়ে পুলিশের মহা পরিদর্শক গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছেন, পুলিশ গোপালগঞ্জের ঘটনায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেনি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার এবং গুলির শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে। তাহলে কারা এই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করল?
“আসক মনে করে, এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা দেওয়া না হলে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, ভয় ও প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা আরও বাড়বে।”
আসক জোর দিয়ে বলছে, “এই ঘটনায় নিহত চারজনের মৃত্যুর দায় সরকার এড়াতে পারে না। অবিলম্বে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান করতে হবে। এছাড়া এনসিপির নেতা ও সমর্থকদের ওপর হামলার পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি সমাবেশে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। একইসাথে এ ঘটনায় আহতদের সুচিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।”
দেশে স্থিতিশীলতা ও শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে আসক সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম, ধৈর্য ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশ্যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “এই ধরনের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি পরবর্তীতে যেন কোনো নিরীহ মানুষ হয়রানি বা সহিংসতার শিকার না হন এবং নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নজির সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”