Published : 20 Nov 2025, 12:41 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পথে রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপের কাজটি সেরে ফেলেছে এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।
এ সংলাপকে ‘রুটিন কাজ’ হিসেবে দেখলেও নিবন্ধিত সব দলের থাকাটা জরুরি ছিল বলে মনে করছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।
নিজেদের মেয়াদের এক বছর পার করা নির্বাচন কমিশনকে এবার সংসদ নির্বাচনের দিনে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট আয়োজনও করতে হবে।
তবে দুই ভোট একই দিনে হওয়ায় বড় ধরনের ‘কোনো চ্যালেঞ্জ’ দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। খুব বেশি ঝামেলা দেখছেন না তফসিল ঘোষণার ক্ষেত্রেও।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর গেল বছরের ২১ নভেম্বর বর্তমান কমিশন গঠিত হয়। এক বছরের মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ থেকে পোস্টাল ভোটিং পর্যন্ত কাজ গুছিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন কমিশনের সদস্যরা।
ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে তফসিল ঘোষণা হতে পারে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে।
কেমন গেল এক বছর
সংলাপ শেষে বুধবার নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “নিঃসন্দেহে এটা বড় কাজ ও দীর্ঘ সময়ের বিষয় ছিল। আমরা খুব আশাবাদী। যাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি, সবাই এসেছে এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নিয়ে মনখুলে কথা বলেছে। এতে করে সামনে নির্বাচন ও যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ খুব সহজ হয়ে যাবে।”
তফসিলের বিষয়ে এ নির্বাচন কমিশন বলেন, “তফসিলের সময় থেকে নির্বাচনের মধ্যে প্রায় দুই মাস ব্যবধান থাকবে, এখন পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত।”
ভোটের পথে তফসিল থেকে ভোটের দিনের ব্যবধান প্রথম সংসদ নির্বাচনে ৬০ দিন, দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৪ দিন, তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৭দিন, চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে ৬৮দিন, পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ৫২ দিন, ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ৩৯দিন, সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৪৭ দিন, অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৪২ দিন, নবম সংসদ নির্বাচনে ৩৭ দিন, দশম সংসদ নির্বাচনে ৪২ দিন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৪৯ দিন ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৫২ দিন ছিল।
নিজেদের মেয়াদের এ বছর সময় পার করার বিষয়ে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “আমাদের শপথের পর থেকে প্রতিটি কাজেই কম বেশি চ্যালেঞ্জ ছিল। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন চিন্তাভাবনা, ধ্যান ধারণা, অনেকে পরামর্শ দিয়েছে, অনেক সময় বিরোধিতা করেছেন, ইতিবাচক-নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। সব কিছু মিলিয়ে এক বছরে আমরা কারো প্রভাবে প্রভাবিত হয়নি। আমরা মনে করি, এখন পর্যন্ত আর কোনো কিছুতে ব্যর্থ হয়েছি, মনে আসছে না।”
বর্তমান কমিশন সব কিছু দৃঢ়তা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, কারো প্রতি বৈরী মনোভাব না দেখিয়ে আইনগতভাবে সামাল দিতে পারবে বলে করে কমিশন।

সব দলকে না ডাকার সংলাপে কী পেল ইসি
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, “কমিশনের মূল ফোকাস ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারা এ পরিকল্পনায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তফসিল ঘোষণার আগে হাতে যে সময় রয়েছে, বাকি কাজগুলো শেষ করতে পারবে।”
নির্বাচনি আইন সংস্কার, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ৩০০ আসনের সীমানা, দল নিবন্ধন, ভোটকেন্দ্রসহ ভোটের পথে আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি ভালোভাবে শেষ করেছে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিশ্লেষক মনে করেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের বেশ কিছু প্রতিফলন ছিল। সেগুলো ধরে প্রবাসীদের জন্য ভোটিং অ্যাপ চালু করেছে। প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোটিং শুরু করতে যাচ্ছে। কতটা সফল হবে তা অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু শুরু যে হচ্ছে, এটা একটা মাইলফলক।”
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, “রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ অনেকটা রুটিন ওয়ার্কের মতো। আরপিও সংশোধন হয়েছে, আচরণবিধি হয়েছে। এখানে আর ফিডব্যাক নেওয়ার সুযোগ নেই। এখন বড় ফোকাস হচ্ছে সহায়তা।”
নির্বাচন কমিশন একা একা কখনও নির্বাচন করতে পারে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, যারা অংশীজন, সবার সহায়তা করতে হয়। রাজনৈতিক দলগুলো বড় অংশীজন। তাদের সহায়তা লাগবে।
“যেভাবেই হোক, কোনো কোনো দল কোনো কাজ নিয়ে একটু বিরক্ত হতেই পারে। সংলাপের মাধ্যমে দলগুলোর সঙ্গে ফরমালি এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি হল। এসব কিছু মিলিয়ে আমি দেখি, কমিশন ঠিক রাস্তায় আছে।”

বর্তমানে নিবন্ধিত দল রয়েছে ৫৫টি। এর মধ্যে জাতীয় পার্টিসহ সাতটি দল সংলাপে ডাক পায়নি।
এ তালিকার বাকি ছয় দল হলো, জাতীয় পার্টি-জেপি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম.এল), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ও বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন।
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলেন, “এটা বাংলাদেশের ‘কালচার’। অনেক সময় দলকে ডাকা হয়, আবার ডাকা হয় না। কখনও কখনও দলকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা হয়, অথবা বিতর্কিত দলকে নিবন্ধন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এমন ‘কালচার’ আমাদের আছে।”
নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে দলগুলোর থাকাটা জরুরি ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আব্দুল আলীমের ভাষ্য, “কিছু দলকে সরকার থেকেও বিভিন্ন প্রোগ্রামে ডাকা হয়নি। বিষয়টা সরকারই শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশন মূলত ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে।
“কাজেই এটার সলিউশন সবার আগে দরকার। এটা করেই পরবর্তী পদক্ষেপে যাওয়া যেতে পারে।”
এএমএম নাসির উদ্দিন কমিশনের এক বছরের যাত্রায় ‘চ্যালেঞ্জ’ থাকলেও ভালোভাবে সামলে গেছেন বলে মনে করেন তিনি।
এ নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “চ্যালেঞ্জ ছিল। তারপরও এক বছরে মূল ফোকাস জাতীয় নির্বাচনে ছিল। যে প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটা আমার কাছে সন্তোষজনক। এটা নিয়ে বিতর্ক করার বা প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।“
সুপারিশ ‘অনেক’
৩ নভেম্বর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন অধ্যাদেশ হয়েছে, ১১ নভেম্বর আচরণবিধি জারি হয়েছে। ১৩ নভেম্বর থেকে দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসে ১৯ নভেম্বর শেষ করেছে ইসি।
এরই মধ্যে আইন সংস্কার, বিধি, নির্বাচনি পরিবেশসহ একগুচ্ছ বিষয়ে শতাধিক সুপারিশ এসেছে দলগুলোর কাছ থেকে।
দলের সঙ্গে আলোচনার আগেই আইন সংস্কার চূড়ান্ত করায় সমালোচনা এসেছে ইসির, ভোটের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগও জানিয়েছে দলগুলো।
বিএনপি রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে, জামায়াতে ইসলামী চেয়েছে ডিসি-এসপিদের রদবদল।
এমন পরিস্থিতিতে দলগুলোর সঙ্গে ‘ভালোভাবে’ সংলাপ শেষ করায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে ইসি।
বুধবার ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “আজকের মতো সংলাপ শেষ। যত সুপারিশ এসেছে, সব একসঙ্গে করা হচ্ছে। সব প্রস্তাবই যার যার অবস্থান থেকে আমলে নেওয়ার মতো। প্রস্তাব আমলে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, পর্যালোচনা করবে ইসি।”
পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের কথা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তারপরে অন্যান্য প্রস্তুতি।”
সংলাপ ও দলগুলোর নানা দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, “কমিশনের একটা দায়িত্ব শেষ হল। সবাই কমিশনকে ধন্যবাদ দিয়েছে। সমালোচনাও করেছে। এটাই হওয়া উচিত। সমালোচনা মানে বিভিন্ন বিষয়ে কমিশনকে আরও পরিষ্কার থাকার কথা বলেছেন। এটা ভালো চিন্তা।”
তফসিল ঘোষণার পর সার্বিক বিষয়ে ইসির দায়িত্বে এলে কাজের পরিধিও বাড়বে, সেক্ষেত্রে সমন্বয় ও সহযোগিতা নিয়ে এগোবে ইসি। আইন ও আচরণবিধি প্রতিপালনে ইসির উদ্যোগের পাশাপাশি দল ও প্রার্থীর মানসিকতার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, “সহযোগিতা আর সদিচ্ছাটাই সবচেয়ে বড় জিনিস। আন্তরিকতার অভাব দেখিনি। যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সবাই এসেছে (একটি দল বুধবার আসেনি)।”

আলাদা হতে পারে গণভোটের তফসিল
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্তি সচিব নির্বাচন বিশ্লেষক বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী বলেন, “দলগুলো যদি নির্বাচনি পরিবেশের জন্য কমিশনকে সহায়তা করে, তখন বোঝা যাবে সংলাপ ফলপ্রসূ হয়েছে।”
এখনও গণভোটের অধ্যাদেশ ও বিধিমালা না হওয়ার বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এ সদস্য বলেন, “অর্ডিন্যান্স তো জারি করতে হবে একটা। চ্যালেঞ্জ তো রয়েছে দুটো ইলেকশন একসঙ্গে করতে।
“এমনিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে খানিকটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। আর বড় দুটো ইলেকশন, চ্যালেঞ্জ থাকবেই। চ্যালেঞ্জ উত্তরণের পথটা কীভাবে সমাধান করে নির্বাচনটা গ্রহণযোগ্য করে তুলবে, সেটাই দেখার বিষয়।”
দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কমিশন ‘মোটামুটি সব’ গুছিয়ে নিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
গণভোটের তফসিল সম্পর্কে জেসমিন টুলী বলেন, “গণভোটে তো শুধু ভোটের তারিখ থাকবে, আর কিছু থাকবে না। এটা পরেও দিতে পারে। কোনো টাইমফ্রেম তো গণভোটের জন্য নেই। আইনটা করে বিধিমালা করে গুছিয়ে তারপর দিতে পারে। সংসদের তফসিল আগেও দিতে পারে, একসঙ্গেও দিতে পারে। এটা ইসির পলিসির বিষয়।”
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলেছেন, গণভোটের অধ্যাদেশ সরকার দেবে। বিধিমালা প্রয়োজন হলে ইসি করবে। গণভোটের ব্যালট পেপার আলাদা রঙের হবে, সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপার সাদাকালো। সবকিছু কাগজের চাহিদার ওপর নির্ভর করবে।
বুধবার সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন জানান, গণভোট অধ্যাদেশ জারি হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন তারা। সেক্ষেত্রে কাজগুলো শুরু করতে পারবেন।
তিনি বলেন, “অধ্যাদেশটা হলে তখন আমার একটা দায়বদ্ধতা আসবে এ ব্যাপারে বক্তব্য দেওয়ার। কিন্তু রাজনীতিকরা অনেকে জিজ্ঞাসা করছেন, কীভাবে করবেন, কীভাবে এগুলোর জবাব দেবেন, কতটা বাক্স করবেন। এগুলোর সব চিন্তা, এক্সারসাইজ শুরু করব আমরা অধ্যাদেশটা হওয়ার পর।”
আরও পড়ুন
রেফারি হব, বন্ধ করব সব গর্তের মুখ: নতুন সিইসি নাসির
ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে তফসিল: ইসি আনোয়ারুল