Published : 26 May 2026, 08:13 AM
রাজধানীতে কোরবানির পশুর হাট জমে ওঠার মুহূর্তে কপালে শঙ্কার ভাঁজ ফেলছে জ্যৈষ্ঠের কালো মেঘ। দুদিন ধরে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে আসছে বৃষ্টি, উড়িয়ে নিচ্ছে ত্রিপলের ছাউনি, তলিয়ে যাচ্ছে পশু রাখার জায়গা।
সামান্য বৃষ্টিতেই যাত্রাবাড়ীর অস্থায়ী হাটটিতে জমে পানি। নামতেও লাগে কয়েক ঘণ্টা। এর মধ্যে কাদা-পানি-গোবরে তৈরি হয় বেহাল দশা। তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে কোরবানির পশুগুলোকে।
এই অবস্থায় কোরবানির পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় বেপারীরা। তারা বলছেন, ক্লান্ত হয়ে পানির মধ্যেই বসে পড়ছে গরু। এতে ঠান্ডা লেগে কিংবা কাহিল হয়ে গরুর মারাও যেতে পারে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে কোনোমতে বেচে হাট ছাড়তে হবে। তাকে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলবে না।
এবার যাত্রাবাড়ীর অস্থায়ী হাটটি বসেছে কাজলা থেকে মৃধাবাড়ি মোড়ের প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত। হাট সংযোগ সড়কগুলোতেও চলে গেছে। ঢাকার দক্ষিণ সিটিতে এটি ছাড়াও আরো ১০টি হাট বসেছে।
যদিও আগে এই হাট বসত দনিয়া কলেজ মাঠ ঘিরে। যানজট এড়াতে এবার হাট সরিয়ে ডেমরা মহাসড়কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়া থেকে নয়টি গরু নিয়ে যাত্রাবাড়ীর হাটে এসেছেন গরু ব্যবসায়ী সামিউল ইসলাম। তার পরিচিত আরো ১৩ জন ব্যবসায়ী কুষ্টিয়া থেকে ট্রাকে করে গরু এনেছেন এ হাটে।
খামারে ও বাসায় যত্নে লালনপালন করা সাতটি গরুর আনার কথা তুলে ধরে সোমবার সামিউল বলেন, “চাইরডা গরু গেরেস্তের কাছ থিকা আনছি। গেরেস্ত তো ছাওয়ালের মত পালছে গরুডি। কোনো কষ্ট পাতি দেইনি। হাটে আইসা গরু তো কষ্ট পাচ্ছে।”

বৃষ্টিতে গরুর খাবারও ভিজে যাচ্ছে। সারাক্ষণ স্যাঁত-সেতে পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। গরুকে কিছুটা স্বস্তি দিতে জমে থাকা পানির মধ্যে খড় বিছিয়ে ও বালু ফেলে দিচ্ছেন গরু ব্যবসায়ী ও ইজারাদার। কিন্তু সেখানে গোবর মিশে আরো পিচ্ছিল আর কর্দমাক্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে হাঁটাচলাতেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই।
রাজশাহী থেকে যাত্রাবাড়ীর হাটে এসেছেন গরু ব্যবসায়ী রাজু আহমেদ। বৃষ্টির কারণে কোরবানির হাটে দাম পড়ে যাওয়ার পুরনো অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এখনো হাট জমেনি। এর মধ্যে বৃষ্টি হলে গরু তো ছেড়ে দিতে হবে (বেচে ফেলতে হবে)। তাতে দাম পাব না।”
রাজধানীর অস্থায়ী হাটগুলোতে বেশি গরু কেনা-বেচা হয় ঈদের আগের দুদিন আগে। গরু রাখার জায়গা সংকট, লালন-পালন করা ও খাবার প্রস্তুতসহ সার্বিক দেখভাল করার মত জনবল না থাকায় এই দুই দিনই গরু কিনে থাকেন ক্রেতারা।
অল্প বৃষ্টিতে জলজট, শঙ্কা
ঢাকার দক্ষিণে থাকা যাত্রাবাড়ী হয়ে বেশিরভাগ পানি নেমে গিয়ে বিভিন্ন নালা ও খাল হয়ে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গায় পড়ে।
একসময়ে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন খাল হয়ে চলে যেত সহজে। কিন্তু দখল-দূষণে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালি, কাজলা, মৃধাবাড়ি ও শনির আখাড়া হয়ে যাওয়া খাল এখন ‘ড্রেনে পরিণত’ হয়েছে। ফলে পানি নামতে সময় লাগায় অল্প বৃষ্টিতেই জলজট তৈরি হচ্ছে।
সোমবারের দুপুরের এক পশলা বৃষ্টিতেও মহাসড়কের পাশে থাকা ড্রেনের ময়লা পানি উপচে পড়ে খালগুলোতে। তাতে পানির স্রোত বাড়লেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। রোববার সন্ধ্যার বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানি নামতে রাত ১২টা পর্যন্ত লেগেছে বলে গরু ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

যাত্রাবাড়ী হাটে ছয়টি গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী রাজু আহমেদ সোমবার সকালের একটি বিক্রি করেন। ছয় দিন আগে তিনি এ হাটে আসেন।
রাজু বলেন, ‘এতদিন তো দাম পাইনি। প্রথম দিকে তো অনেকেই আসে গরু দেখতে। কেনার জন্য পরে আসে। আজকে (সোমবার) দামাদামিতে বনিবনা হওয়ায় একটা বেচা হল।”
মাঝারি আকারের লাল বর্ণের একটি গরু রাজু বিক্রি করেন ১ লাখ ৫১ হাজার টাকায়।
হাসলি পরিশোধের পর টাকা বুঝে নিয়ে রাজু বলেন, “এমন বৃষ্টি হলে গরুর দাম পড়ে যাইতে পারে। অনেক বেপারী গরু কোনোমতে বিক্রি করে চলে যাবে। পানিতে গরু রাখা যাবে না। অসুখ হবে। ঠান্ডায় মরিও যাইতে পারে।”
ফরিদপুর থেকে আসা ব্যবসায়ী আসলাম মিয়া বলেন, “সবাই এখনো (গরু) দেখে যায়। চারটা গরু আমার পালা, ছয়টা আনছি কিনে। ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা করে চারটা গরু কিনে তিন মাস পালছি। দাম ১ লাখ ৬০ হাজার পর্যন্ত উঠছে। ৬০-৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত না উঠলে লস হবে।”

নিজের লালনপালনের গরুগুলো ১ লাখ ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারলে কিছুটা লাভ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে বৃষ্টির কথা স্মরণ করে শঙ্কাও প্রকাশ করেন এ বিক্রেতা।
মাদারিপুরের কালকিনি থেকে সাতটি গরু নিয়ে যাত্রাবাড়ী এসেছেন মাতবর হোসেন। মাঝারি আকারের দুটি গরু বিক্রি করেছেন তিনি। তবে তার ২ লাখ টাকার বেশি দামের কোনো গরু সোমবার সকাল পর্যন্ত বিক্রি হয়নি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মাতবর বলেন, “২ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম চাইছি। দুই লাখ ১০-১৫ হাজার টাকা হলেই বিক্রি করে দেবো। কিন্তু দাম এখনো উঠেনি। বৃষ্টি হলে তো গরু দুর্বল হয়ে যায়।”
বৃষ্টির মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে থাকলেও ক্রেতা আসলে গরু দাঁড় করাতে হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এতে গরুর কষ্ট আরো বেশি। দেখলে মন কান্দে, কিন্তু কী করুম আর, উঠানো লাগবেই। গ্রামে এই গরুগুলো তো কত আরামে থাকত।

“বৃষ্টি, কাদা ও জমে থাকা পানির কারণে দুর্ভোগে চঞ্চল গরুও নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। বাড়ি ছাড়া ও সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে আসায় গরুর চোখ দিয়ে শুধু পানি ঝরছে।”
একটি গরু দেখিয়ে এ বেপারী বলেন, “খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। কাছে গিয়ে আদর করলে একটু খায়। সবসময় বসে থাকে নয়ত, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বাড়িতে যেরকম ছোটাছুটি, ডাকাডাকি করত, এখন তা করে না।”
যাত্রাবাড়ীর হাটে সর্বনিম্ন ৭০ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা দরের গরু উঠে। ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দামের গরু এবার বেশি।
জায়গা বদল হওয়ায় এবার এ হাটে গরুর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেশি উঠার তথ্য দিলেন হাসলি আদায়ে ১ নম্বর কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা মশিউর রহমান।
তিনি বলেন, “রোববার এক শিফটে ১২টার মতো বিক্রি হয়। সোমবার থেকে বিক্রি বাড়বে।”
দুই দিন হাট ঘুরে ১ লাখ ৫১ হাজার টাকায় গরু কেনেন যাত্রাবাড়ীর আবুল হাসান। তিনি বলেন, “বেশি দামাদামি করে গরু কিনি না। ১ লাখ ৭৫ হাজার চাইছিলো, এক লাখ ৫০ হাজার টাকায় কিনছি।
“শেষে আরো ৫ হাজার টাকা দাবি করে। ১ হাজার দিয়া দাবি ছাড়াইলাম। খরচ ১ লাখ ৫১ হাজার পড়ল।”