Published : 14 Aug 2025, 10:39 PM
বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গুলশানের চাঁদাবাজি কাণ্ডে গ্রেপ্তার জানে আলম অপুর ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিওটি বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের বাসায় জোর করে তৈরির অভিযোগ এনেছেন অপুর স্ত্রী কাজী আনিশা।
ফেইসবুকে বুধবার রাতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ওই চাঁদাবাজির ঘটনার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক অপু অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার কথা বলেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় সরব আলোচনা।
এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে অপুর স্ত্রী কাজী আনিশা সংবাদ সম্মেলনে এসে এ ভিডিও নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে অপুকে দুটো মোটরসাইকেলে করে অপহরণ করা হয়। পরে গোপীবাগের বাসায় নিয়ে নির্যাতন করে ভিডিওটি বানিয়েছেন বিএনপি নেতা ইশরাক।
এর পরদিন ১ অগাস্ট গোপীবাগে বিএনপির এই নেতার বাসার গলি থেকে গুলশানের চাঁদাবাজির মামলায় নাম আসা অপুকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলে দাবি কাজী আনিশার।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় যাদুঘরের সামনে সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি করেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে ইশরাকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। তার জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কয়েকবার ফোন কল কেটে দেন।
অপরদিকে এদিন দুপুরে আসিফ মাহমুদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
আদালতের রায়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ ফিরে পেলেও ইশরাক হোসেন দায়িত্ব পাননি। এ নিয়ে তিনি স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং তার পদত্যাগ দাবি করেন। ওই সময় তাদের দুজনের মধ্যে কথা চালাচালিও চলে।
গুলশানে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় গত জুলাইয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কয়েকজন নেতাকর্মী।
সেই ঘটনার একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে অপুকে দেখা গেলে ১ অগাস্ট তাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অপু বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। চাঁদাবাজিতে নাম আসার পর সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে।

সেই ঘটনার বেশ কয়েকদিন পর বুধবার থেকে অপুর একটি ভিডিও ভাইরাল হয় যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, “এই চাঁদাবাজির মাস্টারমাইন্ড হচ্ছেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।”
গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলের সামনে উপদেষ্টার সঙ্গে তার কথা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
৩৫ মিনিটের ওই ভিডিও বেশ সাজানো-গোছানো, পেশাদার হাতে সম্পাদনার ছাপ রয়েছে তাতে।
অপুর স্ত্রী কাজী আনিশার অভিযোগ বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন অপুকে ধরে নিয়ে ভয় দেখিয়ে ভিডিওটি বানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার শাহবাগে জাদুঘরের সামনে তার সংবাদ সম্মেলনের পেছনের ব্যানারে লেখা ছিল, “বিএনপি নেতা ইশরাক কর্তৃক জানে আলম অপুকে শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় ও অপহরণের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহায়তায় সংবাদ সম্মেলনটি তিনি আয়োজন করেছেন বলেও প্রশ্নের জবাবে বলেন আনিশা।
তিনি বলেন, “৩১ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার পর থেকে ১ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত অপু মিসিং ছিল। মিসিং ছিল বলতে তাকে রাত সাড়ে ১১টা বাজে দুটো বাইকে করে একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।”
ভাইরাল হওয়া ভিডিও অপুকে ধরে নিয়ে ‘একটু একটু করে শিখিয়ে দিয়ে’ ধারণ করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “অপুকে ওখানে রেখে কাটছাঁট করে একটু একটু করে শিখিয়ে দিয়ে ভিডিওটা তৈরি করা হয়েছে। তাকে কিন্তু গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৭টা বাজে গোপীবাগ থেকে।”
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অপুর স্ত্রী অভিযোগ করেন, “গোপীবাগ কার বাসা, ইশরাক ভাইয়ের বাসা না? অপুকে তো ইশরাক ভাইয়ের বাসার সামনে থেকে ধরছে। এখানে তো সন্দেহের কিছু নাই যে অপুকে নিয়ে ইশরাক ভাই জোর করে এসব করাইছে। যেটা ধারণা, অপুকে মনে হয় আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বলছে। যে সে কোনো একটা উপদেষ্টা আসিফ অথবা নাহিদ কারো নাম বললেই হবে।
“ইশরাক যে তাকে নির্যাতন করেছে, অপু ছিল গোপীবাগে সাদেক হোসেন খোকার যে বাসা সেখানে সে ছিল। বিবৃতিটা নেওয়া হয়েছে সেই বাসা থেকে।”
কাজী আনিশা বলেন, “৬ তারিখে রিমান্ড শেষে ডিবি অপুকে যখন আদালতে তোলে তখন অপু কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তি দিছে। সেখানে কিন্তু সে কোনো ব্যক্তির নাম বলে নাই যে তাকে চাঁদাবাজি করতে পাঠিয়েছে। তার আগের চাঁদাবাজির কোনো রেকর্ড নেই। সে নিরেট অসহায় একটা ছেলে। বাবা মারা গেছে, মা আছে তবে তার অন্য সংসার আছে। সে হিসেবে তার বাবা-মা কেউ নেই।
“আমি ৮ অগাস্ট কাশিমপুর কারাগারে অপুর সঙ্গে দেখা করছি। সেই আমাকে এসব তথ্য দিয়েছে। সে বলেছে, তাকে তুলে নিয়ে একটা বড়সড় ভিডিও বানানো হয়েছে। সেটা যেকোন সময় প্রকাশ পেতে পারে।”
রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ
কাজী আনিশার অভিযোগ, “গোপীবাগে ইশরাকের বাসার সামনের গলি থেকে তাকে ১ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৭টায় গ্রেপ্তার করে ডিবি। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে বেলা ১১টার পরে। এই চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় অপুকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। এরপর যখন মিডিয়া জানছে তখন ডিবি পুলিশ অপুকে নিয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছে। তারা কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপুকে আদালতেও হাজির করে নাই। ২ অগাস্ট দুপুর ৩টার পরে অপুকে আদালতে তুলছে এবং ১০ দিনের রিমান্ড দাবি করছে। আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করছে।
“আমাদের আইনজীবি বলছিল, সে কিন্তু জুলাইয়ের আহত যোদ্ধা। নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে সে। তার ব্রেনে ড্যামেজ আছে। আমরা তার মেডিকেলের পেপার জমা দিয়ে বলছিলাম যেন রিমান্ড না দেওয়া হয়। এরপরও রিমান্ড দেওয়া হয় এবং এই চার দিনে পুলিশ ও ডিবি অপুকে অমানবিক নির্যাতন করছে আমাদেরও হয়রানী করছে।”
তার ভাষ্য, রিমান্ডে অপুকে এত নির্যাতন করা হয়েছে যে সে ঠিকমত দাঁড়াতেই পারছে না। এখন তাকে কারাগারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কাজী আনিশার অভিযোগ, “পুলিশ ওকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। আমার আর আমার স্বামীর ব্যক্তিগত ছবি আছে। সেগুলো দেখিয়ে তারা অপুকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। অলরেডি তার ব্রেনে সমস্যা আছে। সে কিন্তু জুলাইয়ের আহত যোদ্ধা। আহত যোদ্ধা বা সমন্বয়কদের ওপর এত রাগ কীসের? সবাই ওদেরকে পুইতা ফেলতে চায়।
“অপুকে রিমান্ডে রেখে ব্ল্যাকমেইল করছে, একটা নাম বের করার জন্য। তারা বলেছে, দুই হাজার পুলিশ হত্যার প্রত্যেকটা মামলায় তারা অপুর নাম দেবে। তাকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছেন তাতে যেকোন মানুষ যা কিছু বলবে তার সবই স্বীকার করে নেবে।”
তবে পুলিশ রিমান্ডে থাকা অবস্থায় অপুকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের উপ কমিশনার তালেবুর রহমান বলছেন, “পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের কোনো সুযোগ নেই। রিমান্ডে যথাযথ নিয়ম মেনে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সংশ্লিষ্ট আসামিকে কারা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়।”

ভুল হয়েছে, মাফ চাইলেন স্ত্রী
অপু কী করে ওই চাঁদাবাজি কাণ্ডে জড়ালেন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একেকবার একেক রকম তথ্য দিয়েছেন কাজী আনিশা। চাঁদাবাজির মূল দায় এনসিপি নেতা রিয়াদের ওপর চাপিয়েছেন তিনি। আবার কখনো বিএনপিকে ইঙ্গিত করেছেন।
একবার তিনি বলেছেন, “১৬ তারিখ থেকে শাম্মী আহমেদকে ধরার জন্য তারা গুলশানের বিভিন্ন জায়গায় টহল দিচ্ছিল। অপু কিন্তু জানতো না এখানে পরবর্তী ঘটনা কী হবে বা এখানে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটবে কী না। এটা পুরোটাই একটা পূর্ব পরিকল্পনা ছিল। এই সমন্বয়ক বা এনসিপির নেতাদের দাবায় রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট দল ওদের পিছে আছে। কারণ ওদেরকে ব্যবহার করে অনেক বড় স্বার্থ সিদ্ধি করতে পারে। সেই উদ্দেশ্যে অপুকে ওখানে ফাঁসানো হয়েছে।
”ওই বাসায় অপুদের ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপনারা ভিডিওতে অপুর পাশে একটা ব্যাগ রাখা দেখেছেন। যেখানে বলা হচ্ছিল ওই ব্যাগে ১০ লাখ টাকা রয়েছে। কারো কাছ থেকে জোর করে টাকা নিলে চাঁদা আদায় হয়। কিন্তু ওই লোক অপুর পাশে ইচ্ছেকৃতভাবে ব্যাগটা রাখছে। ওনার স্বার্থটা কী? অপুর মত ছোট ছোট ছেলেকে উনি কেন এত টাকা দেবেন। এই প্রশ্নটা কেউ করছে না কেন। শাম্মী আহমেদকেই বা কেন এখনো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।
“অপুর সাথে অনেকের খারাপ সম্পর্ক। কারণ অপুকে দিয়ে তারা স্বার্থ হাসিল করতে পারে নাই। অনেকে তার কাছে পদ চাইছে, অনেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তাদের পদ বহাল রাখার জন্য অপুর কাছে সুপারিশ চাইছে কিন্তু সে করে নাই। এই মানুষগুলোই অপুর বিরুদ্ধে লেখালেখি করছে।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অপু ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন কিন্তু তিনি জানতেন না যে সেখানে টাকা লেনদেন হবে। রিয়াদ তাকে ভুল বুঝিয়ে সেখানে নিয়ে যায়।
টাকার দ্বিতীয় কিস্তি ওঠাতে গিয়ে যখন কয়েকজন ধরা পড়ে সেদিন অপু সেখানে ছিলেন না দাবি করে আনিশা বলেন, সেদিন অপু মিঠামঈনে ছিল, ঢাকাতেই ছিল না।
তবে শেষে আনিশা বলেন, “ঠিক আছে আমি মানলাম অপুর একটা ভুল হয়ে গেছে, সেজন্য আমি সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
“আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন আপনি এতদিন কিছু বলেন নাই কেন। অপুর এনসিপির ওপর যখন দায় এল তখন তারা আমাকে এখানে নিয়ে এসে কথা বলার সুযোগ করে দেয়।”
গুলশানে চাঁদাবাজি: অপুকে চিনলেও সম্পৃক্ততা 'অস্বীকার' উপদেষ্টা আসিফের
গুলশানে চাঁদাবাজি: 'দোষ স্বীকার করে' অপুর জবানবন্দি
গুলশানে চাঁদাবাজি: রিয়াদের দোষ স্বীকার, ৪ আসামি কারাগারে
গুলশানে চাঁদাবাজি: গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক অপু গ্রেপ্তার
'চাঁদার' ৩ লাখ টাকা উদ্ধার, রিয়াদ-অপু গড়ে তুলেছিল 'সিন্ডিকেট': পুলিশ