Published : 09 Apr 2026, 12:51 PM
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠা শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কী সিদ্ধান্ত দেয়, তা জানার অপেক্ষায় পুরো দেশ।
এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ২৭ জানুয়ারি মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল।
গত বছরের ৬ অগাস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে এ মামলার বিচার শুরু করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গত ৫ মার্চ রায়ের দিন নির্ধারনের পর প্রসিকিউটর এস এম ময়নুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, “সাক্ষ্য–প্রমাণের মাধ্যমে আমরা আশা করছি যে, এ মামলায় অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি এবং সে কারণে আমরা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছি।”
তিনি জানান, এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
আবু সাঈদের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিরা এবং পটভূমির সাক্ষী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এছাড়া ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ভিডিও ও টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের ভিডিও প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়েছে।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং আনোয়ার পারভেজ আপেলের পক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু তাদের বেকসুর খালাস চান।
তিনি বলেন, “আবু সাঈদের শরীরে গুলির কোনো অস্তিত্ব রেডিওগ্রাফিক বা এক্স-রে পরীক্ষায় পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, তার গলা থেকে কোমর পর্যন্ত পরিহিত কালো টি-শার্টের জব্দকৃত অংশে কোনো ছিদ্র ছিল না। ফলে গুলির কারণে তার মৃত্যু হয়েছে এমনটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি।”
ছয়জন পুলিশ সদস্যের লাঠিচার্জ করার কথা বলা হলেও অভিযোগপত্রে মাত্র একজনকে আসামি করায় তদন্ত প্রতিবেদনটি ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেন এই আইনজীবী।
আইনজীবী দুলু বলেন, আবু সাঈদের হাতে একটি লাঠি ছিল এবং তিনি সেটি দিয়ে পুলিশের লাঠির আঘাত ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন—যা তদন্তকারী কর্মকর্তা জেরায় স্বীকার করেছেন।
ফৌজদারি আইন অনুযায়ী লাঠিও একটি 'অস্ত্র' হিসেবে গণ্য হয়, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তাকে (আবু সাঈদ) ‘নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ সিভিলিয়ান’ হিসেবে ধরে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে আনা আইনগতভাবে কতটা যৌক্তিক—সেটি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে আবু সাঈদ একজন বীরত্বগাথা সম্পন্ন আন্দোলনকারী ছিলেন এবং রাষ্ট্রও তার সেই বীরত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে—এ বিষয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই।”
এ মামলায় মোট ৩০ জন আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জন পলাতক এবং ছয়জন গ্রেপ্তার অবস্থায় কারাগারে আছেন।
আসামি যারা
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি হাসিবুর রশীদ
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) তৎকালীন কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু
তৎকালীন উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু
অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন
সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন
তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন
এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব
এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন
কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর শরিফুল ইসলাম
গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান
লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ
সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল
সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান
সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া
সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম
সহসভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী
সহসভাপতি আখতার হোসেন
সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ
ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর
দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ
বিশ্ববিদ্যালয় এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল
সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু
এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু
প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ
রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন
তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার ছয়জন হলেন—এএসআই আমির হোসেন, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল ও প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ।
মামলা বৃত্তান্ত
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন।
সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পরদিন থেকে সারা দেশে ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এরপর বিক্ষোভে দমন-পীড়ন আর সহিংসতার মধ্যে ১৯ জুলাই কারফিউ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি শেখ হাসিনা সরকার।
তুমুল গণ-আন্দোলনের মধ্যে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ নেয়। এরপর আবু সাঈদের মামলাও ট্রাইব্যুনালে আসে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে ৩০ জনের সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে। ২০২৫ সালের ২৪ জুন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।
এরপর ৩০ জুন অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পলাতক থাকা ২৪ আসামির জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চারজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।
ওই বছরের ৬ অগাস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রসিকিউশন এবং ২৭ জানুয়ারি আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।