Published : 28 Apr 2026, 06:54 PM
রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলার রায় শিগগিরই আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
“এ মামলায় মিয়ানমারের দায় নির্ধারণ, চলমান নিপীড়ন বন্ধ, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একাধিক রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে লিখিত ও মৌখিক শুনানি সম্পন্ন হওয়াসহ মামলাটি ইতোমধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে’ অগ্রসর হয়েছে।
তিনি বলেন, “আদালতের রায় শিগগিরই প্রত্যাশিত।”
মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হলে সিলেট ৫ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণের মুখে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয় আর তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গারা নির্বিচার হত্যা, ব্যাপক ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন।
জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন তদন্ত শেষে সিদ্ধান্তে আসে, ২০১৭ সালে হওয়া ওই সামরিক হামলার সময় ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এরপর পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র গাম্বিয়া ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনা হয় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইসিজেতে যুগান্তকারী এ মামলার বিচার শুরু হয়।
রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৯ হাজার
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইউএনএইচসিআরের ১৩ এপ্রিলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে বহুমুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।
এ সংকটের টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তৎপরতা অব্যাহত রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খলিলুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
“রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিক দায়িত্ব পালন, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অটল অবস্থান ও সক্রিয় কার্যক্রম বজায় রেখেছে।”
১২ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে ‘কাজ করছে’ সরকার
কক্সবাজার ৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বাংলাদেশে অস্থায়ীভাবে বসবাসরত ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমানা সুরক্ষিত রাখা এবং মানব পাচার, মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।
সার্ক সক্রিয় করার উদ্যোগ
এনসিপির সংসদ সদস্য কুড়িগ্রাম ২ আসনের আতিকুর রহমান মুজাহিদের প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার তার ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে সার্ককে সক্রিয় করার পদক্ষেপ নিয়েছে।
সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহের বিষয়টি পৌঁছানোর কথাও বলেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পারস্পরিক আস্থা, আঞ্চলিক সংলাপ এবং সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে’ সার্ককে পুনরায় কার্যকর করা সম্ভব।
“এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সক্রিয়, গঠনমূলক ও দূরদর্শী কূটনৈতিক ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে।”
ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা: যোগাযোগ রাখছে দূতাবাস
জামালপুর ২ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য এ ই সুলতান মাহমুদ বাবুর প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ‘নির্মমভাবে’ নিহত হয়েছেন।
“ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ফ্লোরিডায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল নিহতদের পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছে।”
নিহতদের দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
‘প্রবাসীদের নিরাপত্তায় কাজ করছে সরকার’
নোয়াখালী ১ আসনের সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সেখানে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’ দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “এ লক্ষ্যে সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”
বর্তমান সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার’ সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে বলেও আশ্বস্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভারতের ভিসা স্বাভাবিক করতে আহ্বান
কিশোরগঞ্জ ৫ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করতে ভারতকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “আশা করা যাচ্ছে, শিগগিরই এ বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।”
নিজের ভারত সফরের কথা তুলে ধরে খলিলুর রহমান বলেন, সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে তার ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, “ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সৌহার্দ্য, বন্ধুত্ব ও সংহতিতে প্রতিফলিত এবং তা অভিন্ন মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক সংযোগ ও জনগণের সঙ্গে জনগণের দৃঢ় সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভারতের সঙ্গে সার্বভৌম সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক সম্মান ও আস্থা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।”
ভূমি দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ড ঘৃণ্য অপরাধ, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ‘মারাত্মক ক্ষতিকর’।
দেশের উন্নয়নে ‘সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিকল্প নেই’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার একটানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের অনুগত সন্ত্রাসী বাহিনী ভূমি দখল, জল, বালুমহাল দখল, বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।”
বর্তমান সরকার এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে ভূমি দখল, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার ফলে এসব অপরাধ অনেকাংশে কমেছে।
পুলিশে নতুন সাড়ে ১৪ হাজার পদ
মাদারীপুর ২ আসনের সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪টি পদ রয়েছে।
এর মধ্যে পুলিশ পদ ২ লাখ ৭ হাজার ৭৪৫টি, নন-পুলিশ পদ ৮ হাজার ৪৭টি এবং নন-পুলিশ আউটসোর্সিং পদ ২ হাজার ৭৬২টি।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, নতুন করে সাড়ে ১৪ হাজার পদ সৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে এএসপি পদ ৫০০টি, এসআই নিরস্ত্র পদ ৪ হাজারটি এবং কনস্টেবল পদ ১০ হাজারটি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২ হাজার ৭০৩টি কনস্টেবলের শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া সরাসরি ২ হাজার এএসআই নিয়োগ করা হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’
বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা বিধানে ‘বদ্ধপরিকর’।
সরকারের দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ পুলিশ বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে এবং নানাবিধ পদক্ষেপের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করছে বলে তার ভাষ্য।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এসব পদক্ষেপের ফলে জনগণের নিরাপত্তা বিধানসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
গুম কমিশনের প্রতিবেদন মানবাধিকার কমিশনে সংরক্ষিত
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য চট্টগ্রাম ১৫ আসনের শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুম কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে সংরক্ষিত আছে।
নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আইনি সহায়তাসহ সব ধরনের সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।