Published : 16 Dec 2025, 10:57 PM
মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই অপবাদ আর গঞ্জনা বয়ে বেড়াচ্ছেন বীরাঙ্গনা শেখ ফাতেমা আলী।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সয়েছেন পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার আর নির্যাতন। যুদ্ধের পরেও রেহাই মেলেনি। সংসার ভেঙ্গেছে মেয়ের, সামাজিকভাবে হয়েছেন নিগৃহীত।
এখন এই বীরাঙ্গনার চাওয়া, মৃত্যুর পর যেন উত্তরসূরিদের সেই অপবাদ আর গঞ্জনার ভার না বইতে হয়।
মঙ্গলবার রাতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ–অন্তহীন যুদ্ধ: গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’—এর প্রথম খণ্ডের প্রকাশনা উৎসবে এমন আকুতি তুলে ধরেন তিনি।
সংকলনটির মোড়ক উন্মোচন করেন মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর নারী শেখ ফাতেমা আলী ও ফিরোজা বেগম। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামান চৌধুরী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিয়া ও মো. শহিদউল্লাহ এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

শেখ ফাতেমা আলীর বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার তাড়াইল গ্রামে। বাবা শেখ আতিয়ার রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন।
এই খবর রাজাকাররা দিয়ে আসে পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে। ওরা এসে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। চোখের সামনে গুলি করে মারে তার চার ভাই ও এক বোনকে। তারা তখন পালিয়ে আশ্রয় নেন বড় নৌকায়। একদিন রাজাকারদের সহযোগিতায় ওই নৌকায় হানা দেয় পাকিস্তানি সেনারা। তার বাবার সামনেই তারা তাকে নির্যাতন করে। পরে তুলে নিয়ে যায় যশোরের শার্শায়, বাগআঁচড়ায় পাকিস্তানি ক্যাম্পে। অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন শেখ ফাতেমা আলী। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনে পেটের সন্তান পেটেই মারা যায়।

একাত্তরের সেই নির্মম স্মৃতির দগদগে ঘাঁ এখনো তার মনে, শরীরে। সেই স্মৃতি আর মনে করতে চাননি তিনি। তবে, বললেন পাল্টে যাওয়া সময়ের কথা।
“আমরা ৫৪ বছর ধরেই স্বাধীনতা দিবস দেখে আসতেছি। কিন্তু আজকেরটা কেমন যেন একটু পরিবর্তন মনে হয়। এখানে আসার আগে আজ বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে আমরা যে গেলাম, আমাদেরকে দাওয়াত দিয়ে, কার্ড দিয়ে নিয়ে গেল। কিন্তু ওইখানে সব কচি কচি ছেলেমেয়েরা বসেছিল, আমাদের বসার কোনো জায়গা আমরা পাইনি। খুব কষ্ট লাগছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “আমার কথা আমি বলি, অন্য মানুষের কথা বলি না। আমি একজন অসুস্থ মানুষ, হাতের লাঠি নিয়া মুসাফিরের মতন দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
কোনো কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধ করেননি, সেটি মনে করিয়ে দিয়ে ধরা গলায় তিনি বলতে থাকেন, “আমাদের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখন আমরা দেশ রক্ষা করার জন্য, নিজের ইজ্জত রক্ষা করার ঝাঁপিয়ে পড়ছিলাম।
“কিন্তু কিছু লোকের মুখে আজ শুনলাম যে, মুক্তিযোদ্ধাদের নাকি অস্তিত্বই থাকবে না। খুব কষ্ট পেয়েছি আমি, আজকে আমি চোখের পানি ফেলে আসছি। আমাদেরই মতন যেকোনো মায়ের ঘরেই তো তারা হইছে। এই প্রজন্মই দেশ চালাবে। কিন্তু তারা যদি এভাবে বিবেচনা করে, তাহলে কষ্টের সীমা থাকে না।”
এই বীরাঙ্গনা বলেন, “আসলে আমরা অনেক কিছু হারাইছি। স্বামী হারাইছি, সন্তান হারাইছি। মেয়ে স্বামীর ঘর থেকে ফেরত আসছে। আমি ১৯৭১ সনের নির্যাতিত নারী, এ কথা প্রকাশ হওয়ার কারণে আমার মেয়ে সংসার করতে পারে নাই। তিনটা নাতি-নাতনি নিয়ে আমার মেয়ে একটা সাগরে ভাসছে।
“প্রজন্মদের কাছে আমার একটাই আকুল আবেদন, আমাদেরকে যেন এরকম আর লজ্জা না দেয়; অপবাদ না দেয়।”

‘আল্লাহ তুমি এগুলা আর দেখাইয়ো না’
“আল্লাহ তুমি এগুলা আর দেখাইয়ো না। এগুলো এখনো মনে হলে গা কাঁপে থর-থর করে। একটা ছেলে থাকলেও হয়ত গঞ্জনা সইতে হত না।”
এই আক্ষেপ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আরেক বীরাঙ্গনা ফিরোজা বেগমের। মঙ্গলবার ফাতেমা আলীর সঙ্গে তিনিও এসেছিলেন অনুষ্ঠানে।
ফিরোজার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের হযরতপুর গ্রামে। একাত্তরে তার কোলের ৬ মাস বয়সী ছেলেকে পাকিস্তানি সেনারা চোখের সামনে আছড়িয়ে হত্যা করে।
এরপর তাকে তুলে নিয়ে যায় যশোরের শার্শায়, বাগআঁচড়া ক্যাম্পে। ওখানের পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে রেখে তার ওপর নির্যাতন চালানো হতো। হেমায়েত বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা ওই ক্যাম্পে আক্রমণ করে ফিরোজাসহ সব নারীকে উদ্ধার করে। পাগলপ্রায় ফিরোজাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা করান শেখ ফাতেমা আলী।
সেই নির্যাতনের চিহ্ন তার কনুইয়ে এখনো আছে। তার চেয়ে বেশি রয়ে গেছে মনে।
কেমন দেখতে চেয়েছিলেন দেশকে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “দেশটার শান্তি চাইছিলাম। শান্তি কি খোদা তালায় রাখে না রাখে, জানি না। কষ্ট করতে করতে জীবনটা শেষ করে দিছি। যেখানে যাই, হেনে (সেখানে) মানুষের লাথি-গুঁতা খাই।”
নিজের মেয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ার গল্প তুলে ধরে তিনি বলনে, “মাইয়াডার আরও দুই জায়গায় বিয়া দিছি, দুই জায়গার স্বামী পরিত্যক্তা। তিন-তিনডা নাতীন আমার মাথায় ঘোরে। আর কোনো দিশা পাই না। এখন কী স্বামীর ভাত খাইয়া যাইতে পারবো, নাকি পারবো না, খোদায় জানে।”
পাকিস্তানি আর্মিদের ক্যাম্প থেকে উদ্ধারের পর তিনি অনেক দিন মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন।
সেই গল্প তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি ছিলাম পাগল। কাগজ কুড়াইছি। কত কিছু করছি। এহন শুধু শান্তিতে মরতে চাই। আর কিছুই চাওয়ার নাই।”
একাত্তর 'নিকৃষ্টতম প্রজন্ম', শুনে বুক ফেটে যায়: মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান