১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

একাত্তর ‘নিকৃষ্টতম প্রজন্ম’, শুনে বুক ফেটে যায়: মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান

বিজয় দিবসের রাতে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের সংকলনের প্রথম খণ্ডের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসে তিনি ও তার চার সহযোদ্ধা বাঙালির শ্রেষ্ঠ এ অর্জন নিয়ে কথা বলেন।

একাত্তর ‘নিকৃষ্টতম প্রজন্ম’, শুনে বুক ফেটে যায়: মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান
মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর নারী শেখ ফাতেমা আলী ও ফিরোজা বেগমের সঙ্গে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিয়া। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’–এর প্রথম খণ্ডের প্রকাশনা উৎসবে এসেছিলেন তারা।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Dec 2025, 03:45 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:46 PM

১৯৭১ সালের প্রজন্মকে কেউ যখন প্রকাশ্যে ‘নিকৃষ্টতম প্রজন্ম’ বলে মন্তব্য করে, তা শুনে ‘বুক ফেটে’ যায় বলে আক্ষেপ করেছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিয়া।

তিনি বলেছেন, “স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদেরকে ‘শ্রেষ্ঠতম নাগরিকের’ মর্যাদা দিয়েছে। জীবিত অবস্থায় আমরা কিছু পাই আর না পাই, মরার পরে আমাদেরকে জাতীয় পতাকা আবৃত করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে।”

বিজয় দিবসের রাতে মঙ্গলবার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’–এর প্রথম খণ্ডের প্রকাশনা উৎসবে যোগ দিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

পরাধীনতার শিকল ভেঙে বাঙালির রক্তে রাঙা স্বাধীনতার ইতিহাসকে তিন খণ্ডের সংকলনে মলাটবদ্ধ করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। 

‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ–অন্তহীন যুদ্ধ: গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’ শিরোনামে এ সংকলনের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় এদিন বিজয় দিবসের রাতে।

সংকলনটির মোড়ক উন্মোচন করেন মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর নারী শেখ ফাতেমা আলী ও ফিরোজা বেগম। এসময় বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামান চৌধুরী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিয়া ও মো. শহিদউল্লাহ এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী উপস্থিত ছিলেন।

নেত্রকোনার কেন্দুয়ার শাহজাহান মিয়া ১৯৭১ সালে ছিলেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ওয়ারলেস অপারেটর। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের সংবাদ প্রথম ওয়ারল্যাস বার্তায় পাঠিয়েছিলেন তিনি। 

রাজারবাগ পুলিশ লাইনের প্রতিরোধ যুদ্ধ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ১১ নম্বর সেক্টরের চান্দুয়া, বিজয়পুর, ধর্মপাশা এলাকায়।

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে হতাশার কথা তুলে ধরে যুদ্ধাহত এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “এখন মোবাইল ফোনে দেখি, অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জুতার মালা পরানো হচ্ছে। এগুলো দেখে কী বলবো, আমাদের এখন প্রতিবাদ করার শক্তি নাই।”

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়া।

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়া।

সত্যকে সত্য বলার প্রত্যয়ের কথা ব্যক্ত করে শাহজাহান মিয়া বলেন, “যুদ্ধ তো আমি একা করি নাই। বঙ্গবন্ধুও একা করে নাই। জিয়াউর রহমানও একা করেন নাই। আমরা সম্মিলিতভাবেই মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সম্মিলিতভাবেই এই দেশ আমরা স্বাধীন করেছি।

“আজকে আমরা শুনি একাত্তরে না কি ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া ছিল। এই ইতিহাস কি মানতে পারে কেউ? এই ইতিহাস মানা যাবে না।”

যুদ্ধের শেষ দিকে এসে ৭ ডিসেম্বর আহত হন তিনি। বিজয়পুর অপারেশনের সময় পাকিস্তানি সেনাদের পুঁতে রাখা মাইনের স্প্লিন্টারে বিদ্ধ হয় তার বাঁ পায়ের পাতা।

মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের বাগাড়ম্বর নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে শাহজাহান মিয়া বলেন, “উঁই পোকার পাখা গজায় মরিবার তরে। এই কথাটা আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম, যারা এই দেশে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে যে অবস্থানেই থাকুক মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে সবাইকে এক হতে হবে।”

‘রক্তরেখা বাংলাদেশের’ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন আরেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. শহিদউল্লাহ্। 

তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতের আসামের লোহারবন ট্রেনিং ক্যাম্পে ২৮ দিনের বেসিক প্রশিক্ষণ এবং জেএল (জুনিয়ার লিডারশিপ) নামে ২২ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। তিনি ৪ নম্বর সেক্টরের জালালপুর সাব-সেক্টরের অধীনে সিলেটের কানাইঘাট ও আটগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ অংশ নেন।

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শহিদউল্লাহ্।

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শহিদউল্লাহ্।

মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছর পর দেশ ঠিক পথে হাঁটছে কি না এমন প্রশ্ন ছিল তার কাছে। 

তিনি বলেন, “আমার মনে হয় হাঁটছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অনেক কিছুই বাধাগ্রস্ত হয়। এখন আমরা একটা বাধাগ্রস্ত অবস্থায় চলছি, আমার ধারণায়। সময়ের বিবর্তনে আমরা কিন্তু অনেকটা এগিয়ে গেছিলাম। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হয় আমরা পিছিয়ে আসছি। সামনে ভবিষ্যৎই বলবে আল্লাহ কী করে।”

১৯৭১ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সিলেটের আটগ্রামে এক অভিযানে পাকিস্তানিদের সেলের স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয় তার ডান পায়ের হাঁটুর ওপর ও বাম পায়ের বিভিন্ন জায়গায়।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন একটি সংকলন প্রকাশের জন্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই সময়ে আপনারা যেই অনুষ্ঠানটা করলেন তাতে আমি মনের দিক দিয়ে খুবই ভালো অনুভব করছি। এখনতো সব দিক দিয়ে বন্ধ দরজা-জানালা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় যেই অবস্থা ছিল, এখন সেই অবস্থাটা বিরাজ করছে। এই সময়ে এই সংকলন দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন বলেই আমার মনে হয়।”

নতুন প্রজন্মের প্রতি নিজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “সময়ের বিবর্তনে কিছু কিছু বিপৎগামী আসবে, যাবে। এই কারণেই হয়তো কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমি আশা করি, এই সমস্যা থাকবে না। আমাদের প্রজন্ম ঘুরে দাঁড়াবে।”

অনুষ্ঠানে যোগ দেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামান চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের আয়কর কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করেন, চলে যান কলকাতায়। মুজিবনগর সরকারের ইয়ুথ অ্যান্ড রিসেপশন ক্যাম্পের ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। অধ্যাপক ইউসুফ আলী ছিলেন এ বোর্ডের প্রধান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামান চৌধুরী।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামান চৌধুরী।

নতুন প্রজন্মের কাছে তার কী প্রত্যাশা? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “নতুন প্রজন্মের যারা আছে, তারা সবদিক থেকেই আমি মনে করি যে ভবিষ্যতে আশা করার মতো। তাদের দিকে তাকালে বা তাদের অ্যাকটিভিটি দেখলে মনে হয়। কিন্তু একটা হলো বাস্তবতা আর একটা হলো বর্তমান অবস্থা। দুটোর মধ্যে মিল নাই।” 

তবু আশার কথাই শোনালেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, “আমরা হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি। আমাদের শিক্ষার মধ্যে যেটা করা উচিত ছিল, সেটা হলো শিক্ষাটা বহুমুখী করা দরকার এবং শিক্ষাটা কার্যমুখী করা দরকার। আনঅফিশিয়ালি বাংলাদেশের বর্তমান বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ, শিক্ষিত বেকার। আর অশিক্ষিত বেকার হলে তো বোধ হয় সংখ্যা কোটি পার হয়ে যাবে।

“এই ক’দিন আগেও দেখলাম সিউলে তারা সেকেন্ড প্রাইজ পেল উদ্ভাবনে। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগিতার মধ্যে তারা গিয়ে টিকে থাকছে। যেখানে পাশাপাশি ভারত আছে, কোরিয়া আছে, চায়না আছে, তাদের সঙ্গে তো কোনো তুলনাই হয় না আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার। তো এতটা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যদি তারা এত ভালো করতে পারে, আমরা যদি তাদের সত্যি বাস্তবমুখী এবং তাদেরকে একটা সুযোগ দিই, তাহলে আমাদের এই বর্তমান প্রজন্ম যারা আছে, আমার ধারণা তারা দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারতো।”

রক্তরেখায় বাংলাদেশ সংকলনের সম্পাদনা পর্ষদের একজন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সালেক খোকন ছিলেন অনুষ্ঠানে। সংকলনটি প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী’কে ধন্যবাদ দেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সালেক খোকন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সালেক খোকন।

সালেক খোকন বলেন, “এই সময়ে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ বইটি প্রকাশ করা আমি মনে করি, একটা বার্তা। রাষ্ট্রকে এই জায়গায় পরিস্কার একটি বার্তা দিতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না। যে দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসুক, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে সকলকেই এক হতে হবে।”

বইটি মুক্তিযুদ্ধকে সঠিক ইতিহাস জানাতে সহায়ক হবে বলেও মনে করেন এই গবেষক। বলেন, “‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করলেন বীরাঙ্গনা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এটি অনেক বড় একটি কাজ করল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

“যে বীরাঙ্গনাদের অপবাদ দেয় একটি চক্র। সেই জায়গায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম তাদের দিয়ে মোড়ক উন্মোচন করেছে। এটি কোনো সাহসী ঘটনা বলব না। তবে এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বীরদের প্রতি সম্মান জানানো হয়েছে।”

তিনি বলেন, “বীরাঙ্গনারা আজকে নানা রকম সামাজিক প্রহসনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই জায়গায় তাদের অন্তরে এক ধরনের শান্তি বা একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করবে বলে আমি মনে করি।”

আরও পড়ুন

শিকলভাঙার ইতিহাস 'রক্তরেখায় বাংলাদেশ

বীরাঙ্গনার আকুতি: 'আমাদের আর অপমান কইরেন না'