ফেইসবুক-টিকটকে ‘ক্লান্ত’ তরুণ প্রজন্ম: রাষ্ট্রপতি

“এভাবে চলতে থাকলে তারা নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকেই একদিন ভুলে যাবে।”

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Sept 2022, 02:39 PM
Updated : 22 Sept 2022, 02:39 PM

মোবাইল ফোন বিনোদনের সঙ্গী হয়ে ওঠায় তরুণ প্রজন্ম সামাজিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলবে বলে সবাইকে সতর্ক করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

 বৃহস্পতিবার জাতীয় শিল্পকলা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এই সতর্কবার্তা দিয়ে সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের উপর জোর দেন।

আবদুল হামিদ বলেন, মোবাইল আর ল্যাপটপ এখন তরুণ প্রজন্মের বিনোদন ও খেলাধুলার প্রধান সামগ্রী।

তিনি বলেন, “ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে আর যুব সম্প্রদায় ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটক, গেমসসহ বিভিন্ন অ্যাপের পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত। এভাবে চলতে থাকলে তারা নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকেই একদিন ভুলে যাবে।

“তাই তাদেরকে সুস্থ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে। সংস্কৃতির চর্চা তৃণমূল বিশেষ করে পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।”

‘শিল্পকলা পদক ২০১৯ ও ২০২০’ প্রদান অনুষ্ঠানটি হয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে, বঙ্গভবন থেকে তাতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন রাষ্ট্রপ্রধান।

মহামারীর খড়গে এক বছর বাদে সেই অনুষ্ঠান হল। পদকজয়ীদের নাম গত বছরের ১৩ জুন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল শিল্পকলা একাডেমি।

পদকপ্রাপ্তদের হাতে সোনার পদক এবং নগদ এক লাখ করে টাকা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির পক্ষে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ পদক তুলে দেন।

সংস্কৃতি চর্চায় পরিবারের ভূমিকার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, “জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় প্রধান অস্ত্রের ভূমিকা রাখতে পারে সংস্কৃতি।

“আগে প্রতিটি পরিবারেই সকাল বেলায় সঙ্গীতসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা হত। কিন্তু নগরসভ্যতার ক্রমবিকাশ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার আর শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় পারিবারিক পর্যায়ে সংস্কৃতির চর্চা ক্রমেই কমে আসছে।”

সামাজিক অবক্ষয় রোধে সংস্কৃতি চর্চার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “গ্রাম থেকে শহর, নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত প্রতিটি স্তরে সংস্কৃতির চর্চা যত বেশি হবে, সমাজও ততবেশি আলোকিত হবে।

“আলোকিত সমাজই পারে মানবিক সমাজ গড়তে, একটি দেশ ও জাতির কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধি ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে। কালের বিবর্তনে সমাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সংস্কৃতিতেও এর ছোঁয়া লেগেছে।”

ভিনদেশি সংস্কৃতির কোনো কিছু গ্রহণের ক্ষেত্রে তা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খেয়াল রাখার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপ্রধান।

তিনি বলেন, “আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে প্রতিনিয়ত আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভিনদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে। তাই বিদেশি বা আকর্ষণীয় হলেই সবকিছু লুফে নেওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে যতটুকু সামঞ্জস্য, ততটুকুই গ্রহণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয়, বিজাতীয় ও অপসংস্কৃতির সবকিছু বর্জন করতে হবে।”

অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু এটাই সবকিছু নয় বলে মন্তব্য করেন আবদুল হামিদ।

তিনি বলেন, “সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে আমাদের আবহমান কালের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশে তৃণমূল পর্যায়েই উদ্যোগ নিতে হবে।

“সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের দর্পণ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যেমন আমাদের বাহ্যিক ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর দেখে নিজেদের তৈরি করে থাকি, তেমনই আমাদের সংস্কৃতির বিকাশ ও ঐতিহ্যও জানিয়ে দেয় জাতি হিসেবে আমরা কতটা উন্নত ও আধুনিক। দেশের যুবসমাজকে আধুনিক, দক্ষ ও সংস্কৃতিমনস্ক জনশক্তিতে পরিণত করতে হলে তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।”

শিল্পকলা একাডেমির ২০১৩ সাল থেকে ‘শিল্পকলা পদক’ দিয়ে আসছে। মোট ১২টি ক্যাটাগরিতে এই পদক দেওয়ার রীতি থাকলেও ২০১৯ ও ২০২০ সালের জন্য যাত্রাশিল্প ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক গবেষক ক্যাটাগরিতে পদক দেওয়া হচ্ছে না।

এই দুই বছরের জন্য পদকপ্রাপ্তরা হলে- নাট্যকলায় মাসুদ আলী খান ও মলয় ভৌমিক; কণ্ঠসঙ্গীতে হাসিনা মমতাজ ও মাহমুদুর রহমান বেণু; চারুকলায় আবদুল মান্নান ও শহিদ কবীর; চলচ্চিত্রে অনুপম হায়াৎ ও শামীম আখতার; নৃত্যকলায় লুবনা মারিয়াম ও শিবলী মোহাম্মদ; লোকসংস্কৃতিতে শম্ভু আচার্য্য ও শাহ আলম সরকার; যন্ত্রসঙ্গীতে মো. মনিরুজ্জামান ও মো. সামসুর রহমান; ফটোগ্রাফিতে এম এ তাহের ও আ ন ম শফিকুল ইসলাম স্বপন; আবৃত্তিতে হাসান আরিফ ও ডালিয়া আহমেদ এবং সৃজনশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবে পদক পাচ্ছে ছায়ানট ও দিনাজপুর নাট্য সমিতি।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন, সংস্কৃতি সচিব আবুল মনসুর, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক