যুদ্ধাপরাধের বিচারে ‘জটিলতা নিরসনে’ প্রধান বিচারপতিকে স্মারকলিপি

বিচারপতি এস কে সিনহা প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর যুদ্ধাপরাধের চলমান বিচারের ক্ষেত্রে ‘অস্বাভাবিক মন্থরতা ও জটিলতা’ দেখা দেয় বলে নির্মূল কমিটির ভাষ্য।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 Jan 2024, 03:23 PM
Updated : 24 Jan 2024, 03:23 PM

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জটিলতা নিরসনে চারটি পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানিয়ে প্রধান বিচারপতিকে স্মারকলিপি দিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। 

নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বে কমিটির উপদেষ্টা ও সদস্যরা বুধবার দুপুরে এই স্মারকলিপি দেন। 

২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‘ আইনের আওতায় ট্রাইব্যুনাল গঠন করে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়।

সে বিষয়টি ‍তুলে ধরে স্মারকলিপিতে বলা হয়, “এরপর এই বিচারের বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে, বিচারক ও প্রসিকিউটরদের বাড়িতে হামলা হয়েছে, সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, গুম করা হয়েছে, এমনকি দুজন সাক্ষীকে হত্যাও করা হয়েছে।

“এরপরও ট্রাইব্যনালের বিচারক, আইনজীবী ও তদন্ত সংস্থা অত্যন্ত সাহস, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে এই বিচারকার্য পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছেন।” 

কিন্তু ২০১৫ সালে বিচারপতি এস কে সিনহা প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর যুদ্ধাপরাধের চলমান বিচারের ক্ষেত্রে ‘অস্বাভাবিক মন্থরতা ও জটিলতা’ দেখা দেয় বলে নির্মূল কমিটির ভাষ্য। 

স্মারকলিপিতে বলা হয়, “তিনি [বিচারপতি এস কে সিনহা] প্রথমেই দুটি ট্রাইব্যুনালের ভেতর একটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেন এবং বিচারিক কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। নির্মূল কমিটি এবং সমমনা অন্যান্য নাগরিক সংগঠনের প্রবল বাধার কারণে বর্তমান ভবন থেকে ট্রাইব্যুনাল সরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও এই সব মামলার আপিল শুনানি তিনি বন্ধ করে দেন। এরপর থেকে যে গতিতে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল সেখানে শুধু ভাটাই পড়েনি একরকম স্থবির হয়ে গিয়েছে।“

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক সময়ের চেয়ারম্যান, আজকের প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের উদ্দেশে স্মারকলিপিতে বলা হয়, “আপনি নিজেও একসময় দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বিচারের গুরুত্ব সম্পর্কে আপনি সম্যক অবগত আছেন। ট্রাইব্যুনাল ব্যক্তি হিসেবে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীর বিচার করলেও এখন পর্যন্ত গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী সংগঠনসমূহ এবং একাত্তরে পাকিস্তানি হাই কমান্ডের বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হয়নি।“

এ ব্যাপারে স্মারকলিপিতে চারটি পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন করেছে নির্মূল কমিটি।

১. প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা কর্তৃক স্থগিত দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ;

২. আপিলের জটিলতা নিরসনের জন্য আপিল বিভাগে আরও বিচারপতি নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি অপেক্ষমান মামলাগুলো দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা গ্রহণ;

৩. কম্বোডিয়া ও অন্যান্য কয়েকটি দেশে যুদ্ধাপরাধের মামলায় আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে দ্রুত আপিল শুনানি নিষ্পত্তি করে; বাংলাদেশের মত কোথাও এসব ট্রাইব্যুনালের মামলার আপিল শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টে যেতে হয় না। আপিলের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশেও কম্বোডিয়ার মত আপিলের ব্যবস্থা করা;

৪. এই বিচারের সব মামলার কার্যবিবরণী ও দলিলপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা, যাতে বিচারকাজ শেষ হওয়ার পর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের প্যালেস অব জাস্টিসের মত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান ভবনটি জাদুঘর ও আর্কাইভে রূপান্তরিত করা যায়।

স্মারকলিপি দেওয়ার সময় নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, অধ্যাপিকা মাহফুজা খানম, সহসভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, কেন্দ্রীয় নেতা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ স্বাধীনতা সংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত, নির্মূল কমিটির আইটি সেলের প্রধান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর তন্ময় ও সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল প্রতিনিধি দলে ছিলেন।

স্মারকপত্রের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে নির্মূল কমিটির ১৫টি প্রকাশনাও প্রধান বিচারপতিকে দেওয়া হয়।