Published : 13 Apr 2026, 05:52 PM
বাংলা নববর্ষ উদযাপনে ঢাকার বাজারে ইলিশের চাহিদা বেড়ে গেছে; রূপালী ইলিশের কথা বলে ক্রেতার থলিতে তুলে দেওয়া হচ্ছে চন্দনা আর সার্ডিনও।
সামুদ্রিক মাছ সার্ডিন আবার কোথাও কোথাও বিক্রি হচ্ছে চন্দনা ইলিশ নামে। অবিকল ইলিশের মত দেখতে মাছটি আসছে মিয়ানমার থেকে।
আকারে তুলনামূলক ছোটো ও ইলিশের তুলনায় কম উজ্জ্বলতার মাছটি যে ইলিশ নয়, তা অনেকের চোখে ধরা পড়ে না। আর চন্দনা এক ধরনের ইলিশ হলেও এর স্বাদ রূপালির মতন নয়।
রান্নার পর এ দুই মাছ যে রূপালি ইলিশ নয়, তা আর বোঝার উপায় থাকে না বলে জানালেন যাত্রাবাড়ীর আড়ৎদার, গোবিন্দগঞ্জ ফিশের ওবায়দুর রহমান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, “রান্নায় তো অনেক মশলা ঢুকে যায় মাছের সঙ্গে। তাতে স্বাদ আলাদা করা যায় না।

“যারা ইলিশ মাছ নিয়মিত খায়, তারাই পার্থক্য কিছুটা ধরতে পারে। ভাজলে তো মাছের স্বাদ একটু বদলাবেই।”
দেশে জাটকা ছাড়াও ইলিশের মতো বা কাছাকাছি দেখতে চাপিলা, সার্ডিনের মতো মাছ পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।
রূপালি ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে চন্দনা, সার্ডিনের মতো মাছ বেচার কথা স্বীকার করলেও ব্যবসায়ীদের কেউই নাম প্রকাশ করতে চান না। তাদের ভাষ্য, মিশ্র করে মাছ না বেচলে তাদের ‘পোষাবে না’।
যাত্রাবাড়ীর আড়তে শরীয়তপুর ফিশারিজের নাজমুল ইসলাম বললেন, “আমরা তো চন্দনা ইলিশ নামেই বিক্রি করি। কেউ যদি ইলিশ নামে বেচে, সেটা তো আমাদের দোষ না। পাইকার তো দেখে শুনেই নিয়ে যায়।”
এদিন বেলা সাড়ে ১০টার সময়েও চন্দনা মাছ বিক্রি শেষ করতে না পারা ইলিয়াস হোসেন বলেন, “ইলিশের অর্ধেক দামে বিক্রি হয় চন্দনা।
“জাটকা সাইজ তো ২০০ টাকা কেজি। যার পছন্দ সেই নেয়, সবাইতো ইলিশ কিনে খেতে পারবে না। এটা গরিবের ইলিশ।”
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএফএ) মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজালাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আমাদের দেশে সার্ডিন, চৌক্কা জাতীয় মাছ আসছে তা প্রমাণ আকারের চেয়ে অনেক ছোটো। এগুলো বেশিরভাগ সময়েই স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সরকারি তথ্যেই আসছে। এখানে কোয়ালিটি কন্ট্রোলটা আরেকটু হওয়া দরকার।
“পশ্চিমা বিশ্বে যেসব মাছ রপ্তানি অযোগ্য ঘোষণা করা হয়, সেই মাছগুলো আমাদের দেশে আসছে। আমদানি নিষিদ্ধ না, তবে কোয়ালিটি নিশ্চিত করে চন্দনা বা সার্ডিন নামেই বিক্রি হওয়া উচিত।”

কোন মাছের কেমন দর
বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তে এসেছে বিপুল পরিমাণ সার্ডিন মাছ। আড়াইশ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের প্রতি কেজির দাম ৪০০ টাকা। এর চেয়ে কম ওজনের দাম কেজি প্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
অন্যদিকে আধা কেজি থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের মাছের দাম প্রতি কেজি ৯০০ টাকা। তার চেয়ে বেশি ওজন হলে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
নয়ন এন্টারপ্রাইজ আড়তের হামিদ হোসেন জানালেন, আধা কেজি থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে। আধা কেজির চেয়ে কম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে।
আর ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের রূপালি ইলিশ ১১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিন দেড় কেজি ওজনের ইলিশ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকা কেজি দরে। আর তার চেয়ে বেশি ওজনের রুপালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা কেজি দরে। তবে খুচরা বাজারে দর খানিকটা বেশি।
যাত্রাবাড়ী কাঁচা বাজারের খুচরা বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, “বরিশাল ও চাঁদপুরের ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম পড়বে ১ হাজার ৯০০ টাকা কেজি।”
তিনি জানান, দুই কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি করছেন দুই হাজার ৮০০ টাকা কেজি। একই ওজনের বরিশালের নদীর ইলিশ বিক্রি করছেন তিন হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে।

তুলনামূলক সবচেয়ে ছোট আকারের ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি করছেন এক হাজার ২০০ থেকে আড়াইশ টাকা।
মাছ কত দিন আগে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তার সতেজতায় এখন কেমন—এ দুই মানদণ্ডে ইলিশের দাম ঠিক করছেন বিক্রেতারা।
বৈশাখ উপলক্ষে এবার ইলিশের আড়তে মাছের সমাহার থাকলেও ক্রেতা না পেয়ে বেলা সাড়ে ৯টাতেও অপেক্ষা করছিলেন বিক্রেতা মিজানুর রহমান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্য কোনো মাছের আড়তদার এখন আড়তে নাই। সবাই ড্রাম খালি করে গ্যাছে গা। আমরা ইলিশের আড়তদাররাই আছি।”
গেল বছরের তুলনায় বিক্রি অনেক কমেছে দাবি করে মিজানুর বলেন, “মানুষ কিনতে আসছে না। বেশি দামে মাছ আনছি, বরফ খোলা হয়ে গেছে।
“এখন এই মাছ আইজ বিক্রি না হলে কাইলকে আরো কমে বেচতে হবে।”

মাছ ব্যবসায়ী মিজানুর মনে করেন, মানুষের হাতে টাকা নাই। সে কারণেই উৎসবের এ সময়ে বিক্রিবাট্টা কম।
ইলিশ কিনতে আসা আসিফ মাহমুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পাঁচটা মাছ কিনলাম ৮ হাজার টাকায়।”
খুব সকালে এলেও দর কষাকষি করে বেলা ১০টার দিকে মাছ কিনতে পেরেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “দাম অনেক বেশি। আমি তো বেচুম না, বাসায় নিয়া যামু।”
মাছের আড়তে মূলত বেচাকেনা হয় শেষ রাতের দিকে। সূর্যের আলো ফোটার পর থেকে কমতে থাকে ভিড়।
বেলা ৮টার মধ্যেই বেচাকেনা শেষ হয়ে হিসাব-নিকাষে বসে যান আড়তদাররা। এ সময়ের মধ্যে পাইকারি দরে মাছ কিনে খুচরা বিক্রেতারা নিজের দোকানের পথ ধরেন।