Published : 18 Jun 2026, 09:32 PM
গাস্তঁ দোরেন একজন ভাষাতাত্ত্বিক, সাংবাদিক এবং বহুভাষাবিদ। তিনি ওলন্দাজ, লিম্বার্গিশ, ইংরেজি, জর্মন, ফরাসি, এবং হিস্পানিতে কথা বলতে পারেন, পড়তে পারেন আফ্রিকানস, ফ্রিসীয়, পর্তুগীজ, ইতালীয়, কাতালান, ডেনিশ, নরওয়েজীয়, সুইডিশ এবং লুক্সেমবুর্গিশ| ওলন্দাজ ভাষায় তিনি দুটো গ্রন্থ রচনা করেছেন। অভিবাসীদের ভাষা নিয়ে রচিত Nieuwe tongen (New Tongues), এবং Taaltoerisme (Language Tourism) যে-বইয়ের ওপর ভিত্তি ক’রে ইংরেজিতে রচিত হয়েছে Lingo: A Language Spotter’s Guide to Europe (বক্ষ্যমাণ রচনাটি এই ইংরেজি বইয়েরই একটি অধ্যায়ের তরজমা), এবং তৈরি হয়েছে Language Lover’s Guide to Europe নামের একটি অ্যাপ। লেখার অবসরে গাস্তঁ দোরেন গান গাইতে পছন্দ করেন, এবং অবশ্যই তা বহু ভাষায়। নেদারল্যান্ডের আমার্সফুর্ট-এ তিনি সস্ত্রীক বাস করেন।
মূল: গাস্তঁ দোরেন
অনুবাদ: জি এইচ হাবীব
এই তো মাত্র দুই শতাব্দী আগের কথা -- গ্রেট ব্রিটেনের চাইতে আকারে বারো গুণ বড় একটি এলাকায় চার চারটি মহাদেশে প্রচলিত ছিল ডেনিশ ভাষা। আর এখন, সেটা স্কটল্যান্ডের অর্ধেকের চেয়ে সামান্য বড় আকারের একটি মাত্র দেশে সীমাবদ্ধ। এই ধ্বংসের কাহিনী জানতে চাইলে পড়তে থাকুন।
পতনটা শুরু হয় ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে, যখন নেপোলিয়নীয় যুদ্ধে পরাজিত ডেনমার্ক নিজ ভূখণ্ডের একটি অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। গোটা নরওয়ে—যা কিনা মূল ডেনমার্কের চেয়ে বেশ কয়েক গুণ বড়—হঠাৎ করেই স্বাধীনতা লাভ করে (যদিও হঠাৎ বলে কিছু নাই), তবে গোড়ার দিকে দেশটি ছিল সুইডিশ রাজার শাসনাধীন। বহু শতাব্দী ধরে সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে ডেনিশ ভাষা নরওয়েজীয় ভাষার উপর, বিশেষ ক’রে শহুরে অভিজাতদের ব্যবহৃত ভাষার ওপর, একটি শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল। নরওয়েজীয় জাতীয়তাবাদীদের উদ্দেশ্য ছিল দুটি: সুইডিশ রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করা, আর ডেনিশ ভাষাকে নিকেশ করা। কাজটাতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেলেও, শেষ অব্দি তারা দুটো কাজই করে উঠতে সক্ষম হয়ে।
দূরবর্তী অঞ্চলেও ডেনিশ ভাষার প্রভাব কমছিল। ১৮৩৯ সালে, ডেনিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের (হ্যাঁ, এর অস্তিত্ব ছিল) স্কুলছাত্রদের আর ডেনিশ ভাষায় পড়ানো হতো না, বরং ইংরেজিতে পড়ানো হতো। ১৮৪৫ সালে, ডেনীয়রা তাদের ভারতীয় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো যুক্তরাজ্যের কাছে বিক্রি করে দেয় এবং ১৮৫০ সালে তাদের পশ্চিম আফ্রিকার উপনিবেশগুলোর বেলাতেও একই পথ অনুসরণ করে। তারপর, ১৯১৭ সালে ডেনিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজও বিক্রি করে দেয়া হয়, এবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। তার ফলে, ডেনমার্ক আর একটি ক্রান্তীয় দেশ রইল না। অবশ্য, এই উপনিবেশগুলোতে খুব কম মানুষই ডেনিশ ভাষায় কথা বলত। কিন্তু ১৮৬৪ সালে স্বয়ং মাতৃভূমিটিও একটি বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়: যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে, স্লেসভিগ অঞ্চলটি প্রুশিয়াকে দেওয়া হয় এবং সেটার নাম বদলে শ্লেসভিগ রাখা হয়। আজ অব্দি, জার্মানির শ্লেসভিগ-হোলস্টাইন প্রদেশে দশ হাজারের বেশি ডেনিশ-ভাষী সংখ্যালঘু বাস করে।
এরপর, ১৯১৮ সালে ডেনীয়দের মনোবলে আরেকটি আঘাত লাগে: পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় ডেনীয় শাসনের অধীনে থাকার পর আইসল্যান্ড স্বাধীনতা লাভ করে। অবশ্য একথা ঠিক যে, ডেনীয় ভাষা কখনোই একটি প্রশাসনিক ভাষার অতিরিক্ত কিছু ছিল না, কিন্তু সেই মর্যাদাও এবার খোয়া গেল। এর কিছুদিন পর, আইসল্যান্ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি ভাষার পদ থেকেও ডেনীয়কে নামিয়ে দেয়। তারপর থেকে আইসল্যান্ডের তরুণ-তরুণীরা স্কুলে ডেনিশের পরিবর্তে ইংরেজির ওপর জোর দিতে শুরু করে।
স্কটল্যান্ডের উত্তরে অবস্থিত ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ ১৯৪৮ সালে ডেনিশ রাজত্বের অধীনে স্বায়ত্তশাসন লাভ করে এবং তার পরপরই তাদের স্থানীয় ফ্যারোয়িজ ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। এই ধাক্কা সামাল দিতে, ডেনিশ ভাষা সেটার প্রশাসনিক মর্যাদা ধরে রেখেছিল, কিন্তু কার্যত সেটা কেবল মাতৃভূমির সাথে দাপ্তরিক যোগাযোগের কাজেই ব্যবহার করা হতো।
আর তাই ডেনমার্কের উপনিবেশগুলোর মধ্যে শুধু সবচেয়ে যেটা বড় এবং সবচেয়ে কম জনবহুল সেটাই বাকি রইল: গ্রীনল্যান্ড। তবে তা ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত, যখন দ্বীপটিকে সীমিত স্বায়ত্তশাসন এবং তার নিজস্ব ভাষা কালাআলিসুত, যা গ্রীনল্যান্ডিক নামেও পরিচিত, তাতে শাসন করার অনুমতি দেওয়া হয় সিদ্ধান্তটি যে খুব অবাক-করা ছিল তা নয়। যদিও বিদ্যালয়ে ডেনিশ একটি বাধ্যতামূলক বিষয় ছিল, তারপরেও গ্রীনল্যান্ডবাসী এ ভাষায় কথা বলতে রীতিমতো হিমশিম খেত, কারণ সেটা ছিল তাদের নিজেদের ভাষা থেকে পুরোপুরি আলাদা। স্বায়ত্তশাসিত গ্রীনল্যান্ডে, ডেনিশ ভাষা গোড়াতে স্বায়ত্তশাসিত ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের চেয়ে বেশি দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হত। কিন্তু তারপর সেই পরিস্থিতিও বদলে যায়: ২০০৯ সালে, কালাআলিসুত একমাত্র দাপ্তরিক প্রশাসনিক ভাষা হয়ে ওঠে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে গ্রীনল্যান্ড এক অনন্য অবস্থান অর্জন করে: কানাডা থেকে শুরু করে একেবারে চিলি পর্যন্ত এটি আমেরিকার একমাত্র দেশ (হ্যাঁ, গ্রীনল্যান্ড আমেরিকারই একটি অংশ), যেখানে আদিবাসী ভাষা তার ঔপনিবেশিক প্রভুর ভাষার তুলনায় গৌণ বা হীন নয়।
ডেনীয়দের কপালটাই মন্দ বলতে হবে। প্রথমে তারা নরওয়েজীয়দের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হলো, তারপর উষ্ণ-জলের উপনিবেশগুলিতে হলো বিশ্বাসঘাতকতার শিকার, স্লেসভিগে হলো পরাজিত, আর তারপর, বিতাড়িত হলো শীতল-জলের উপনিবেশগুলি থেকেও। কিন্তু ডেনীয়দের একটি সান্ত্বনা আছে: তাদের পূর্বপুরুষরা ছিল সেইসব মানুষের মধ্যে কেউ কেউ যারা পঞ্চম শতাব্দীতে ইংল্যান্ড দখল করেছিল, আর এভাবেই ইংরেজি ভাষার ভিত্তি স্থাপন করেছিল –যে ইংরেজি এমন একটি ভাষা যা অন্য কোনো ভাষার মতো নয়, এবং সারা বিশ্বকে জয় করেছে।