Published : 18 Jun 2026, 09:38 PM
বাজেটে আঞ্চলিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে বগুড়ায় বেশি দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে জাতীয় সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেছেন, আগে শোনা যেত সবার আগে গোপালগঞ্জ, এখন কি বলা হবে সবার আগে বগুড়া?
বৃহস্পতিবার সংসদের বাজেট অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আঞ্চলিক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এনসিপির এই সদস্য বলেন, “নিন্দুকেরা বলে, নতুন একটা উপজেলার আবির্ভাব ঘটেছে—এটাকে নবাবী উপজেলা বলা হচ্ছে। আমি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কথা বলছি। যেখানে অন্যান্য এলাকা বাজেট পায় না, সেখানে এক উপজেলায় ৭৬ কোটি টাকা চলে যায়।”
আতিক মোজাহিদ বলেন, “আগে শুনতাম সবার আগে গোপালগঞ্জ। এখন কি আমরা বলব সবার আগে বগুড়া?
“আমরা এই বাংলাদেশ চাই না। সবার আগে বাংলাদেশ হলে প্রতিটা প্রান্তের মানুষের জন্য সমান ধরনের বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে।”
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনায় প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি, আঞ্চলিক বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ, শিক্ষা খাতের অনিয়ম এবং বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন আরো কয়েকজন সংসদ সদস্য।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের এমপি আতিক মোজাহিদ দাবি করেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিরক্ষা খাতে উন্নয়ন ব্যয়ের বরাদ্দ যথেষ্ট নয়।
প্রতিরক্ষা খাতে ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক এনসিপির এই সদস্য বলেন, “এর মধ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকাই পরিচালনা ব্যয়; বাকি ৭ হাজার কোটি টাকা দিয়ে আধুনিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা কঠিন।”
তিনি বলেন, “এই আজাদী ভূমিকে রক্ষার জন্য যদি এক বেলা না খেয়েও থাকতে হয়, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রতিরক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ দিতে হবে।”

‘স্বপ্নবিলাসী, উচ্চাভিলাষী বাজেট’
বাজেটের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এবারের বাজেট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘দেড় দশকের রাষ্ট্রচিন্তার’ বাস্তব প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “অনেকেই বলার চেষ্টা করেছেন এটা স্বপ্নবিলাসী বাজেট, উচ্চাভিলাষী বাজেট। ‘ইয়েস’ মাননীয় স্পিকার, এটা স্বপ্নবিলাসী এবং উচ্চাভিলাষী বাজেট। যে মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারে না, সে বাংলাদেশের সামনের দিকে এগোতে পারবে না।”
আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকার; এবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট এসেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “এবারের বাজেট গরিব রক্ষা করার বাজেট, মধ্যবিত্তের বাজেট, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাজেট, ব্যবসাবান্ধব বাজেট এবং কর্মসংস্থানের বাজেট।”
বাজেটে কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বাড়তি বরাদ্দের কথা তুলে ধরে ঝিনাইদহ-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই সদস্য বলেন, সরকারের পরিকল্পনায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন এবং ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি রয়েছে, যা কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে।
মদ ও তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, “এই বাজেটে নেই, যারা মদ খায় তাদের জন্য কম পয়সায় মদ খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। যারা সিগারেট বা নিকোটিন খায়, তাদের কম পয়সায় সিগারেট বা নিকোটিন খাওয়ার পথও রুদ্ধ করা হয়েছে।”
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “শেয়ার মালিকানা ও পুনর্বহালের বিষয় আদালতের এখতিয়ারভুক্ত; রাজনৈতিক বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত।”
শিক্ষা খাতে অনিয়মের অভিযোগ
কুমিল্লা-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. সেলিম ভূঁইয়া শিক্ষা খাতে বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তিনি বলেন, অতীতে প্রশিক্ষণের নামে অপচয় হয়েছে; শিক্ষক না পাঠিয়ে অন্যদের বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এনসিটিবি, এনটিআরসিএ ও শিক্ষা অধিদপ্তরের অনিয়ম দূর না করলে বড় বরাদ্দ দিয়েও ফল মিলবে না।
নন-এমপিও শিক্ষক ও এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দাবিও জানান তিনি।

কালুরঘাট সেতুতে বরাদ্দের প্রশংসা
চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ কালুরঘাট সেতুর জন্য ৬৯৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও সিডিএর জন্য বরাদ্দ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে কর্ডলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গতি আসবে।
‘দুর্নীতি রোধ না করলে বাজেট বাস্তবায়ন হবে না’
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু তালিব বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ।
তিনি বলেন, অতীতে বড় বাজেটের ভেতর থেকে ‘হরিলুট’ হয়েছে, বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে। দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলে নতুন বাজেটও মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না।
পার্বত্য অঞ্চলের কর সুবিধা বহালের দাবি
রাঙ্গামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কর অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের বড় অংশ এখনো পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, রাস্তা ও কৃষি সুবিধায় পিছিয়ে। এই বাস্তবতায় কর সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে তা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
‘রাজস্ব লক্ষ্য অবাস্তব’
যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আজিজুর রহমান ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, “ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি মন্থর, নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়া এত রাজস্ব আদায় কীভাবে সম্ভব, তা স্পষ্ট নয়।”
ব্যক্তিশ্রেণির সর্বনিম্ন করহার বাড়ানো, কৃষি ও জ্বালানি ভর্তুকি কমানো এবং আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়েও আপত্তি জানান তিনি।