Published : 01 May 2026, 12:55 AM
ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে গেল ২৪ এপ্রিল একটি ভবনে কাজ করার সময় ছিঁড়ে পড়া কপিকলের আঘাত নিহত হন মো. রনি।
২৮ বছর বয়সী এই নির্মাণ শ্রমিকের চার বছর ও সাত বছরের দুটি সন্তান রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন ঢালাই মেশিনের এই অপারেটর।
মৃত্যুর পর রনির পরিবারকে কিছু টাকা দিয়ে মালিকপক্ষ বিষয়টি মিটমাট করে ফেলে বলে ভাষ্য তার সহকর্মী আব্দুর রহমানের।
ঢাকায় নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে হতাহতের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। মৃত্যু হলে একটু আলোচনা হয়, থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু আহত হলে নিজের দুর্ভাগ্যকে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না নির্মাণ শ্রমিকদের।
যেখানে কাজ করেন, সেখানে নির্মাণ শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থাও নাজুক। এই পরিবেশে থাকায় তাদের কর্মক্ষমতা কমে যায় বলে মনে করছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা।
বেসরকারি সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটসের হিসাবে, ২০২৫ সালে কর্মক্ষেত্রে ৭১৩টি দুর্ঘটনায় ৮০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২০ জন নির্মাণ শ্রমিক। আর মোট নিহতের মধ্যে ৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন ওপর থেকে পড়ে।
সংস্থাটির তথ্য মতে, নির্মাণ শ্রমিকরা কর্মস্থলে আহত হলে ক্ষতিপূরণ দাবির কোনো আইনি ভিত্তি এখনো বাংলাদেশে নেই।
অবকাঠামোর দিক থেকে দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা মোহাম্মদপুরের বছিলায় কয়েক বছর ধরে ‘সাইট ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে কাজ করেন মুজাহিদুল ইসলাম।
তিনি বলছেন, নির্মাণকাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব পর্যায়েই শ্রমিকদের বাইরে ঝুলে কাজ করতে হয়। রড মিস্ত্রী, রাজ মিস্ত্রী ও রং মিস্ত্রীদের ঝুলে কাজ করতে হয় সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ও এসির মিস্ত্রীদেরও ঝুলে কাজ করতে হয়। কিন্তু একমাত্র রং মিস্ত্রীরা ছাড়া ঝুলে কাজ করার জন্য আর কেউ বাড়তি মজুরি পান না।


এখনকার বাজারে একজন রডমিস্ত্রীর প্রতিদিনের মজুরি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, রাজমিস্ত্রীর মজুরিও একইরকম। আর রংমিস্ত্রীর দৈনিক মজুরি এক হাজার টাকা, বাইরে ঝুলে কাজ করলে তারা ২০০ টাকা বাড়তি পান।
মুজাহিদুল বলছেন, ভবনের অবকাঠামো দাঁড় করানোর সময় রডের কাজটা করতে হয়। ছাদের ওপরে যখন পিলারের জন্য রড বাঁধা হয়, তখন ঝুঁকিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে একেবারে কিনারের পিলারে ঢালাইয়ের জন্য কাটের কাঠামো তৈরি বা রডের খাঁচিটা বাঁধতে তাদের সেই রডের ওপরে উঠতে হয়। কাজের সময় আমরা বলি বেল্ট পড়তে, যাতে অন্তত পড়ে গেলেও ক্ষতি কম হয়। কিন্তু মিস্ত্রীরা বাঁধতে চায় না।”
আবার ভবনের বাইরের অংশে প্লাস্টারের সময় মাচায় ঝুলে কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। এক্ষেত্রেও বেশির ভাগ শ্রমিক নিরাপত্তা উপকরণ ব্যবহার করেন না।
আবার রঙের সময় সার্কাসের দড়াবাজির মতো দুটি রশিতে বাঁধা একটি বাঁশের লাঠির ওপর উঠে দেওয়ালে রঙের কাজ করতে হয় তাদের। তখনও বেশিরভাগ মিস্ত্রী সেইফটি সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করেন না।
প্রায় এক দশক রংমিস্ত্রীর কাজ করার পর এখন রঙের ঠিকাদারী করেন মো. রুবেল।
তিনি বলেছেন, “সবাই ঝুলে কাজ করতে পারে না; কারো কারো মাথা ঘুরায়। সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীরাই ঝুলে কাজটা করে বেশি। ঝুলে কাজ করলে দুইটা পয়সা বেশি পায়, এটাও একটা কারণ।”
বেল্ট কেন বাঁধতে চায় না জানতে চাইলে রুবেল বলেন, “বেল্ট বাঁধলে উপড়ে নড়াচড়া করতে সমস্যা হয়। রঙের বালতি নাড়ানোর জন্য তখন আরেকজনকে ডাকতে হয়। বেল্ট খুলে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরাতে হয়। তাছাড়া ওঠা-নামা করতে সমস্যা হয়। যার কারণে বেল্ট-হেলমেট দিলেও মিস্ত্রীরা পড়তে চায় না।”
রুবেল বলছিলেন, “আমাদের যখন বয়স কম ছিল, তখন আমরা কোনো কিছুরেই পাত্তা দিই নাই। একেবারে তড়তড় করে রশির মই বায়া উইঠা পড়ছিলাম। ছয় তলা পর্যন্ত তো কখনো বেল্ট বান্ধার কথা ভাবিও নাই। পইড়াও গেছি, কিন্তু আল্লায় বাঁচাইছে।”
তবে নির্মাণ ঠিকাদার মো. এমদাদুল বলছেন, “ব্যক্তি মালিকানার ভবনগুলোতে নিরাপত্তার এরকম ঢিলেমি দেখতে পাবেন। তবে বেশির ভাগ ডেভেলপার কোম্পানি থেকেই আগে লেবারদের সেফটি গিয়ারগুলো দেওয়া হয়। উল্টো আমাদের লেবাররা বাদ সাধে। তবে চাইনিজ বা যে কোনো বিদেশি কোম্পানিতে কাজ শুরুর আগেই হেলমেট, বেল্ট ও বুট পরতে হয়। “এগুলো না পরলে আপনাকে সাইটেই ঢুকতে দেবে না। অথচ একই শ্রমিক আমাদের এখানেও কাজ করে, তখন কিছু মানতে চায় না।”
ওপর থেকে পড়ার পাশাপাশি পিছলে পড়ে যাওয়া, পেরেক বা অন্য বস্তুর আঘাতে কেটে যাওয়া, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনাও নির্মাণ সাইটগুলোতে ঘটে।

‘পোকামাকড়ের সঙ্গে’ বসবাস
নির্মাণ শ্রমিকরা বলছেন, শুধু ঝুঁকি নয়, কাজের সময় তাদের আবাসনের ব্যবস্থাটাও নাজুক থাকে। কাজের পুরোটা সময় তাদের থাকতে হয় নির্মাণ সাইটে তৈরি অস্থায়ী ছাউনিতে।
তাদের ভাষ্য, সেখানে অনেক শ্রমিক গরম কিংবা শীতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। মশা, পোকামাকড়ের উপদ্রব আর বৃষ্টিতে ভেজাও সইতে হয় তাদের।
বছিলা এলাকায় একটি দলের সঙ্গে পাইলিংয়ের কাজ করেন মো. আলতাফ।
তিনি বলেন, ভবন তৈরির সময় পাইলিংয়ের কাজটা শুরু হয় সবার আগে। পুরো এলাকাটা তখন কাদা কাদা হয়ে থাকে।
“এর মধ্যেই আমাদের থাকার জন্য হয়তো একটা টিনের ঘর বানায়া দেয় মালিক পক্ষ। সেই ঘরের ভেতরে কোনরকমে সিমেন্টের বস্তা বিছায়া সবাই থাকি। শীতে তো প্রচণ্ড কষ্ট। আর আছে মশা। খোড়াখুঁড়ির সময় পোকামাকড়, সাপ-বিছাও উঠে আসে। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর একটু আরাম করে ঘুমানোরও ব্যবস্থা থাকে না। আর বৃষ্টির দিনে টিনের চালা দিয়ে পানি পড়বেই।”
রাজমিস্ত্রীর হেলপার হিসেবে কর্মরত শাহীন বলছেন, “আমরা সবার বিল্ডিং বানাই, কিন্তু আমরা থাকি সবচেয়ে কষ্ট করে।”
গেল শীত শাহীন কাটিয়েছেন একটি ভবনের দোতলার ছাদে তৈরি করে দেওয়া অস্থায়ী টিনের ঘরে। সেখানে চারদিকে কোন দেওয়াল ছিল না।
শাহীন বলেন, “ভাই নদী থাইকা হুহু কইরা বাতাস আসতো। সেই কী জার। সিমেন্টের বস্তা দিয়া আগুন জ্বালাই, তাও হয় না।”

প্রতিকার কী
বেসরকারি সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটসের নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা (সুমন) বলেন, “দেশে শ্রমিকেরা যেভাবে কাজ শুরু ও দক্ষতা অর্জন করেন, সেখানে একটা বড় গলদ আছে। এই শ্রমিকরা কোনো রকম আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পান না। তারা কাজ শেখা শুরু করেন একজনের সাহায্যকারী বা হেলপার হিসেবে। তাদের কাজ শেখার এই প্রক্রিয়ায় নিরাপদ কর্মক্ষেত্র বা নিরাপত্তা উপকরণ ব্যবহারের কোনো ধারণা তারা পান না। তারা যার কাছ থেকে কাজ শেখেন, তাদেরও নিরাপত্তা নিয়ে ধারণা থাকে না।
“ফলে নিরাপদ পদ্ধতিতে কাজ করার যে প্রক্রিয়া, সেটা এখানে অনুসরণ করা হয় না। আবার এরাই বড় কন্ট্রাকটরের অধীনে কাজে গেলে তাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে বাধ্য করা হয়। আবার যারা মধ্যপ্রাচ্য বা বিভিন্ন দেশে কাজ করে দেশে আসেন, তারাও এসব সরঞ্জাম ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে আসেন। এ কারণে তারা দেশে ফিরেও বড় প্রকল্পে কাজ পান সহজে।”
কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মৃত্যু হলেই কেবল একটু ‘হইচই’ হয়, এর বাইরে অনেক শ্রমিক আহত হন মন্তব্য করে সেকেন্দার আলী বলছেন, “আহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। যেটাকে কেউ পাত্তাই দেয় না। পত্রিকায় কেবল সেই রিপোর্টটা আসে, যেখানে শ্রমিকদের প্রাণহাণির ঘটনা ঘটে।
“কারখানায় দুর্ঘটনার বিষয়টা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শককে জানানোর বিধান আছে। কিন্তু নির্মাণ খাতের ‘কোড এনফোর্সমেন্ট অথরিটি’ এখনো গঠন হয়নি। ফলে শ্রমিকদের নিজেদের অভিযোগ জানানোর জায়গা নেই। এতে তথ্যগুলো গোপনই থেকে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “কোনো শ্রমিক কর্মস্থলে আহত হয়ে তিন দিনের বেশি কাজ করতে না পারলে তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান আছে। সেটাও আহতরা পান না।”
এমনকি ‘বিল্ডিং কোডে’ নির্মানাধীন ভবনে শ্রমিকদের অস্থায়ী আবাস কী রকম হবে, স্যানিটেশন, খাবারের ব্যবস্থা কীরকম হবে, সব বলা আছে।
কিন্তু আমাদের কোনো কোম্পানি বা ভবন মালিক তা অনুসরণ করেন না জানিয়ে সেকেন্দার আলী বলেন, “যার কারণে এই খাতের শ্রমিকরা ঘন ঘন অসুস্থ হন, খুব দ্রুত বুড়িয়ে যান। জীবনের মাঝপথেই তারা আর ভারী কাজ করতে পারেন না। কিন্তু এসব বিষয় কোথাও সেভাবে আলোচিত হয় না।”