Published : 30 Oct 2024, 01:57 AM
গত ১৯ জুলাই রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রায় ৪১ দিন পর ২৮ অগাস্ট মারা যান মো. শোহান শাহ। রামপুরার একটি পোশাক কারখানায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
তার বাবা শ্রীপুর উপজেলার চণ্ডীখালী গ্রামের কৃষক শাহ সেকেন্দার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এমন গুলি করা পুলিশ আর দেখতে চাই না। সত্যিকারের জনগণের বন্ধু হিসেবেই দেখতে চাই।”
সরকারি চাকরিতে কোটা থাকবে কি না, সেই প্রশ্নে আন্দোলনটি তেঁতে উঠে সরকার পতনের এক দফায় চলে যাওয়ার পেছনে যেসব কারণের কথা উঠে আসছে, তার মধ্যে একটি নিঃসন্দেহে পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে রাবার বুলেট ছোড়ার মত পরিস্থিতিও ছিল না, এ কথা এক বাক্যে বলছেন সবাই। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার লুটিয়ে পড়া এবং পরে মৃত্যুর ঘটনাটিই লাখো মানুষকে রাজপথে নামিয়ে আনে।
এই আন্দোলনে সরকারি হিসাবে ৮৬৩ জনের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছে। আর সরকার পতনের পর অন্যান্য অনেক বিষয়ের পাশাপাশি এখন পুলিশেও উঠেছে সংস্কারের আলোচনা।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় এই বাহিনীটির অবদান অস্বীকার করার জো নেই। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও কমতি নেই।
অপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক, সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হওয়া, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, বেআইনি আটক, নির্যাতনের ঘটনা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে।
সংস্কারের উদ্যোগও নতুন নয়, ২০০৭ সালে নেওয়া উদ্যোগ মাঝপথে থেমে যায়, এবার আবার উঠছে সেই আলোচনা।
সংস্কার করে কেমন পুলিশ চাই- এই প্রশ্নে নাগরিকদের যেমন নানা চাওয়া আছে, তেমনি পুলিশ বাহিনীর ভেতরেও আছে অনেক অভিযোগ ও আক্ষেপ। আসলে পুলিশের নিম্ন স্তরের কর্মীদের সুযোগ সুবিধা অপ্রতুল, যা তাদেরকে অনৈতিক পথে যেতে বাধ্য করে অনেক ক্ষেত্রে। ঊর্ধ্বতনদের জন্য ছড়ানো ‘প্রলোভনের জাল’, যা উপেক্ষা করা কঠিন।
‘সরকারের পুলিশ’ থেকে বেরিয়ে ‘জনগণের পুলিশ’ হতে আইন থেকে শুরু করে নিয়োগ, পদোন্নতি আর বদলি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের কথা বলাবলি হচ্ছে।
গঠন হয়েছে ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’, যার প্রধান করা হয়েছে সাবেক সচিব সফর রাজ হোসেনকে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার নাইম আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০০৭ সালে সংস্কারের জন্য একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেটি নিয়ে পরে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন কমিশনের মূল কাজ হবে জনগণের প্রত্যাশা কী, তারা কেমন পুলিশ চায়, কী ধরনের সেবা চায়- এর পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেওয়া।
“সমাজের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার যারা আছে তারা কী ধরনের সেবা চায়, সেটি না থাকলে হবে না। একইসঙ্গে যারা সেবা দেবে, সেই পুলিশ সদস্যরা কী চায় তাদের প্রত্যাশার বিষয়ে তথ্য নিয়ে আগাতে হবে।”
সাবেক পুলিশ প্রধান নুরুল হুদা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পুলিশের অনেক কিছুই সংস্কারের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রথমে পুলিশ অ্যাক্ট পরিবর্তন করা, পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসে সেগুলো নিরপেক্ষ স্বাধীন কমিশন দ্বারা তদন্ত করা এবং পুলিশের নিয়োগটাকে নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিকমুক্ত করা; এই তিনটা জিনিসে পরিবর্তন আনা জরুরি।”
কমিশন আসলে কী করতে চাইছে- তার জবাব দিয়েছেন এর চেয়ারম্যান সফর রাজ হোসেন নিজেই। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “১৮৬১ সালের সেই পুলিশ আইনসহ অনেক পুরোনো আইনের তো তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। পুলিশ আইন আধুনিকায়ন করা উচিত। আমরা সব অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি গণতান্ত্রিক দেশে কেমন পুলিশ হওয়া উচিত এবং পুলিশ যাতে জনবান্ধব হয় সেটা নিয়ে কাজ করব।”
একজন এসআই মনে করেন, এই কমিশন সব কিছু তুলে আনতে পারবে না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পুলিশের সেবা পেতে হলে আমাদের মাধ্যমে অর্থাৎ এসআইদের মাধ্যমেই পেতে হয়। সিনিয়র অফিসাররা সরাসরি মানুষ ডিল করেন না, তারা এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণাও রাখেন না। তাই কমিশনে অবশ্যই মাঠপর্যায় থেকে নির্বাচিত কাউকে রাখা উচিত ছিল।”
এই এসআইয়ের মতের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “প্রত্যেক স্তরের সদস্যকে না রাখলে তেমন সমস্যা নেই। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই কমিশন সকলের চাওয়াগুলো জেনে নিতে পারবে।”
‘চাঁদাবাজ পুলিশ চাই না’
পর্তুগালে থাকেন বাংলাদেশের তৌহিদ ভূঁইয়া। তিনি ভাবেন, বাংলাদেশের পুলিশ যদি সে দেশের বাহিনীর মত আচরণ করত, তাহলে কতই না ভালো হত।
পার্থক্যটা কোথায়- এই প্রশ্নে এই প্রবাসী বলেন, “যে কোনো প্রয়োজনে জরুরি সহায়তার জন্য কল করলে মুহূর্তেই পুলিশ হাজির হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখানে না আসলে পুলিশ যে আন্তরিকভাবে সেবা দিতে পারে এটা জানাই হত না।
“এখানে আইন সবার জন্য সমান। কে ভাঙল সেটা বিবেচ্য বিষয় না, কোন আইন ভাঙা হয়েছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ছোটখাট ট্রাফিক আইন ভাঙলেও মোটা অঙ্কের জরিমানার হয়। আর জরিমানা না দিলে ক্ষেত্রবিশেষে তার জন্য বিভিন্ন নাগরিক সেবা পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।”

পুলিশের কাছে কী প্রত্যাশা¬– এই প্রশ্নে বাংলাদেশের ইউনাইটেড পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এক সময় কী হইছে না হইছে, কোন পুলিশ কত টাকা নিছে এসব আমরা আর বলতে চাই না। পরিবর্তিত ব্যবস্থায় এখন কোনো পুলিশই চাঁদা চেয়েছে বলে আমার নজরে আসে নাই। আমরা এই ব্যবস্থাটাকেই স্থায়ী চাই।
“আমার গাড়ি ফিট থাকবে, সড়কে চলবে। আমরা পরিবহন ব্যবস্থাটাকে পুরোপুরি শৃঙ্খলায় আনতে চাই।”
ঢাকার ফুটপাত দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন নয়। প্রায়ই এসব উচ্ছেদে অভিযান চালালেও কদিন পর আবারও ফুটপাত দখল করতে দেখা যায়। পুলিশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ‘দিনপ্রতি চাঁদা’র বিনিময়ে ফুটপাতে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কোনো গোপন তথ্য ছিল না। কিন্তু যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তারাই যদি এতে জড়িত থাকেন, তাহলে যা হওয়ার তাই হয়ে আসছে।
ঢাকার মহাখালী এলাকায় ফুটপাতে চায়ের দোকানি আজিজুল হক ভূঁইয়া বলেন, “প্রত্যেক দিন ১০০ টাকা কইরা চান্দা দেওন লাগত। একেক সময় একেক লোক আইসা টাকা নিত। তারা কইত পুলিশরে দেওন লাগে, এলাকার নেতাগোরে দেওন লাগে। ব্যবসা করতে অইলে চান্দা দেওন ছাড়া উপায় নাই তাই দিছি। আমরা এমন চান্দা নেওয়া পুলিশ দেখতে চাই না।”
কেবল চাঁদাবাজি? ভুয়া মাদক মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়েরও শত শত সংবাদ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।
একটি খবরে প্রকাশ, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় খলিলুর রহমান নামে এক পথচারীকে ধরে পকেটে ইয়াবার পকেটে ঢুকিয়ে মামলা দেন তৎকালীন পল্লবী থানার এএসআই মাহবুবুল আলম।
ব্যাপক আলোচিত এ ঘটনার ভিডিও গণমাধ্যমে প্রচার হলে এএসআই মাহাবুবুলকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। এই কাজে মাহবুবুলকে তথ্যদাতা রুবেল ও সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
একই বছরের আরেকটি আলোচিত ঘটনা সিআইডির পরিদর্শক সালাউদ্দিন করিমের নেতৃত্বে মোহাম্মদপুরে এক ব্যবসায়ীর বাসায় ডাকাতি। সিআইডি কর্মকর্তার নেতৃত্বে ওই ডাকাত দলটি গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে বাসায় ঢুকে ডাকাতি করে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী শহীদুলের অভিযোগ ইসলাম অভিযোগ করেছিলেন, আগ্নেয়াস্ত্র ও ডিবির স্টিকার নিয়ে তল্লাশির কথা বলে বাসায় প্রবেশ করে। তারা সাড়ে ৬ লাখ টাকার মালামাল লুট করে।
টাকা-পয়সা ও মালামাল হাতিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি চক্রটি, এরপর শহিদুলের ভাগনে জাবেদকে অপহরণের পর হত্যার হুমকি দিয়েও অর্থ আদায় করে।
‘এই পরিবেশে কীভাবে সেবা আশা করেন?’
পুলিশ বাহিনীর ভেতরেও সমস্যার অন্ত নেই। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুবিধা-অসুবিধা, অভাব-অভিযোগের বিষয়টি যেভাবে আলোচনায় আসে, অধঃস্তনদেরগুলো আসে না। ফলে বছরের পর বছর এগুলো রয়ে যাচ্ছে।
পুলিশের অধস্তন কর্মীরা যে ভালো আছে, সেটি বলার সুযোগ নেই।

গোয়েন্দা বিভাগের এক এসআই নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, “বেশিরভাগ থানাতেই একজন এসআই যে বসে কাজ করবেন, সেই ব্যবস্থা নেই। তাই বাধ্য হয়ে নিজ উদ্যোগে চেয়ার-টেবিল কিনে কোথাও বসে প্রয়োজনীয় কাজ সারেন। বাইরের অপারেশনাল কাজের বাইরেও একজন তদন্ত কর্মকর্তার থানায় বসে অনেক কাজ করতে হয়, কিন্তু থানা থেকে সেই ব্যবস্থা নেই।”
এক কনস্টেবল বলেন, “ব্যরাকগুলোতে যেভাবে কনস্টেবলরা এক রুমে অনেকে মিলে থাকেন, সেখানে কোনো মানুষ থাকার উপযুক্ত না। লাইনগুলোতে কনস্টেবলদের ফ্যামিলিসহ থাকার জন্য একটা রুম দেওয়া হয়। এক রুমে স্ত্রী-সন্তানসহ পুরো পরিবার থাকা যায়? অনেকে বাধ্য হয়ে বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন।”
“থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, ডিউটির সুনির্দিষ্ট সময় নেই, তাহলে আপনি কীভাবে একজন পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে সেরা সেবা পাবেন?” পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন এই কনস্টেবল।
পুলিশে আরেক সমস্যা হল নির্ধারিত সাপ্তাহিক ছুটি না থাকা। একজন কনস্টেবল বলেন, “সপ্তাহে সাত দিন কাজ করিয়ে একটা মানুষ থেকে আপনি কীভাবে সর্বোচ্চ সেবা আশা করবেন?
“অস্বাস্থ্যকর ব্যারাকে রেখে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করিয়ে মানবিক সেবা প্রত্যাশা করা কখনোই সম্ভব নয়। আর থানায় সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নিলে জনবল কোনো সমস্যাই না।”
দৈনিক নির্ধারিত আট ঘণ্টার বেশি কাজ করালে ‘ওভারটাইম’ এর দাবি জানিয়ে একজন এসআই বলেন, “পুলিশ আইনে বলা আছে, যে কোনো সময় ডাকলে সাড়া দিতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুযায়ীও এটা করতে পারে না।”
একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সঠিক মূল্যায়নের পাশাপাশি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমার সঙ্গে কোনো সিনিয়র খারাপ আচরণ করে হতাশ করে ফেলছে। তার হাতে এসিআর, এ জন্য আমি তার অনেক অন্যায় সহ্য করে নিচ্ছি। আমার সেবার মান খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”
তদন্তের খরচ দিতে হয় ‘পকেট থেকে’
থানা পুলিশের বেশিরভাগ মামলার তদন্তের দায়িত্বেই থাকেন এসআই। মামলার জন্য বরাদ্দ করা টাকা পাওয়া যায় অভিযোগপত্র দেওয়ার পরে। কিন্তু এর আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ, আসামি গ্রেপ্তার, ফোর্সসহ বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা বাবদ গাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হয় তাদের পকেট থেকেই।
কিছু ক্ষেত্রে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটি পান না তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলার নথিসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রস্তুত, ভিসেরা নমুনা প্রেরণ ও রিপোর্ট সংগ্রহ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ এবং আদালতে আলামতসহ অভিযোগপত্র বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাঠানো, ভুক্তভোগীকে আদালতে বা হাসপাতালে আনা নেওয়ার খরচও করতে হয় তদন্ত কর্মকর্তাকেই।
এক এসআই বলেন, “ধরুন মাদকসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হল। সেই মাদকের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হবে, আবার গিয়ে প্রতিবেদন আনতে হবে, মাদকদ্রব্য ধ্বংসের জন্য পাঠাতে হবে। এর সবগুলো খরচই আমার পকেট থেকে দিতে হবে।
“আমাকে তদন্তের যে খরচটা দেওয়া হয় সেটা নির্ধারিত, কিন্তু কোন মামলার তদন্তে কত খরচ হবে তার ঠিক নেই। কোনো কোনো মামলার আসামি ধরতে ফোর্সসহ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করতে যেতে হয়। আবার সেই টাকাটা দেওয়া হবে তদন্ত শেষে, তাহলে আমার বেতন থেকেই আমাকে মামলা তদন্তের ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। সেটা কেন হবে? বেতন তো শুধু আমার।”
তিনি বলেন, “আগেই আমাকে তদন্তের টাকা দিয়ে দিতে পারে, সে অনুযায়ী আমি আমার খরচের বিল জমা দেব। অন্তত প্রতি মাসের খরচটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দিয়ে দিতে পারে। তাহলে মামলার তদন্তে আগ্রহ দেখাবে সবাই, তদন্তও দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে। এতে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার যে প্রবণতা পুলিশের সেটিও বন্ধ করা যাবে।”

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডাকাতি ও খুনের মামলায় তদন্তের জন্য ৬ হাজার টাকা, অপহরণ ও মানবপাচার মামলায় পান ৫ হাজার টাকা। দস্যুতা ও অপমৃত্যু মামলায় ৪ হাজার, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও মাদক দ্রব্য সংক্রান্ত মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা পান ২ হাজার টাকা করে।
অ্যাসিড সংক্রান্ত মামলা, দ্রুত বিচার আইনের মামলা, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য সংক্রান্ত মামলা ও মানি লন্ডারিং মামলা তদন্তে ৩ হাজার টাকা পান তদন্ত কর্মকর্তা।
এই টাকায় তদন্ত করা সম্ভব কিনা- সেই প্রশ্ন রেখে এই এসআই বলেন, “এসব প্রশ্নের মীমাংসা না করে পুলিশের সংস্কার, গণমুখী পুলিশ, এসব বিষয় আলোচনায় থাকবে, কখনও বাস্তব হবে না।”
নিয়োগ, পদায়ন আর পদোন্নতিতে অনেক সংকট
একজন এসআই বলেন, “পুলিশে নিয়োগ ৩-৪টা থেকে বেরিয়ে এক বা দুইটা পদে হওয়া জরুরি। হয় কনস্টেবল আর এএসপি অথবা কনস্টেবল আর এসআই পদে নিয়োগ দিতে হবে। তারাই পদোন্নতি পেয়ে উপরের দিকে যাবে। তাহলে বিসিএস ক্যাডারদের সঙ্গে পুলিশের অন্য সদস্যদের যে মানসিক দ্বন্দ্ব সেটি কিছুটা হলেও কমবে।”
একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, “ধরে নিলাম আপনার ১০ জন আইটি এক্সপার্ট, ১০ জন অপারেশনাল লোক আর ১০টা তদন্তে দক্ষ লোক দরকার। তাহলে সেভাবেই নিন। আপনি গণহারে নিয়োগ দিয়ে তারপর বলবেন ‘আমি তো এই জিনিস চাই নাই, ওই জিনিস চাইছিলাম’, এটা তো হবে না।”
পুলিশে নিয়োগের পরে আসে পদায়নের প্রশ্ন। বাহিনীতে অন্তত ১৮টি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা, জেলা পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজি ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের কিছু পদ এবং থানার ওসিকে ‘ভালো পদায়ন’ বিবেচনার প্রচলন রয়েছে।
এসব পদে যেতে বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতা’ দেখা যায়। অন্যদিকে এপিবিএন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, রেল পুলিশ, ট্রেনিং সেন্টারের মত কিছু ইউনিটের পদগুলোকে ‘ডাম্পিং পোস্ট’ বিবেচনা করে সবাই এড়িয়ে যেতে যায়।

পদায়নের কোনো মাপকাঠি না থাকায় যাকে যখন খুশি সেসব পদে দায়িত্ব দেওয়া যায়। এটাই বাহিনীর কর্মকর্তাদের ‘সরকারের কাছাকাছি’ থাকার প্রবণতা দেখা দেয় বলে অভিযোগ আছে। এমন কিছু পদায়ন ঘিরে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও বেশ পুরানো।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদের এক কর্মকর্তা বলেন, “পদায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চাই। চাইলেই যে কাউকে যে কোন পদে দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকে বের হয়ে যোগ্যতার বিচারে দায়িত্বে দিতে হবে। নির্ধারিত কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে সকল পদই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, “পোস্টিং একটা হয়রানির হাতিয়ার। এটি দেখিয়ে আমাকে সিনিয়রের অন্যায্য আদেশও মানতে বাধ্য করা হয়। এই জুজুর ভয় আর জুজুর লোভ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পোস্টিং কখনোই নিয়মিত প্রক্রিয়া নয়, এটির জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকতে হবে।”
এপিবিএন থেকে সদ্য ময়মনসিংহ জেলা পুলিশে বদলি হওয়া এক এসআই বলেন, “ধরুন আমার সিনিয়র আমার হাতে ৫ জনের নাম ধরিয়ে দিয়ে বলল ধরে নিয়ে আসতে। আমি যদি দ্বিমত করি তাহলে বলা মাত্রই আমাকে পোস্টিং দিয়ে দেবে। তাহলে আমি কেন এই দ্বিমত করতে যাব। আমার সমস্যা কী কী আছে, সমাধান করতে হলে আগে সেগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে।”
তদন্তের অভিজ্ঞতা আছে এমন অফিসারকে ‘বস’ হতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “একজন এসআই ১০-১৫ বছর মামলার তদন্ত করছে। বিসিএস দেওয়ার পর সরাসরি একটা নতুন ছেলেকে ওই এসআইয়ের উপরে বসিয়ে দেওয়া হয় বস হিসেবে। পুলিশের আরও যে ডিপার্টমেন্ট আছে সেখানে কাজ করিয়ে অভিজ্ঞতার পর তাকে তদন্ত কার্যক্রমে বস হিসেবে বসানো যেতে পারে।”
পদোন্নতিতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার তাগিদ দিয়ে পুলিশ সুপার পদের এক কর্মকর্তা বলেন, “বিসিএস দিয়ে আমি একবার নিয়োগ পেয়েছি। রাজনৈতিক বা গ্রুপিং বাদ দিলেও সেই পিএসসির নির্ধারিত মেধাক্রম আমার আজীবনের পদোন্নতির মাপকাঠি হতে পারে না। এটাই যদি আমার ভাগ্য নির্ধারিত হয় তাহলে আমি জানব যত চেষ্টাই করি আমি আগের জনকে টপকাতে পারব না। আবার আগের জন ভাববে যত চেষ্টাই করুক নিচের জন সামনে আসতে পারবে না। তাহলে আমি নতুন কিছু বা ভালো কিছু কেন করব?”
এই কর্মকর্তা পদোন্নতির আগে পরীক্ষার ব্যবস্থা করার পক্ষে। পরীক্ষার মেধাক্রম অনুযায়ী পদোন্নতি হলে বাইরের অন্য যে কোনো কিছুর প্রভাবমুক্ত থাকবে বলেই তার বিশ্বাস।
কমিশন কেমন করবে?
‘সংস্কার কমিশন ব্যর্থ হবে’ বলে মনে করেন মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক।
এই মূল্যায়নের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সচিব কোনোভাবেই এমন একটা কমিশনের প্রধান হতে পারেন না। এই কমিশনের মাধ্যমে পুলিশকে আমলা নির্ভর বা রাজনৈতিক নির্ভরই করা হবে। কারণ এই কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াটাই ত্রুটিপূর্ণ।
“এখানে কোনো গবেষকদের রাখা হয়নি। গবেষকদের বা মানবাধিকার কর্মীদের গুরুত্ব না দিয়ে গঠিত কমিশন কীভাবে জনগণের পুলিশ বানানোর সুপারিশ করবে?”
তার মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাইলে কমিশনের প্রধান হতে পারতেন সাবেক কোনো বিচারপতি অথবা সর্বজন গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তি।
“আমলা বা মন্ত্রী যদি কমিশনের প্রধান হয়, পুলিশ সরকারের আজ্ঞাবহ বাহিনী হিসেবেই থেকে যাবে। আর রাজনীতিমুক্ত ও আমলামুক্ত হলেই আমরা জনবান্ধব পুলিশ পাব। কাজেই যেভাবে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, গঠিত এই কমিশনের কাছে আমরা বেশি কিছু আশা করতে পারি না।”
সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান সফর রাজ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “এই কয়দিনে আমরা পুলিশের আইনি তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। আইনের অধ্যাপক আছেন, আমরা সবাই বসে একটা ওয়ার্ক প্ল্যান করব। পুলিশের মুখ্য উদ্দেশ্যই যেন হয় জনগণকে সেবা দেওয়া। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে পুলিশ কীভাবে কাজ করে সে ধারণাগুলো আমরা নেব। এরপর সংস্কারে সুপারিশ করব।”
আরও পড়ুন:
গাড়ি নেই, অস্ত্র লুট, পুলিশ এখন কী করবে?
পুলিশের বাইরে আলাদা তদন্ত সংস্থা কতটা বাস্তব সম্মত?
পুলিশি তদন্তে অসন্তুষ্ট হলে প্রতিকার কী?