Published : 30 Mar 2026, 01:36 AM
রাজধানীর পুরান ঢাকার বংশাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী তাইয়্যেবার মন ভালো নেই। কারণ ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে গেলেও তাকে আবারও পঞ্চম শ্রেণির পড়াগুলো পড়তে হচ্ছে, একইসঙ্গে চালাতে হচ্ছে ষষ্ঠ শ্রেণির পড়া।
এর কারণ, তার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে। এদিকে এপ্রিল ও মে মাসে ষষ্ঠ শ্রেণির শ্রেণি পরীক্ষাও তাকে দিতে হবে। জুনের শেষে বসতে হবে অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষায়। তাই দুই শ্রেণির পড়ার চাপে সে নাজেহাল।
গতবছর রাজধানীর পুরান ঢাকার সুরিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তাইয়্যেবা। সে বার্ষিক পরীক্ষা প্রথম স্থান অর্জন করেছিল বলে জানালেন তার মা মোসাম্মৎ শিল্পী আক্তার।
রোববার সকালে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মেয়েটার ওপর আসলে চাপ পড়ছে। একদিক ষষ্ঠ শ্রেণির পড়া, তার ওপর বৃত্তি পরীক্ষার পড়া। দুটো চালাতে ওর সঙ্গে আমিও নাজেহাল।”
এই অভিভাবক জানালেন, তার মেয়ে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিল গত ডিসেম্বরে। কিন্তু সে সময় পরীক্ষা হয়নি। এখন নতুন বছরের সাড়ে চার মাস পেরিয়ে তার আগের বছরের পড়ার ওপর পরীক্ষা দিতে হবে।
“এখন ছুটি শেষে ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাসটেস্ট শুরু হচ্ছে। জুনের শেষে অর্ধবার্ষিকী। সব মিলিয়ে নাজেহাল অবস্থা।”
তাইয়্যেবার বাবা মো. মনির হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ছয় মাস মেয়েটা অনেক কষ্ট করেছে। শেষ মেশ পরীক্ষা হয়নি। ভাগ্য ভালো আগের শ্রেণির বই-খাতাগুলো বস্তাবন্দি করে তুলে রেখেছিলাম, কাউকে দিয়ে দিইনি। এখন তাকে সেগুলো সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণির পড়া পড়তে হচ্ছে।
“আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, সেখানে সরকার পেছনে ফিরে যেতে চায়। গতবছরের বৃত্তি পরীক্ষাটা এখন না নিলে বাচ্চাটা চাপে পড়তে না। দুই শ্রেণির পড়া, পড়ার ধরণ তো আলাদা। সব মিলিয়ে বাচ্চার সঙ্গে আমাদেরও হিমশিম অবস্থা।”
শুধু তাইয়্যেবা নয়, একই অবস্থা চলতি শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠা লাখো শিক্ষার্থীর। কারণ আইনি জটিলতায় আটকে যাওয়া গতবছরের প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া চলতি শিক্ষাবর্ষের এপ্রিল মাসে নেওয়ার প্রক্রিয়া অনেকটা গুছিয়ে এনেছে সরকার। তাতে করে এ বছর ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে দুই বছরের পড়ার চাপে পড়েছে।
ফলে গতবছর পঞ্চম শেষে পূর্বনির্ধারিত সময়ে যে শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল, তাদের অনেকে এখন পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়েছে।
শিক্ষাবর্ষের এ সময়ে এসে আগের বছরের বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
শিক্ষাবিদরাও এভাবে পরীক্ষা আয়োজনে সরকারকে নিরুৎসাহিত করছেন। তাদের কেউ কেউ গতবছরের পরীক্ষা চলতি বছর নেওয়াকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলছেন। কেউ আবার এ পরীক্ষা নেওয়ায় প্রয়োজনীয়তাই দেখছেন না।

কেন এই জটিলতা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধ করে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু করে। সেই পাবলিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হত।
তবে করোনাভাইরাস মহামারীর জেরে ২০২০ সালে সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করা হয়।
তাহলে শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পাবে কীভাবে? সেই সমস্যার সমাধনে ২০২২ সালে ডিসেম্বরে ফের 'পরীক্ষামূলকভাবে' প্রাথমিকে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। ওই ফলাফলের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বৃত্তির জন্য নির্বাচিত ৮২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর তালিকা প্রকাশ করা হয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছর থেকে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই বছরের শেষে এ পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। তবে শুধু সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
এ অবস্থায় প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ওঠে। এ দাবি নিয়ে অভিভাবকরা আদালতের দারস্থ হলে গত বছরের বৃত্তি পরীক্ষা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দেয় আদালত।
ফলে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে এ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হলেও তখন আর পরীক্ষা হয়নি।
এরপর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ২৫ ফেব্রুয়ারি জুনিয়র, দাখিল ও এবতেদায়ী বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন গত বছরের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা এপ্রিলে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, এই বৃত্তি পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেনগুলোর শিক্ষার্থীরাও অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ পাবে এবং কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা পাবে ২০ শতাংশ।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শুধুমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। বেসরকারি (কিন্ডারগার্টেন) শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত না করায় বিষয়টি আদালতে গড়ায়। আদালতের নির্দেশনা ও সমঅধিকারের সাংবিধানিক নীতির আলোকে সরকার নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী এবারের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
প্রাথমিকের বৃত্তির জন্য মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করার কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, মেধাবৃত্তি বা ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাবে ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বেসরকারি প্রাথমিকের জন্য বরাদ্দ সাড়ে ৫ হাজার।
আর সাধারণ বৃত্তি পাবে মোট সাড়ে ৪৯ হাজার শিক্ষার্থী। সরকারি ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ ৪১ হাজার ২৫০টি বৃত্তি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড ভিত্তিক দেওয়া হবে। বেসরকারি ২০ শতাংশ, অর্থাৎ ৮ হাজার ২৫০টি বৃত্তি উপজেলা ভিত্তিক দেওয়া হবে।
প্রতি ইউনিয়নে ৫টি করে সাধারণ বৃত্তি দেওয়া হবে, যা পাবে দুইজন বালক ও তিনজন বালিকা। আর প্রতি ইউনিয়নে মেধাবৃত্তি পাবে একজন।
বর্তমানে মেধাবৃত্তি বা ট্যালেন্টপুলে এককালীন ২২৫ টাকা এবং মাসিক ৩০০ টাকা। আর সাধারণ বৃত্তি এককালীন ২২৫ টাকা এবং মাসিক হারও সমপরিমাণ।

অভিভাবকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া, মন্ত্রী বলছেন ‘অপশনাল’
রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী রাইসাও গত বছরের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। গতবছর একই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ছিল সে।
তার বাবা মো. রাসেলের মতে, গত বছরের বৃত্তি পরীক্ষা এবছর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ‘অয্যেক্তিক’, এটা শিক্ষার্থীদের চাপে ফেলেছে।
রাসেল রোববার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ বছর পরীক্ষা না নিলেও তেমন ক্ষতি হত না। কিন্তু ক্লাস সিক্সে উঠে ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া অযৌক্তিক।
“সরকারে উচিত ছিল বার্ষিক পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে বা চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির নম্বরের ভিত্তিতে বৃত্তি দিয়ে দেওয়া। না দিলো ক্ষতি কি? ২৪ সালে তো বৃত্তি পরীক্ষাও হয়নি, কাউকে বৃত্তিও দেওয়া হয়নি। তাতে তো পড়াশোনা থেমে থাকেনি।”
তিনি বলেন, “এ বছরের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা আগামী ডিসেম্বরে নিলেই হত। বার্ষিক আর বৃত্তি পরীক্ষার পড়াটা বাচ্চারা একসঙ্গে শেষ করতে পারত।”
এই সময়ে এসে বৃত্তি পরীক্ষার কারণে শিক্ষার্থীরা যে চাপে পড়ছে, সে বিষয়টি গত ১৬ মার্চ সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রীর নজরে আনেন সাংবাদিকরা। তারা আগের বছরের বৃত্তি পরীক্ষা পরের বছর আয়োজনের যৌক্তিকতা জানতে চান।
উত্তরে এহছানুল হক মিলন বলেন, “ইটস নট ম্যান্ডেটরি। যারা পারবে না, তারা আসবে না। ইটস অপশনাল। আপনি বৃত্তি দিতে চান দেন, না দিতে চাইলে নাই। যারা পারবে না তারা দিবে না। আমি প্রশ্ন উত্তর দেব না।”
তবে রাইসার বাবা রাসেল মন্ত্রীর এ যুক্তি মানতে নারাজ। তিনি বলেন, “মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভালো করেছে। কষ্ট করে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে, নির্বাচিতও হয়েছে। কিন্তু এখন অন্যরা পরীক্ষা দেবে, আর আমার মেয়ে দেবে না–সেটা তো ওর কাছে আরও খারাপ লাগতে পারে। তাই চাপ হলেও প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
একই কথা বললেন বংশাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির তাইয়্যেবার মা শিল্পী আক্তারও।
তিনি বলেন, “ক্লাস ফাইভে মেয়ে সুরিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফার্স্ট গার্ল ছিল। এখন অন্যরা বৃত্তি পরীক্ষা দেবে আর ও দেবে না? আমি বাচ্চাকে বলেছি, ‘মা বৃত্তি পেলে পাবা, না পেলে নাই। পরীক্ষাটা দাও।’ কষ্ট হলেও ও প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
‘বাসি’ বৃত্তি পরীক্ষায় অনিহা
ঢাকার কেরানিগঞ্জের ২১ নম্বর চারিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহিনুর আলআমিন বলছেন, তার অনেক শিক্ষার্থী এখন বৃত্তি পরীক্ষায় বসতে চাইছে না।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা গতবছরই ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীর নাম অনলাইনে অধিদপ্তরকে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন অনেকেই পরীক্ষায় অংশ নিতে চাচ্ছে না।
“আমার স্কুলে গত বছর পঞ্চম শ্রেণিতে ২০ জন শিক্ষার্থী ছিল, তাদের ৮ জনের নাম পাঠানো হয়েছিল বৃত্তি পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করে। কিন্তু তাদের মধ্যে ৪-৫ জন হয়ত পরীক্ষা দেবে। বাকিদের কেউ বলছে, ফাইভের বই দিয়ে দিয়েছে। কেউ বলছে চাপ নেবে না। তারা পরীক্ষা দিতে চাচ্ছে না।”
একই কথা বললেন রাজধানীর পুরান ঢাকার সুরিটোলা সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আনিসুর রহমান।
“আসলে অনেকে ফাইভের বই বিক্রি করে দিয়েছে। অনেকে ব্যস্ত সিক্সের পড়ায়। আমার স্কুলের যে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষার জন্য গতবছর নির্বাচিত হয়েছিল, তাদের ৩০ শতাংশ হয়ত পরীক্ষায় বসবে। বাকিরা বসতে চাচ্ছে না।”
সাইমুম রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। সে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হলেও পরীক্ষায় বসবে না।
স্কুলের নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার মা রওশন আরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সবাই বৃত্তি পায় না, তাই আমার ছেলে না পেলেও কোনো সমস্যা নেই। এতটুকু বাচ্চার জন্য দুই ক্লাসের পড়া অত্যাচার। বাসি বৃত্তি পরীক্ষার জন্য এ অত্যাচার সন্তানের সঙ্গে হতে দিতে পারি না।
“ও সিক্সের পড়াই পড়ুক। সুযোগ পেলে এইটে বৃত্তি দেবে, না পেলে নাই। বাচ্চা ভালো থাকুক এতটুকুই চাই। এত চাপ আমি তাকে দেব না, তাই মন্ত্রী মহোদয়ের কথা মেনে নিয়েছি, দেবে না সে পরীক্ষা। বৃত্তি পাওয়া, না পাওয়ায় কিছু যায় আসে না, সে ভালো মানুষ হোক সেটাই চাই।”

‘অপ্রয়োজনীয়’ বৃত্তি পরীক্ষা বাতিলের সুপারিশ করেছিল পরামর্শক কমিটি
অন্তবর্তী সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মনোন্নয়নে দুটি আলাদা পরামর্শক কমিটি গঠন করেছিল। দুই কমিটিতেই আহ্বায়ক ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পরার্শক কমিটি বৃত্তি পরীক্ষার মত পরীক্ষা বাতিলের সুপারিশ করেছিল, কারণ এ ধরনের পরীক্ষা সার্বিকভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখে না।
“আগে বৃত্তি পরীক্ষা হত। কিন্তু নানা অসুবিধা হয় বলে সবার জন্য জেএসসি ও পিইসিই পরীক্ষা নেওয়া শুরু হল। সেটাতেও অনেক সমস্যা বাচ্চাদের ওপর চাপ। এখন পেছনের দরজা দিয়ে পরীক্ষাটা ফিরিয়ে আনা হল।”
মনজুর আহমদ বলেন, “এগুলো না করে ক্লাসে ভালো করে পড়াশোনা করানো যায়। অধিকাংশ ছাত্রের দিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার।”
কেবল ‘ভালো ছাত্ররাই’ যে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “উচ্চবিত্ত অভিভাবকরা চান তাদের ছেলেমেয়ে এ পরীক্ষা দিক। সেটাকেই ‘অভিভাবকদের কথা’ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু বেশিরভাগ অভিভাবকতো গ্রামের, দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা, তারা কোনো কথাই বলতে পারেন না।
“আমরা শিক্ষাবিদরা মতামত দিয়েছিলাম বৃত্তি পরীক্ষা প্রয়োজন নেই। এটা যেহেতু এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর জোর দেয়, এ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।”
সবার জন্য পড়াশোনার মানোন্নয়ন করা যে কোনো সরকারের জন্যই ‘কঠিন কাজ’ মন্তব্য করে এ শিক্ষাবিদ বলেন, “সেই কঠিন কাজটা না করে সেখান থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে ‘ভালো কিছু করা হচ্ছে’ দেখানো হয়। বোঝানো হয় যে পরীক্ষা নিলে ‘শিক্ষার মানোন্নয়ন’ হবে।
“কর্মকর্তারাই মন্ত্রীদের এ ধরনের পরামর্শ দেন। সেটা আমরা শিক্ষা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিভিন্ন আলাপ আলোচনায় দেখেছি। হয়ত এগুলোর দরকার নাই, কিন্তু কর্মকর্তারাই বলেন, এটার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা হয়। কিন্তু এর মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন হয় না।”

‘অগ্রহণযোগ্য শিশু নির্যাতন’
শিশুদের ওপর দুই শ্রেণির পড়ার চাপ সৃষ্টি করে গত বছরের বৃত্তি পরীক্ষা চলতি বছরে নেওয়াকে ‘অগ্রহণযোগ্য শিশু নির্যাতন’ বলছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. আজম খান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অদ্ভুত একটা ব্যাপার! এখন ক্লাস সিক্সের বই তারা পড়ছে, আবার পুরান বই তাদের পড়তে হবে। এটা একটা বাচ্চার ওপর মানসিক চাপ। অ্যাজ আ টিচার, আই কান্ট সাপোর্ট দিস। এটা হতে পারে না।
“যেহেতু সরকার এতদিন পরীক্ষা নেয় নাই, এখন বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে তাদের ওপর যে নির্যাতনটা করা হচ্ছে, এটা কোনো বিবেচনার গ্রহণযোগ্য না।”
বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে বার্ষিক পরীক্ষা প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন অধ্যাপক আজম খান।
তিনি বলেন, “একটা ছেলে এক মণ বোঝা নিতে পারে না, সেখানে তাকে বলা হচ্ছে দুই মণ বোঝা নাও। এটা আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য
“বছরের এক চতুর্থাংশ শেষ, এখন গত বছরের পরীক্ষা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক না। এখন ওরা যদি আবার কোর্টে গিয়ে বলে তাদের অসুবিধা হয়েছে, সেটা আরও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।”

কবে কোন পরীক্ষা
আগামী ১৫ এপ্রিল দেশের ৬১ জেলায় প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। আর তিন পার্বত্য জেলা–বান্দরবান, খাগরাছড়ি ও রাঙামাটিতে এ পরীক্ষা শুরু হবে ১৭ এপ্রিল। ইতোমধ্যে পরীক্ষার সূচি প্রকাশ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
প্রথম দিন ১৫ এপ্রিল বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ৬১ জেলায় বাংলা বিষয়ের পরীক্ষা হবে।
এরপর ১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ইংরেজি, ১৭ এপ্রিল শুক্রবার প্রাথমিক গণিত এবং ১৮ এপ্রিল শনিবার বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা দিতে হবে।
প্রতিটি পরীক্ষা সকাল ১০টায় শুরু হয়ে আড়াই ঘণ্টা চলবে।
অন্যদিকে, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ১৭ এপ্রিল শুক্রবার প্রাথমিক গণিত পরীক্ষার মাধ্যমে বৃত্তি পরীক্ষা শুরু হবে।
১৮ এপ্রিল শনিবার হবে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান পরীক্ষা। এরপর ১৯ এপ্রিল রোববার বাংলা এবং ২০ এপ্রিল সোমবার ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষার মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলায় পরীক্ষা শেষ হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত ৩০ মিনিট বরাদ্দ থাকবে।