Published : 17 Nov 2025, 08:00 AM
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান দমাতে হতাহতের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ক্ষমা চাইতে রাজি হননি’, উল্টো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে পাল্টা অভিযোগ করেছেন তিনি।
সম্প্রতি ব্রিটিশ দৈনিক ইনডিপেনডেন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেছেন, ট্রাইব্যুনাল যদি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তাতে তিনি ‘বিস্মিত বা ভীত’ হবেন না। তার ভাষায়, “এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক প্রহসনের বিচার।”
২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট সময়ে আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট পাঁচ অভিযোগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
ইনডিপেনডেন্ট লিখেছে, শেখ হাসিনাকে যখন প্রশ্ন করা হল, জুলাই আন্দোলনে নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারের কাছে তিনি ক্ষমা চাইবেন কি না, তখন তিনি বলেন, “আমরা একটি জাতি হিসেবে যে সন্তান, ভাইবোন, আত্মীয় ও বন্ধুকে হারিয়েছি, তাদের প্রত্যেকের জন্য আমি শোক করি। আমার এই শোকপ্রকাশ অব্যাহত থাকবে।”
বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও শেখ হাসিনা অস্বীকার করেছেন। বরং বিক্ষোভের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ‘যুক্তিসঙ্গত’ ছিল বলে তিনি দাবি করেন।

জুলাই আন্দোলনকে ‘সহিংস বিদ্রোহ’ হিসেবে বর্ণনা করে শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো হত্যার দায় ‘স্বীকার করেন না’।
তার দাবি, মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে’ হতাহতের সংখ্যা বেড়েছিল।
“একজন নেতা হিসেবে আমি নেতৃত্বের দায় অবশ্যই স্বীকার করি, কিন্তু আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলাম–এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
১৫ বছরের বেশি সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকার পর অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ভারতে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ওই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলার রায় হতে যাচ্ছে সোমবার।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার শুনানিতে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনে শেখ হাসিনা ‘নিশ্চিত করেছেন’ যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছেন।
“তিনি (শেখ হাসিনা) ড্রোন ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্ত করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যারও নির্দেশ দিয়েছেন। হাসনুল হক ইনুকে তিনি নিশ্চিত করছেন যে নারায়ণগঞ্জে হেলিকপ্টার থেকে ছত্রীসেনা নামানো হবে এবং উপর থেকে ‘বম্বিং’ করা হবে, ‘প্যারাট্রুপার’ নামানো হবে।”
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও সে সময় আদালতে শোনানো হয়।
গত জুলাই মাসে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চব্বিশের ছাত্র আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালানোর অনুমোদন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই দিয়েছিলেন–এমন অভিযোগের সত্যতা তারা একটি অডিও টেপ যাচাই করে পেয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলনের মধ্যে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক উপপরিচালক বাবুরাম পান্ত এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, “বাড়তে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা বিক্ষোভ ও মতভিন্নতার প্রতি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ অসহিষ্ণুতার প্রমাণ।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার তুর্কও বলেছিলেন, “বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ ভয়ংকর ও অগ্রহণযোগ্য।”

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আহ্বানে গতবছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনের তদন্ত দল। গত ফেব্রুয়ারিতে তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যা ও নির্বিচার গুলির একাধিক বড় অভিযান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘নির্দেশ ও তদারকিতে’ হয়েছে।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী ‘পরিকল্পিতভাবে এবং অবৈধভাবে’ বিক্ষোভকারীদের হত্যা বা পঙ্গু করার সঙ্গে জড়িত ছিল, এর মধ্যে এমন ঘটনাও ছিল যেখানে একদম সামনে থেকে গুলি করা হয়েছিল।
বিভিন্ন ‘নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া’ মৃত্যুর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়, ১ জুলাই থেকে ১৫ অগাস্টের মধ্যে ১,৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে, যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র, সামরিক রাইফেল এবং শটগানের গুলিতে নিহত হন।
তবে নিহতের ওই সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বলেন, ১৪০০ সংখ্যাটি ‘অতিরঞ্জিত’।
আন্দোলন দমাতে সহিংসতার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর দায় চাপিয়ে তিনি বলেন, “মাঠের কর্মকর্তারা প্রচলিত নির্দেশিকা অনুসারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই নির্দেশিকায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।”
আর ৫ অগাস্ট দেশত্যাগের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে শেখ হাসিনা ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, “দেশে থাকলে শুধু আমার জীবন নয়, আমার আশপাশের মানুষদের জীবনও হুমকিতে পড়ত।”
সম্প্রতি ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে এই আন্দোলন দমনে নিজের ভূমিকা নিয়ে হাসিনা বলেন, “সহিংসতা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য অবশ্যই ভুল করেছেন।
“কিন্তু, যেটা বলা হচ্ছে যে আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিটি পদক্ষেপের নির্দেশ দিচ্ছিলাম—এটা আসলে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যপ্রণালী সম্পর্কে ভুল ধারণা। আবারও বলছি, কোনো অবস্থাতেই আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালানোর অনুমতি দিইনি।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আদালতে আসামিদের হাজির হওয়ার জন্য আইন অনুযায়ী পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়।
তবে, দ্য উইক ম্যাগাজিনে শেখ হাসিনার নামে ছাপানো একটি লেখায় বলা হয়, “একটি বিপন্ন প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক নোটিস ছাড়াই অভিযোগগুলো আনা হয়েছে। যে প্রসিকিউশন গোপনীয় তথ্য প্রদান করে হরহামেশা মিডিয়া ট্রায়ালে জড়িয়ে গেছে, যেটা আইনকানুন বিবেচনায় পক্ষপাতমূলক।”
সবশেষ বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, "আমি অস্বীকার করছি না যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, কিংবা অপ্রয়োজনে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালানোর কোনো নির্দেশ আমি কখনও দিইনি।"
বিবিসি লিখেছে, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে গুম-নির্যাতনের মত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে অন্য যে মামলাটি চলছে, সে বিষয়েও তারা শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করেছিল। জবাবে শেখ হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সেসব ঘটনা তিনি ‘জানতেন না’।
আর বিচার বহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নিয়ে তার ভাষ্য, "আমার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আমি অস্বীকার করছি। তবে কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ যদি থাকে, তাহলে তা যেন নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়।"

আদালতে যা বলেছেন হাসিনার আইনজীবী
শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে পলাতক দেখিয়ে চলা এই মামলায় আইন অনুযায়ী তাদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করে রাষ্ট্রপক্ষ। তাদের পক্ষে আদালতে লড়েন অ্যাডভোকেট আমির হোসেন।
আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে ২১ অক্টোবর হাসিনার আইনজীবী আমির হোসেন আদালতে বলেন, কয়েক দিন আগে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমাদ বিন কাসেম আরমানের একটি ভিডিও দেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেম আলীর বিচার চলাকালে আরমান ওই সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।
আমির হোসেনের ভাষ্য, ভিডিওটিতে আরমান তার বাবার বিচার চলাকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ১৯৭৩ এর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই আইনে সাক্ষ্য আইনের ‘সঠিক ব্যবহার’ করা যায় না; ‘ব্যাপক সীমাবদ্ধতা’ রয়েছে; ন্যায়বিচার ‘বিঘ্নিত’ হচ্ছে।
আরমানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আমির হোসেন বলেন, “এই আইনে মূল এভিডেন্স অ্যাক্ট প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। সিআরপিসিও এ আইনে গ্রহণ করা যায় না। এ আইনে বিচার মানে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিয়ে আসামিকে বলা হবে–এখন সাঁতার কাটো।”
আমির হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনে বলা হচ্ছে ১৫০০ জন নিহত এবং ২৫০০ আহত হয়েছেন। কিন্তু একমাত্র আবু সাঈদ ছাড়া কোনো আন্দোলনকারী নিহত হয়নি।
এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, “১৯৭১ সালেও কোনো নেতা নিহত হননি।”
এর জবাবে আমির হোসেন বলেন, “কীভাবে নিহত হবেন? তারা তো ভারতে ছিলেন।”
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটির’ অভিযোগের বিষয়ে আমির হোসেন বলেন, যদি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে ‘বৈধও ধরে নেওয়া হয়’, সেই আন্দোলনকেও ‘নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব’ রাষ্ট্রের রয়েছে।
৫২ জেলায় হত্যার ঘটনা ঘটেছে– প্রসিকিউশনের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমির হোসেন বলেন, “৫২টি জেলায় আন্দোলন করেছেন, কিন্তু তিনি (প্রসিকিউশন) সাক্ষী এনেছেন ১৫ থেকে ২০টি জেলার। ৫২ জেলায় টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটি সঠিক নয়।”
এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, “ওয়াইডস্প্রেড হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। ওয়াইডস্প্রেড কিলিং ঢাকায়ও হতে পারে।”
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় আপিল বিভাগে কোটা নিয়ে মামলা বিচারাধীন ছিল মন্তব্য করে আমির হোসেন বলেন, “প্রশাসন ইচ্ছা করলে বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।”
এর জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, “একদিনের মধ্যেও হিয়ারিং (মামলার শুনানি) করা যায়। রাষ্ট্রের হাতে অনেক সুইচ আছে, সেগুলো বন্ধও রাখতে পারে, ব্যবহারও করতে পারে।”
আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ‘ভুল বুঝেছেন’ দাবি করে আমির হোসেন বলেন, “হাসিনা ছাত্রদের রাজাকারের নাতিপুতি বলেননি। এটা আমি সাক্ষীদের জেরার সময় জিজ্ঞেস করেছি। তারা সবাই বলেছেন, কেউ রাজাকারের নাতিপুতি নন।”
এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, “রাজাকার একটি গালি। গত ৫৪ বছর ধরে রাজাকার একটি গালি হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।”
আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা প্রসঙ্গে আইনজীবী আমির বলেন, “আওয়ামী লীগ সম্পর্কে দুঃশাসন এবং ফ্যাসিবাদ একদম মেনে নিতে পারছি না। প্রত্যেক পরিবারের প্রধান চায় অন্য সদস্যরা ভালো থাকুক। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন উন্নয়নের মহাসোপানের সময়। কর্ণফুলী টানেল, পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে প্রভৃতি সুশাসন না হলে সুশাসন কী?”
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি থাকতে পারে। সেগুলো মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। পৃথিবীর শুরু থেকে এগুলো হয়ে আসছে। ইরানের খামেনি, মালয়েশিয়ার মাহথির মোহাম্মদ করেছেন। শুধু বেঠিকটাকে প্রাধান্য দেবেন, সঠিকটাকে দেবন না– তা তো হবে না।”
শাপলা চত্বরে ‘হত্যাকাণ্ডের’ অভিযোগ নিয়ে আমির হোসেন বলেন, “হেফাজতে ইসলাম ঢাকায় এসেছে। পল্টন বায়তুল মোকাররম এলাকায় তাণ্ডব চালিয়েছে। বড় বড় গাছ কেটেছে। তারা যেন রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে।”
শাপলা চত্বরে ৩০ জন নিহতের দাবি করে প্রসিকিউশনের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, আসলে ৩০ জন মারা গেছেন কিনা, তা তিনি নিশ্চিত নন।
এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ইংল্যান্ডের দ্য গার্ডিয়ানসহ কয়েকটি পত্রিকায় এ ব্যাপারে রিপোর্ট হয়েছে।
আমির হোসেন তখন বলেন, “সত্য হলে একটিই সত্য, আর সত্য না হলে ১০টি রিপোর্টও সত্য হবে না।”
জুলাই অভ্যুত্থানে ‘গণহত্যার নির্দেশদাতা’ হিসাবে শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসাবে ট্রাইব্যুনালে যেসব টেলিফোন কথোপকথন উপস্থাপন করা হয়েছে, তার যাচাই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তার রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী।
আমির হোসেন বলেন, “এই অডিওগুলো শুধু সিআইডি দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল। প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিকভাবে এগুলো পরীক্ষা করানো।”
তখন ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, বিবিসি, আল জাজিরা পরীক্ষা করেছে। কী কারণে অন্য নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে?
আমির হোসেন জবাবে বলেন, “সৃষ্টির শুরু থেকেই যখন কাজীর বিচার শুরু হয়, তখন থেকেই তৃতীয় নিরপেক্ষ সাক্ষ্য দিয়ে সত্যতা যাচাই করা হয়ে আসে। এটা নিয়ম, তবে আদালত চাইলে একজনের মতামত নিয়েও সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।”
তখন তৃতীয় নিরপেক্ষ কোনো সাক্ষ্যের বিষয়ে আসামির এই আইনজীবী সাক্ষীকে জেরার সময় বিষয়টি উত্থাপন করেননি তুলে ধরে বিচারক বলেন, “আপনি তো প্রতিবেদনে ঘাটতি থাকার বিষয়টি তোলেননি। এটা আপনি বলতে পারতেন।”
আমির হোসেন বলেন, “আমি বলতে পারতাম। বলি নাই বলে মাননীয় আদালত তো কভার করতে পারেন, সুযোগ আছে। মাননীয় আদালত যদি মনে করেন তাহলে তো বিবেচনা করতে পারেন।”
“আমরা তো মনে করছি না,” বলেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান।
হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার বিষয়ে একটি ভিডিও সাক্ষ্য নেওয়ার সময় ট্রাইব্যুনালে দেখানো হয়।
এই বিষয়ে আমির হোসেন বলেন, “একটি হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেছে। তবে ওই হেলিকপ্টার থেকে কে গুলি করেছে, ওই গুলিতে কে মারা গেছে, আদৌ কেউ মারা গেছে কিনা, তা বোঝা যায় না।”
দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, বিএনপি, জামায়াতের লোকজনকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
এর জবাবে শেখ হাসিনার আইনজীবী বলেন, “জামায়াত-শিবিরকে জঙ্গি বলেননি। জঙ্গি তো দেশে আছে। জামায়াতে জঙ্গি থাকতে পারে। শেখ হাসিনা তো জঙ্গি দমনে ভালো ভূমিকা পালন করেছেন। জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে।”
মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিন ২৩ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেলের একটি বক্তব্যের বিরোধিতা করে শেখ হাসিনার আইনজীবী বলেন, তার মক্কেল পালিয়ে যাননি, তাকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য প্রসঙ্গে আমির হোসেন বলেন, “যে কারণে ওই ব্যক্তি (তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে) দেশে আসেননি, আমার আসামিও সে কারণে দেশে আসছেন না।”
১৩ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল রায়ের তারিখ ঘোষণার পর আমির হোসেন বলেন, মক্কেলের অনুপস্থিতিতেও তিনি নিজের সর্বোচ্চ যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি আশা করছেন, ট্রাইব্যুনাল তার মক্কেলকে খালাস দেবে।
“আমি বিচারের কোনো অস্বস্তি দেখিনি। আমাকে কেউ বাধা দেয়নি, আমি আমার সীমাবদ্ধতার মধ্যে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি। মামলা পরিচালনায় যে সহযোগিতা লাগে, যেমন দলিল-দস্তাবেজ, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আইন অনুযায়ী আমাকে দেওয়া হয়েছে। যেসব ডকুমেন্ট পেয়েছি, তার আলোকেই আমাকে কাজ করতে হয়েছে।”