Published : 21 Apr 2026, 08:21 PM
ত্রয়োদশ সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান ৫৩ জন।
ক্ষমতাসীন বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াত ও স্বতন্ত্র জোটের ৫০ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর বাইরে আরও তিনজনের মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে প্রার্থীরা উপস্থিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন বলে মঙ্গলবার বিকালে রিটার্নিং অফিসার ইসির যুগ্ম সচিব মঈন উদ্দীন খান বলেছেন।
তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ে বিএনপি ও তার মিত্রদের ৩৬টি, জামায়াতের জোট থেকে ১৩টি ও স্বতন্ত্র জোট থেকে একটি মনোনয়নপত্র পেয়েছেন তারা।
রিটার্নিং অফিসার বলেন, “এর বাইরে আমরা তিনজনের মনোনয়নপত্র পেয়েছি।”
তফসিল অনুযায়ী, বুধ ও বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র বাছাই হবে। আপিল নিষ্পত্তি শেষে ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় রয়েছে। ১২ মে ভোটের তারিখ ঠিক করা আছে।
মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে আসন সংখ্যার সমান সংখ্যক বৈধ প্রার্থী হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন তারা। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় পার হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে সংসদ সদস্য হিসেবে গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।
আইন অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে ভোটে জয়ী দল বা জোটের আসন সংখ্যার অনুপাতে সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। সে অনুযায়ী বিএনপি ও তার মিত্ররা ৩৬, জামায়াত জোট ১৩ ও স্বতন্ত্র জোট একটি আসনে পেয়েছে এবার।
সংরক্ষিত আসনে ভোটাভুটির নজির নেই। দল ও জোটের সমান সংখ্যক প্রার্থী থাকায় বরাবরই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন প্রার্থীরা।

বিএনপি জোটের ৩৬ জন
বিএনপি ও তার মিত্রদের জন্য বরাদ্দ আসনে দলটির নীতি নির্ধারণী স্থায়ী কমিটির সদস্য যেমন রয়েছেন, তেমনি সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপি নেতাদের স্ত্রী-কন্যা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ছাত্র সংগঠনের সাবেক নেত্রী ও অঙ্গসংগঠনের নেত্রীরাও রয়েছেন।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা হলেন-সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা, রাশেদা বেগম হীরা, রেহানা আক্তার রানু, নেওয়াজ হালিমা আরলী, মোছাম্মৎ ফরিদা ইয়াসমিন, বিলকিস ইসলাম, সাকিলা ফারজানা, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, নিপুণ রায় চৌধুরী, জীবা আমিনা খান, মাহমুদা হাবিবা, সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, সানজিদা ইসলাম তুলি, সুলতানা আহমেদ, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ, সুবর্ণা সিকদার, শামীম আরা বেগম স্বপ্না, শাম্মী আক্তার, ফেরদৌসী আহমেদ, বীথিকা বিনতে হোসাইন, সুরাইয়া জেরিন, মানসুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলো, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আর আক্তার, মাধবী মারমা, সেলিনা সুলতানা, রেজেকা সুলতানা।
জামায়াত জোটের ১৩ জন
জামায়াতে ইসলামীর ও তার জোটের শরিকদের জন্য বরাদ্দ ১৩ আসনের মধ্যে জামায়াত আটজন, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির দুজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জাগপা থেকে একজন করে মনোনয়ন পেয়েছেন। একটি আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মাকে।
জামায়াতের নেতৃত্বধীন জোটের যারা মনোনয়নপত্র জমা দিলেন তারা হলেন দলটির মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মারজিয়া বেগম, জামায়াতের ছাত্রী সংসঠন ইসলামী ছাত্রীসংস্থার সাবেক সভানেত্রী ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নী, মহিলা জামায়াতের মিডিয়া ও প্রচার বিভাগীয় সেক্রেটারি নাজমুন নাহার নীলু, সিলেট মহানগর মহিলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাহফুজা হান্নান, বগুড়া অঞ্চল মহিলা জামায়াতের পরিচালক সাজেদা সামাদ, মহিলা জামায়াতের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সেক্রেটারি শামছুন্নাহার বেগম, নারী অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সদস্য মারদিয়া মমতাজ, জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মাহমুদা আলম মিতু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সভাপতি তাসমিয়া প্রধান ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাহবুবা হাকিম।
স্বতন্ত্র জোটের পক্ষ থেকে ছাত্রদলের সাবেক (শ্রাবণ-জুয়েল কমিটির) সহ সভাপতি সুলতানা জেসমিন জুঁই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আরও তিনজন
দল ও জোটের বাইরে আরও যে তিনজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তারা হলেন-জয়পুরহাটের মেহেরুন নেছা ও ঝিনাইদহের মাহবুবা রহমান। এ দুজন বিএনপির নেত্রী। আরেকজন শামীমা আক্তার।
জানতে চাইলে জয়পুরহাটের মহিলা দলের সাবেক সভানেত্রী মেহেরুন নেছা বলেন, “সবকিছু গুছিয়ে রেখেছি বলে আগেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে ফেলেছি। আমি দলের প্রতি অনুগত, দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।”
বাছাইয়ের পর প্রত্যাহারের সময় আছে, বলেছেন তিনি।
নির্ধারিত সময়ের পরে এলেন এনসিপির একজন
জামায়াত জোটের শরিক এনসিপির দুজন নারী প্রার্থী মনোনয়নপত্রজমা দিলেও নির্ধারিত সময়ের পরে নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত হন দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব নুসরাত তাবাসসুম । এসময় এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাতও উপস্থিত ছিলেন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নুসরাত ৪টা ১৯ মিনিটে ডেস্কে তার মনোনয়নপত্র জমা দেন। যদিও মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময় ছিল বিকাল ৪টা।
নির্বাচন ভবনে বিকেল পৌনে ৬টায় কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে এ নিয়ে তাদের কথা হয়।
এনসিপি মনোনীত একজন সরকারি চাকরি ছাড়ার তিন বছর পার না হওয়ায় বাছাইয়ে বাদ পড়ার শঙ্কা থেকে এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন দলের একজন নেতা।
তবে এ বিষয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ইসির যুগ্ম সচিব মঈন উদ্দীন খান বলেন, “ ৪টার পরে কেউ কোনো ডেস্কে বা কারো কাছে জমা দিয়ে থাকতে পারে। যদি সময়ের পরে জমা দিয়ে থাকে তবে তা আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো মনোনয়নপত্রও আসেনি"
তিনি বলেন, বিএনপি জোটের ৩৬টি, জামায়াত জোটের ১৩টি ও স্বতন্ত্র জোটের একটি এবং আলাদা তিনজনের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেছেন।
জোটের বাইরে মনোনয়নপত্র নেওয়ারও সুযোগ নেই। তবুও আলাদাভাবে তিনজন যেহেতু মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তা গ্রহণ করা হয়েছে। বাছাইয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে, বলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
মনোনয়নপত্র বাছাই চলবে দুই দিন
বুধবার জামায়াত ও স্বতন্ত্রদের মনোনয়নপত্র বাছাই এবং বৃহস্পতিবার বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই হবে।
রিটার্নিং অফিসার মঈন উদ্দীন খান বলেন, “তিনজন কোনো দল বা জোট থেকে আবেদন করেনি। ওনারা নিজেদের মতো করে নিজেরা জমা দিয়েছেন। বাছাইয়ের সময় বিষয়টি শেয়ার করবো।”
বাছাইয়ে বাদ পড়লে ২৬ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ রয়েছে, বলেন তিনি।
২৭ এপ্রিল ও ২৮ এপ্রিল আপিল নিষ্পত্তি হবে। ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও ৩০ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ আর ভোট ১২ মে।
জোটে আসন শূন্য হলে সব দলের জন্য উন্মুক্ত
শেষ পর্যন্ত কোনো জোটের আসন শূন্য হলে উপনির্বাচন হবে সবার জন্য উন্মুক্ত।
জানতে চাইলে রিটার্নিং অফিসার বলেন, যাচাই-বাছাইয়ে প্রার্থিতা বাতিল হলে আইন অনুযায়ী ওই সংরক্ষিত আসনটি সব দলের প্রার্থীর জন্য উন্মুক্ত হবে। নির্বাচন কমিশন এরপর নতুন তফসিল ঘোষণা করবে।
“তফসিল অনুযায়ী উন্মুক্ত আসনটিতে সব রাজনৈতিক দল বা জোট নতুন করে প্রার্থী মনোনয়ন দিবে, এরপর সংসদ সদস্যদের ভোটে ওই সংরক্ষিত আসনটিতে সদস্য নির্বাচন করা হবে।”

যা বলছেন প্রার্থীরা
মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সেলিমা রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “আমি মনে করি এবারের মনোনয়নটা অত্যন্ত সুন্দরভাবে চিন্তাভাবনা করে হয়েছে। এখানে প্রবীণ এবং নবীনের যে সমন্বয় হয়েছে। আমরা আশা করি, সবাই পার্লামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।”
তিনি বলেন, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সংসদ। ১৭ বছর পরের এই সংসদ গণতন্ত্র উত্তরণে কাজ করবে।
বিএনপির সেলিনা সুলতানা নিশিতা বলেন, “আমি জেল খেটেছি, মার খেয়েছি। আমি রাজপথে ছিলাম। ১৭ বছরে ফ্যসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ছিলাম। আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে অংশীদার হবো, মানুষের সেবা করবো।”
সুলতানা আহমেদ বলেন, “আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।…আমি মনে করি, আমরা সবাই মিলে দেশ ও জাতির উন্নয়নে কাজ করব, পাশাপাশি নারী ও শিশুর উন্নয়নেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।”
সানসিলা জেবরিন বলেন, “নারীদের অধিকার আদায়ের যে কাজগুলো করা দরকার, সেগুলো করতে চাই।”
এনসিপির মাহমুদা আলম মিতু বলেন, “জামায়াত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির জায়গাটা ঠিক রেখেছে। দেশের স্বার্থে জোটের আমরা একসাথে কাজ করবো।”
জাগপার তাসমিয়া প্রধান বলেন, “দেশ গঠনে, দেশের সব সংকটে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো।”
জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি, তাদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবো। জামায়াতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”
স্বতন্ত্র জোটের সুলতানা জেসমিন জুঁই বলেন, “পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য কাজ করতে চাই।”
আগের খবর:
সংরক্ষিত নারী আসন: সংসদে যাচ্ছেন কারা, তালিকা জানাল বিএনপি