Published : 17 Dec 2025, 12:16 AM
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ কোটি ৫৯ লাখ কপি নতুন বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে।
বিজয় দিবসের ঠিক আগে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এসব বইয়ের প্রায় শতভাগ পৌঁছে গেছে উপজেলাগুলোতে।
কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বই ছাপার কাজ এখনও অনেকটা বাকি। এমন বাস্তবতায় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুর দিনে সব বই পাবে কি-না তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি।
শিক্ষার্থীদের বই ছাপানোর কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি ডিসেম্বর মাসেই মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বই ছাপার কাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
তবে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কিছু বই উপজেলাগুলোতে পৌঁছাতে জানুয়ারির প্রথমাংশ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে এবার প্রায় ৩০ কোটি বই ছাপা হবে। পুরোপুরি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব বই ছাপানোর কাজ চলছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও এবতেদায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য ২১ কোটি ৪৩ লাখ বই ছাপার কাজ শুরু হয়েছে নভেম্বরের শুরুতে।
অভ্যুত্থানের পর পুরনো শিক্ষাক্রমে ফেরাসহ নানা প্রক্রিয়াগত কারণে গতবছর পাঠ্যবই ছাপার কাজ শুরু হয়েছিল ডিসেম্বরে। শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার সেপ্টেম্বরে মাধ্যমিকে বই ছাপার কাজ শুরুর করার পরিকল্পনা করেছিল এনসিটিবি।
দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিলের কারণে দেরি হওয়া ছাপার কাজসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করে নতুন বছরের শুরুতে মাধ্যমিকের সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে কী-না তা নিয়ে শঙ্কার কথা বলছেন এনসিটিবির কর্মকর্তারাই।

প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ শেষ
প্রাথমিকের বই মুদ্রণ ও বিতরণে থার্ড পার্টি ইন্সপেকশন এজেন্ট ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশনের প্রতিনিধি মো. মনির মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৪ হাজার কপি বইয়ের মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে।
শতভাগ বইয়ের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশনও শেষ। সোমবার পর্যন্ত ৮ কোটি ৫১ লাখ ৪৮ হাজার কপি বা ৯৯ দশমিক ১০ শতাংশ বই বিতরণ হয়ে গেছে।
এদিকে মঙ্গলবার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, “মহান বিজয় দিবসের প্রাক্কালে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সম্মিলিত ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এনসিটিবি প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) শতভাগ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহ কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করেছে। বিগত কয়েক বছরের ইতিহাসে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এত বৃহৎ ও জটিল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হওয়া একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারের ‘অঙ্গীকার ও প্রচেষ্টার’ পাশাপাশি এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান, পরিবহন সংস্থা এবং এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘শ্রম ও নিষ্ঠার ফলে এই অভাবনীয় সাফল্য’ অর্জিত হয়েছে।
“এর ফলে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের প্রাথমিক স্তরের সকল শিক্ষার্থীর হাতে সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেওয়ার পথ সুগম হয়েছে।”
শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগেই সাড়ে আট কোটির বেশি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও প্রস্তুত করা যে একটি ‘জটিল ও চ্যালেঞ্জিং’ কাজ ছিল, সে কথা তুলে ধরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “এই সাফল্য সরকারের শিক্ষা-বান্ধব নীতি ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অটল প্রতিশ্রুতির সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে এটি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।”

মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ কতদূর?
এবার সেপ্টেম্বরে মাধ্যমিকে বই ছাপার কাজ শুরুর করার পরিকল্পনা করেছিল এনসিটিবি। কিন্তু সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি প্রথম দফায় মাধ্যমিক পর্যায়ের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করে দেওয়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ের বই ছাপার কাজ শুরু হতে ‘দুই মাস’ দেরি হয়। মাধ্যমিক ও এবতেদায়ী পর্যায়ের ২১ কোটি ৪৩ লাখ কপি বই ছাপার কাজ শুরু হয় নভেম্বরে।
এমন বাস্তবতায় বছরের শুরুতে সব মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষার্থীর হাতে সবগুলো বিষয়ের নতুন বই তুলে দেওয়া সম্ভব হবে কি-না, তা নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি হয়।
মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নের জবাবে এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম আসাদুজ্জামান মাধ্যমিকে বই ছাপানোর অগ্রগতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
তবে এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবতেদায়ী পর্যায়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষাথীদের বই ছাপার কাজ প্রায় শেষ। এসব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বইয়ের ৯০ শতাংশ ইতোমধ্যে বিতরণ হয়েছে গেছে উপজেলা পর্যায়ে। আশা করছি ২২ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সবগুলো নতুন বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।
“এদিকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বইয়ের ৬০ শতাংশ মুদ্রণ শেষ হয়ে গেছে। যেগুলো ছাপার কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করতে আমরা মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাগাদা দিচ্ছি।”
অন্যান্য বই মুদ্রণ ও বিতরণের তথ্য দিতে গিয়ে মতিউর রহমান বলেন, “ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই ছাপার কাজ ‘অনেকটা’ এগিয়েছে। এ শ্রেণির সবগুলো বিষয়ের নতুন বই আশা করছি ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।”
সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির সবগুলো বিষয়ে নতুন বই বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে কি-না তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বিতরণ নিয়ন্ত্রক বলেন, “সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই ছাপার কাজ চলছে। যেসব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নবম শ্রেণির বই ছাপছেন না, তারা পুরোদমে এ দুই শ্রেণির বই ছাপানোর কাজ করছেন।”
ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই ছাপাতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চুক্তি করেছিল এনসিটিবি। বই ছাপাতে ৬০ দিন ও অন্যান্য কাজে আরও ১০ দিন সময় দেওয়ার কথা ছিল মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে। কিন্তু সে সময় কমিয়ে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৪৫ দিন সময় দিয়েছিল এনসিটিবি। সে হিসাবে চলতি মাসের শেষাংশেই এ তিন শ্রেণির বই ছাপার কাজ শেষ হওয়ার কথা।
এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করতে আমরা প্রতিদিনই মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলছি। বুধবারও কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে আমরা বসব।”
সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কতগুলো বিষয়ের বই বছরের শুরুতে মিলবে জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি সবগুলো বিষয়ের নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের শুরুতেই তুলে দেওয়ার। তবে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপানোর কিছু কাজ শেষ হতে হয়ত আরেকটু সময় লাগবে।
“যদি কাজ শেষ না হয় তবে, এ দুই শ্রেণির ‘কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের’ কিছু বই মুদ্রণ শেষ হয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগবে। তবে সে সময়টা যেন প্রয়োজন না হয় সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
পুরনো খবর
এবারও ছাপার কাজে দেরি, বছরের শুরুতে বই পাবে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা?