Published : 29 Apr 2026, 12:57 AM
জিয়া পরিবার বিষয়ে বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থের বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। এ নিয়ে কিছু সময় হৈচৈও হয়েছে।
মঙ্গলবার ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকে পার্থের বক্তব্যের জবাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। পাল্টা জবাব দেন বিএনপির মিত্র এই সদস্য।
এ সময় হৈচৈ শুরু হলে ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দলের সদস্যদের বসতে বলেন এবং পার্থকে তার বক্তব্য শেষ করার সুযোগ দেন।
‘জিয়া পরিবার মানে বাংলাদেশের গণতন্ত্র’
বিরোধী দলের বক্তব্যের সমালোচনা করে পার্থ বলেন, বিরোধী দলের নেতা সুন্দর কথা বলেন এবং সরকারি দলের অনেকেই তার কথার ভক্ত হয়ে গেছেন।
এরপর পত্রিকার ‘কাটিং’ দেখিয়ে তিনি কয়েকটি বক্তব্যের কথা তুলে ধরেন।
তিনি কিছু পত্রিকার শিরোনাম পড়ে শোনান। এর মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত শিরোনাম হল, ‘বিএনপি ফ্যাসিবাদীর রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করছে’, ‘বিড়ালের মত বাঁচতে চাই না, সিংহের মত বাঁচতে চাই’, ‘মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত আল্লাহ বানাইছে, আমরা সিংহ বিড়াল হয়ে যাচ্ছি’, ‘সংস্কার পিছিয়ে গেলে অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি হবে’, ‘জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার ঘোষণা’।
এ সময় পার্থ বলেন, “১৬ বছর জিয়া পরিবারের থেকে মুক্ত করতে যেয়ে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার দিয়ে পালিয়েছে।”
এরপর তিনি বলেন, “জিয়া পরিবার মানে বাংলাদেশের গণতন্ত্র। জিয়া পরিবার মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ধারক বাহক। জিয়া পরিবার মানে গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু।”
বিরোধী দলের উদ্দেশে বিজেপি নেতা বলেন, “তারা বলেছে আওয়ামী লীগ সরাতে ১৬ বছর লেগেছে, আপনাদের (বিএনপি) সরাতে ১৬ দিন লাগবে না।
“একদিকে এসব কথা বলা হয়, অন্যদিকে ঐক্যের কথা বলা হয়। এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড করে লাভ হবে না।”
‘সবাই আমাকে ভালোবেসে কচলায়’
পার্থের বক্তব্যের পর বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, “পড়েছি মুসিবতে। সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে তো, এইজন্য আমাকে নিয়ে কচলায় সবাই।”
তার এই মন্তব্যে সংসদে হাসির রোল পড়ে।
শফিকুর রহমান বলেন, “পার্থ ভালো বিতার্কিক এবং প্রচুর ‘ম্যাটেরিয়াল’ নিয়ে এসেছেন। কিছু সঠিক চালান দিয়েছেন, কিছু বেঠিক চালান দিয়েছেন।”
পার্থ কার নামে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি, কিন্তু ফাইলটা শুরু করেছেন তার নামে।
শফিকুর রহমান বলেন, “পার্থ বলেছেন আমি নাকি জিয়া পরিবার নিয়ে কথা বলেছি।
“আমি এই ধরনের ‘রেকলেস’ কথা কারো নামেই বলি না। এমনকি শেখ হাসিনার পরিবারের নামেও আমি বলি না। যে দোষ করবে তার সাথে যাবে বিষয়টা। অন্য কেউ বললে সেটা আমার নামে চালান হবে না।”
তিনি পার্থকে অনুরোধ করেন, বক্তব্যের ‘মাধুর্য ছড়াতে গিয়ে’ যেন ভবিষ্যতে তার ওপর এমন কথা চাপিয়ে না দেওয়া হয়।
‘ডকুমেন্ট আছে’, পার্থের জবাবে হইচই
শফিকুর রহমানের বক্তব্যের জবাবে পার্থ বলেন, তার হাতে ডকুমেন্ট আছে। ‘জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার’ কথা এনসিপির একজন নেতা বলেছেন।
তিনি বলেন, “আমি তো ওনার কথা বলি নাই, যিনি বলেছেন তার কথা বলছি।”
এ বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করেন।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সদস্যদের বসতে বলেন।
বিরোধী দলের নেতা দাঁড়িয়ে থাকলে তাকেও বসতে অনুরোধ করেন ডেপুটি স্পিকার।
তিনি বলেন, “কোনো সদস্যের বক্তব্য পছন্দ হতে পারে বা নাও হতে পারে, কিন্তু দাঁড়িয়ে বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।”
কায়সার কামাল সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনার কথা সবাই বলেন, কিন্তু জাতি এমন চেতনা দেখতে চায় না।
এরপর পার্থকে এক মিনিটে বক্তব্য শেষ করতে বলেন ডেপুটি স্পিকার।
‘ভুল বোঝাবুঝি হলে নো প্রবলেম’
পার্থ পরে ব্যাখ্যায় বলেন, তিনি ১১ দলের নেতা হিসেবে শফিকুর রহমানের নাম বলে শুরু করেছিলেন। তবে তার হাতে থাকা ক্লিপগুলোতে আরও অনেকের কথা ছিল।
তিনি বলেন, “আমি ওনাকে অভিযুক্ত করে বলি নাই। ‘ডকুমেন্ট’ নিয়ে কথা বলছি। ভুল বোঝাবুঝি, এটা খুব ‘সিম্পল’ ব্যাপার।”
ডিজিটাল যুগে মিথ্যা বলা সম্ভব নয় মন্তব্য করে পার্থ বলেন, তিনি মিথ্যা বললে সেটি বের হয়ে যাবে।
ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই সদস্য বলেন, “জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সারাদিন বলতে পারবো, ইনশাআল্লাহ। আপনি খালি সময় দেন।”
‘ডকুমেন্টের রেফারেন্স স্পষ্ট হতে হবে’
এরপর বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “এই ফ্লোরে দাঁড়িয়ে যখন কোনো ‘ডকুমেন্ট’ হাতে নিয়ে আমরা কোনো ‘রেফারেন্স’ দেব, ‘দ্যাট সুড বি ক্লিয়ার অ্যান্ড অ্যাপ্রোপ্রিয়েট’।”
তিনি বলেন, “কোনো বক্তব্য চ্যালেঞ্জ করার থাকলে করা যাবে, স্বীকার করার থাকলে সেটিও করা যাবে। কিন্তু বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করলে সমস্যা তৈরি হয়।”
ঢাকা-১৫ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, “‘ডকুমেন্টেড’ কোনো কিছু এখানে যদি কেউ ‘রেফারেন্স’ দিয়ে ‘এক্সপ্রেস’ করেন, ‘দ্যাট সুড বি ভেরি স্পেসিফাইড’।”
‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কীভাবে শেখাব’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বিজেপির সদস্য পার্থ বলেন, জাতিকে বিভক্ত করা যাবে না বলা হলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শেখাতে হলে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছিল তা বলতে হবে।
তিনি বলেন, “জাতিকে বিভক্ত না করলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কীভাবে শেখাব? আমরা কার সাথে যুদ্ধ করছি? আমরা রাজাকারের সাথে যুদ্ধ করছি।”
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালকে আলাদা করে দেখার কথা বলেন তিনি।
পার্থ বলেন, “অবশ্যই ১৯৪৭ সম্মানের, অবশ্যই ১৯৫২ সম্মানের। কিন্তু ১৯৭১ আলাদা। ৫২ আমাদের অর্জন, ৭১ আমাদের অর্জন। আমাদের আবেগ, আমাদের গৌরব, আমাদের অস্তিত্ব।”
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ এলে সে সময় কার কী ভূমিকা ছিল, সেটিও আসবে।
তার ভাষায়, “৪৭, ৫২ আর ৭১ এক না। প্রত্যেকটারই বিউটি আলাদা।”
‘রাজনৈতিক কালচার বদলাতে হবে’
পার্থ বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর কাজ প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন। রাজনৈতিক সৌজন্য গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, “‘প্রাইম মিনিস্টার স্টার্টেড পলিটিক্যাল জেসচার’। ‘চেঞ্জ’ করতে হবে।”
ইতিহাসের ভিত্তি নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরার ওপর জোর দিয়ে ভোলার এই এমপি বলেন, সাত বীরশ্রেষ্ঠের নাম কতজন তরুণ জানে, সেটি ভাবার বিষয়।
তিনি বলেন, “অনেক অপ্রয়োজনীয় ‘সেলিব্রিটির’ নাম তরুণরা জানে, অথচ যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের নাম জানে না।
“তাদেরকে অনুধাবন করতে হবে, এইসব লোকেরা ‘সেলিব্রিটি’ না; দেশের জন্য তারা জীবন দিয়েছে, ‘টু সেলিব্রেটি অফ দা কান্ট্রি’।”
‘অথনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার আইন করা উচিত’
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া, ব্যাংক লুট এবং একজন মন্ত্রীর ৭০০ বাড়ি থাকার অভিযোগের প্রসঙ্গও তোলেন ভোলার এই এমপি।
তিনি বলেন, “গত সরকারের সময় আমরা নিষেধাজ্ঞা পেয়েছি। নিষেধাজ্ঞা বিদেশের মাটিতে আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।”
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুনাম পুনরুদ্ধারে পর্যাপ্ত কাজ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
পার্থ বলেন, “যদি সম্ভব হয়, একটা অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার আইন পাস করা উচিত। ভবিষ্যতে যাদের কর্মকাণ্ডের জন্য বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুনাম নষ্ট হয়, তারা যেন দেশদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হয়।”