Published : 05 Apr 2026, 09:14 PM
গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ আগে আইনে পরিণত করে পরে প্রয়োজন হলে সংশোধনের দাবি তুলেছেন জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম আরমান।
জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের গুমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশেষ কমিটি এ দুটি আইন বাতিলের সুপারিশ করায় তিনি ‘স্তম্ভিত’।
তার দাবি, সরকার যদি আইনগুলো সংশোধন করতে চায়, তাহলে আগে অনুমোদন দিয়ে আইনে পরিণত করুক, পরে সংশোধনী আনা হোক।
রোববার সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনার সময় তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বর্তমান কাঠামোয় ‘অসামঞ্জস্য’ আছে; সেগুলো যাচাই-বাছাই করে আরও ‘যুগোপযোগী’, ‘জনকল্যাণমুখী’ এবং ‘ন্যায়বিচার নিশ্চিত’ করতে নতুন বিল আনা হবে।
নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে তোলা অধ্যাদেশগুলো ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে সেগুলোর আইনি বৈধতা থাকে না।
পয়েন্ট অব অর্ডারে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আরমান বলেন, “আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি একটি অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসে, যেখানে আমার মত আরও শত শত লোককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের আর ফিরে আসার সৌভাগ্য তাদের হয়নি।”
তিনি বলেন, “আমরা সেই অন্ধকার ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। মনে করেছিলাম এই অন্ধকার ঘরে আমাদের মৃত্যু হচ্ছে। হয় তারা আমাদেরকে হত্যা করবে, সেখানেই আমাদের মৃত্যু হবে। কথা বলার কেউ ছিল না। কীটপতঙ্গ, পিঁপড়া, টিকটিকির সঙ্গে কথা বলতাম। বুঝতে পারতাম না বাইরে দিন, নাকি রাত। মনে হত জীবন্ত কবর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
এই সংসদ সদস্য বলেন, “এইভাবে মৃত্যুর প্রহর যখন গুনছিলাম, একদিন রাতে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করা হচ্ছে, তখন ধরে নিচ্ছি আজকেই আমার মৃত্যু হবে। তখন আমি সূরা ইয়াসিন পড়া শুরু করেছিলাম যাতে মৃত্যুটাকে সহজ হয়।
“কিন্তু পরে জানতে পারি কিছু বাচ্চা ছেলে জীবন দিয়ে, চোখ হারিয়ে, পা হারিয়ে ফ্যাসিবাদকে বিতাড়িত করে আমাদের আবার দুনিয়ার আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।”
গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “আমরা স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ্য করছি, আমাদের সঙ্গে যা করা হয়েছিল তা যেন বাংলাদেশের মাটিতে আর কোনোদিন না হয়, সে জন্য গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইন করা হয়েছিল। বিশেষ কমিটি আইনগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছে।”
সরকারের প্রতি তার আহ্বান, “আমাদের আবেদন, যদি সরকার কোনো সংশোধন করতে চায় এই আইনটিকে, আগে অনুমোদন দিয়ে আইনে পরিণত করুক। পরে সংশোধন করা হোক। যদি সেটা না করা হয়, ১২ তারিখ অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে গেলে, ১৩ তারিখ থেকে গুমের সংজ্ঞা থাকবে না।”
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, “যারা গুম হয়েছেন, তাদের কেউ আমার স্বজন, আমার ভাই, আমার বোন, আমার আত্মীয়, আমার প্রতিবেশী, আমার বাংলাদেশের মানুষ।”
তবে তার বক্তব্য, বর্তমান অধ্যাদেশ দুটির ভাষা ও কাঠামো বহাল রেখে আইন করা হলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতিই ‘অবিচার’ হতে পারে।
তিনি বলেন, “মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ যেভাবে করা হয়েছে, সেটা করা হলে গুমের শিকার সদস্যদের প্রতি অবিচার করা হবে।”
আইনমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুমের সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে; সেখানে বিচার ও তদন্তের সুযোগ আছে। অন্যদিকে গুমবিষয়ক অধ্যাদেশে আলাদা তদন্ত ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
তার ভাষায়, “সেখানে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু গুমের আইনে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা রাখা হয়েছে।”
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান রূপে এটি বহাল থাকলে তদন্তের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিরা ‘অতিরিক্ত হয়রানির মুখে’ পড়তে পারেন। সে কারণেই অধ্যাদেশ দুটো আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার।
আইনমন্ত্রী বলেন, “এ দুটো আইন আরও বেশি যুগোপযোগী, জনকল্যাণমুখী, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য এ সেশনের মাঝামাঝি বা পরবর্তীতে অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সুনির্দিষ্টভাবে বিল আনব, যাতে করে অপরাধীরা কোনভাবে ছাড়া না পায়।”
ব্যারিস্টার আরমানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ব্যারিস্টার আরমান আমার ভাই, স্বজন, সহকর্মী। উনি দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে গুমের শিকার হয়েছিলেন, সেইভাবে বাংলাদেশের সাতশর বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছিলেন।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুমের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, “তাকে যেভাবে গুম করা হয়েছিল, যেভাবে তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনেছেন এবং পরে দেশে ফিরেছেন, তাতে এই বার্তা স্পষ্ট যে গুমের সঙ্গে জড়িত কাউকে আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে দেওয়া হবে না।”
তার ভাষায়, “এটা মনে করার কারণ নেই যে গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে পারবেন। সে কারণে গুমের আইনে যে সাজা ও তদন্তের প্রস্তাব করা হয়েছিল, আবার আইসিটি আইনে গুমের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, দুটোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থা যাতে বিরাজ না করে, সে জন্য আইনগুলো যাচাই-বাছাই করা দরকার।”
তিনি বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় ব্যারিস্টার আরমানসহ এ খাতের ভুক্তভোগীদেরও যুক্ত করা উচিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কিছু অধ্যাদেশ বিল আকারে এগোলেও কিছু অধ্যাদেশ এখনই না এনে আরও পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশও সেই তালিকায় রয়েছে।