Published : 23 Apr 2026, 09:05 AM
বেসরকারি চাকরিজীবী মাহিনূর বেগমের মোবাইলে মঙ্গলবার একটি এসএমএস পেয়েছেন, যাতে বলা হচ্ছে, ‘স্পিডিং ফাইন বকেয়া রয়েছে, দ্রুত পরিশোধ করুন’।
এরপর মাহিনুর তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেন। খোঁজখবর নিয়ে তাদের কাছে মনে হয়েছে—এটি কোনো প্রতারক চক্রের কাজ, যাদের হাতে এর মধ্যেই গাড়ি মালিকদের সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।
বিগত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন ধরনের মোটরযান মালিকরা এরকম বার্তা পেয়েছেন বলে গাড়ি ও মোটরসাইকেল সংক্রান্ত বিভিন্ন ফেইসবুক গ্রুপে পোস্ট করে জানিয়েছেন অনেকে।
বুধবার রাতে এক ফেইসবুক পোস্টে দেশের সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ জানিয়ে দিয়েছে, এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটা প্রতারকদের কাজ হতে পারে।
পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টিকে প্রতারণার ফাঁদ বর্ণনা করে ওই লিংকে ক্লিক না করতে বলা হয়েছে।
ফেইসবুকের ‘কার হাব’ নামে গাড়ি ব্যবহারকারীদের একটি গ্রুপে তাজবিউল ইসলাম তন্ময় নামের একজন লিখেছেন, “আজ (২১ এপ্রিল) দুপুরে অফিসে বসে লাঞ্চ করছিলাম। হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এলো— ‘স্পিডিং ফাইন’। সাথে একটি লিংক। প্রথমে খুব একটা চিন্তা না করে লিংকে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি আমার নামে ৩০০০ টাকার মামলা।
“আবার লেখা- ৩ দিনের মধ্যে পেমেন্ট করলে ৫০% ডিসকাউন্ট! এই জায়গাতেই একটু সন্দেহ হলো। ইন্টারফেসটা একদম হুবহু অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মতো। দেখে বোঝার উপায় নেই এটা ফেক। নাম্বারটা ট্রুকলার এ চেক করলাম- কোনো তথ্য নেই।”
তন্ময় লিখেছেন, “এরপর অফিসের এক কলিগকে দেখালাম। সে কম্পিউটার থেকে লিংক চেক করে দেখলো—সব ঠিক, কিন্তু ডোমেইন নামটা সামান্য আলাদা! তখনই বুঝলাম— এটা একটা ফিশিং স্ক্যাম।
“পেমেন্ট অপশন ছিল শুধুই ব্যাংক ট্রান্সফার। পেমেন্ট করতে গেলে ব্যাংক ডিটেইলস ও পিন দিতে হতো। মানে, একবার দিলেই সব তথ্য তাদের হাতে চলে যেত।”
তাজবিউল লিখেছেন, “অপরিচিত লিংকে ক্লিক করবেন না। সরকারি কোনো জরিমানা হলে নিজে অফিসিয়াল সাইটে গিয়ে চেক করুন। ‘দ্রুত পেমেন্ট’ বা ‘ডিসকাউন্ট’ দেখলে আরও সতর্ক হোন। এই ধরনের স্ক্যাম এখন খুব বেশি হচ্ছে।”
ওই পোস্টের নিচে রাফান মাহমুদ নামে একজন মন্তব্য করেছেন, “প্রথমত এটা স্ক্যাম। আর এই স্ক্যাম হওয়ার পিছনে সম্পূর্ণ দায়ী বিআরটিএ, কিছুদিন আগে বিআরটিএ ওয়েবসাইট হ্যাক হয়েছিল। এখান থেকে বিপুল পরিমাণে ডাটা ব্ল্যাক মার্কেটের সেল হয়েছে, সেটার একটা রূপ এটা।”
একই রকম এসএমএস পেয়েছেন রাশেদ আলম নামে একজন মোটরসাইকেল ব্যাবহারকারী।
তিনি বলেন, “আমার নামে একটা মোটরসাইকেল ছিল, কিছুদিন আগে এক আত্মীয়ের কাছে বেচে দিয়েছি। কিন্তু নাম ট্রান্সফার হয়নি। সেখানে আমার নম্বর দেওয়া ছিল। এসএমএসটা পাওয়ার পর মোটরসাইকেল ক্রেতা আত্মীয়কে ফোন করে ঝাড়ি দিলাম।
“কিন্তু তিনি ব্যাখ্যা দিলেন যে, তিনি নতুন চালান। তার ওভারস্পিডিং করার কোনো কারণ নেই। তারপর লিংকটা ভালো করে দেখে মনে হলো এটা ভুয়া।”
রাশেদ বলছেন, “বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল যে ওয়েবসাইটটা আছে, ওটার মতো করে একই রকম রং আর ফন্ট দিয়ে প্রতারকেরা একটা ওয়েবসাইট বানিয়েছে। যেখানে তারা লোকজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নিতে চাইছে বলে মনে হল।”
ট্রাফিক গুলশান বিভাগের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে প্রতারণা বর্ণনা করে ফেইসবুকে পোস্ট দেওয়া হয়েছে।

গুলশান বিভাগের ডিসি মিজানুর রহমানের লেখা ওই পোস্টে বলা হয়েছে, “সম্প্রতি একটি প্রতারক চক্র ভুয়া মেসেজ প্রেরণের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে এবং জাল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে সকলকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।
“উল্লেখ্য যে, এ ধরনের কোনো মেসেজ বা অনলাইন লিংকের মাধ্যমে ট্রাফিক সংক্রান্ত জরিমানা আদায় করা হয় না। সড়কে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক সার্জেন্ট মামলা করলে সংশ্লিষ্ট মামলার একটি নির্দিষ্ট কেস আইডি প্রদান তৈরি হয়, যার ভিত্তিতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে (যেমন: ইউক্যাশ/উপায় অ্যাপের মাধ্যমে) জরিমানা পরিশোধ করা হয়।
“এছাড়া ভিডিও বা ডিজিটাল মামলার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে কেস আইডি সংগ্রহ করে নির্ধারিত মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। অতএব, এ ধরনের সন্দেহজনক মেসেজ বা লিংক প্রাপ্ত হলে তাতে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকার জন্য সকলকে অনুরোধ করা হলো।”
বুধবার রাতে এক ফেইসবুক পোস্টে বিআরটিএর পক্ষ থেকেও বিষয়টিকে প্রতারণা বর্ণনা করে সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলছেন, “পুলিশ বিষয়টি দেখছে।”
তবে এই বার্তা যারা পেয়েছেন, তাদের থানায় অন্তত জিডি করার অনুরোধ জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে পুলিশের কাজ করতে সুবিধা হয়।