Published : 30 Mar 2026, 09:54 PM
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এবং সাধারণ মানুষের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি জাতীয় সংসদে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেছেন, “জুলাই অভ্যুত্থানকারী, জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে, সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে যারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে, সে যে ড্রেস, যেটাই হোক, সেটা যে বাহিনীর ড্রেসেই হোক এবং আওয়ামী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, যুবলীগ, ছাত্রলীগ যারা যে বাহিনীর ড্রেসই পরুক, তারা সবাই অপরাধী।”
সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে নোয়াখালী ২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন ফারুকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব হয়।
মন্ত্রী বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। না হলে আপনারা দায়ের করবেন। এবং সকল মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হবে। বিচার করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। জুডিশিয়ারির বিচার হবে ইনশাআল্লাহ।”
রংপুর ৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের সম্পূরক প্রশ্নে জুলাইয়ের ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও বিচারের প্রসঙ্গ ওঠে।
তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে পুলিশ বাহিনীর ভেতর থেকে ‘আইন অমান্য করে’ নানা কর্মকাণ্ড হয়েছে। বিশেষ করে জুলাইয়ে বাহিনীর অনেক সদস্য “স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নানা ধরনের হত্যাযজ্ঞে” অংশ নিয়েছেন, “মানুষের উপর নির্যাতন নিপীড়ন” করেছেন।
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ অঙ্গীকারবদ্ধ।
তিনি বলেন, “বিগত ইন্টেরিম গভার্নমেন্টের সময় ‘জুলাই যোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ নামে একটা অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। সে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে এখানে মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।”
সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে এ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “সুখের বিষয় সর্বসম্মতিক্রমে আমরা এই জুলাই যোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশটা পার্লামেন্টে বিল আকারে উপস্থাপন করে পাস করার বিষয়ে একমত হয়েছি।”
জুলাইয়ের ঘটনাকে ঘিরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবির প্রসঙ্গও তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজপথে অভ্যুত্থানকারী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যারা হানাদার বাহিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, ম্যাসাকার করেছে, গণহত্যা করেছে, তারা জনতার প্রতিরোধের মুখে কেউ কেউ হয়ত প্রাণ হারিয়েছে, কেউ কেউ আহত হয়েছে, কিন্তু সেটা যুদ্ধের ময়দানে ফয়সালা হয়ে গেছে।”
এরপর তিনি বলেন, “সেখানে জুলাই যোদ্ধাদেরকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা এই অধ্যাদেশটি এখানে গ্রহণ করার জন্য সবাই সর্বসম্মত হয়েছি।”
রংপুর ৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রশ্নের জবাবেই জুলাইসহ বিভিন্ন সময়ে পুলিশের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার প্রসঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “পুলিশের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে স্পেসিফিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিছু মামলা আইসিটি কোর্টে হয়েছে। কিছু মামলা সাধারণ আইনে, পেনাল কোডের আন্ডারে বিভিন্ন মামলা আদালতে আছে। সেগুলো ইনভেস্টিগেশন হচ্ছে। কিছু কিছু বিষয়ে চার্জশিট হয়েছে।”
শেখ হাসিনা ও তার সরকারের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায়ের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুই-একটা মামলা এবং তার সহযোগী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুই-একটা মামলার রায়ও ঘোষিত হয়েছে।”
সরকার বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করবে না–এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আদালত স্বাধীনভাবে তার বিচারকার্য পরিচালনা করবে। সেখানে আমরা কোনো ইন্টারফেয়ার করব না, করতে চাই না। এটাই বর্তমান সুশাসনের, আইনের শাসনের ব্যবস্থা আমরা কায়েম করতে চাই।”
তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ এদেশের সকল গুম, খুন, হত্যাকাণ্ড এবং গণহত্যার বিচার হবেই।”
টাঙ্গাইল ৭ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর সম্পূরক প্রশ্নে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রশ্নে ওই সংসদ সদস্য বলেন, আগের সরকারের সময়ে পুলিশ বাদী হয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে করা অনেক মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি; পুলিশ বাদী হওয়ায় অনেকে এখনো “কোর্টের বারান্দা দিয়ে ঘুরছে।”
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত “গায়েবি মামলা, মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা, গুম, খুন, অপহরণসহ বিভিন্ন অনাচারের সঙ্গে” পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য জড়িয়েছিলেন।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তবে সব মামলা তখন অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
“হত্যা মামলা, অপহরণ মামলা, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র মামলা এবং নারী নির্যাতন মামলা, ধর্ষণ মামলা এগুলো কোন কিছুই এখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিছু বাদ ছিল।”
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়। সে কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত যেসসব ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মামলা হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করার জন্য সেই কমিটির কাছে আবেদন করতে হবে।
আবেদন এফআইআর, চার্জশিটসহ নির্ধারিত তথ্য দিতে হবে। জেলা কমিটি যাচাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। পরে আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারা অনুসারে মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমিল্লা ৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত পুলিশের বাজেট ঘাটতি ও দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি বলেন, পুলিশের তৃণমূল পর্যায়ে নানা “ইনস্ট্রুমেন্টাল” সমস্যা রয়েছে। তদন্তে পাঠানো হলে খরচ থানা থেকে দেওয়া হয় না, আর যা দেওয়া হয় তা অপ্রতুল।
তার ভাষায়, “আমরা যখন পুলিশকে একটা কাজ করতে দিচ্ছি কিন্তু বাজেট দিচ্ছি না, পুলিশে একটা কালচার প্রচলিত রয়েছে, সেটা হচ্ছে ‘ম্যানেজ করে নাও’।”
এই ‘ম্যানেজ’ করতে গিয়ে পুলিশ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
২৬ মার্চের কর্মসূচির উদাহরণ টেনে হাসনাত বলেন, প্রশাসনকে যে বাজেট দেওয়া হয়েছিল, বাস্তব খরচ তার চেয়ে বেশি হওয়ায় পুলিশ ব্যবসায়ী এবং এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত মানুষের কাছ থেকে ‘অর্থ উঠিয়েছে’।
তার প্রশ্ন ছিল, পুলিশের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানোর জন্য যথাযথ বাজেট দেওয়া হবে কিনা, যাতে তাদের ‘ম্যানেজ করে নাও’ সংস্কৃতিতে যেতে না হয়।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটা সত্য কথা যে পুলিশের যে পরিমাণ রিসোর্স দরকার, যে পরিমাণ বাজেট দরকার, সেই পরিমাণ আমাদের অর্থনীতি সহ্য করতে পারে না বলেই হয়ত আমরা দিতে পারি না।”
তবে তিনি বলেন, “আমরা একটা ট্রান্সপারেন্ট এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশি ব্যবস্থা যদি কায়েম করতে চাই, পুলিশ যেন অন্য কোনোভাবে ম্যানেজ করার কালচার থেকে বেরিয়ে আসে, সেটা আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে।”
পুলিশ বাহিনীকে ‘আরো বেশি কর্মক্ষম ও ‘দুর্নীতিমুক্ত’ রাখতে বাজেট বাড়ানোর বিষয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান।
তার ভাষায়, “আগামী বাজেট অধিবেশনে পুলিশের বাজেট বৃদ্ধির জন্য আমি একটা প্রস্তাব মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে করে রাখছি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব কথা বলেন টাঙ্গাইল ৭ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর মূল প্রশ্নের পর সম্পূরক প্রশ্নোত্তর পর্বে। মূল প্রশ্নে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চেয়েছিলেন আজাদ।
পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার পুলিশ বাহিনীকে সুশৃঙ্খল ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছে। আধুনিক প্রশিক্ষণ, যানবাহন, যন্ত্রপাতি, সিসি ক্যামেরা, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং অনলাইন জিডি ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের মত কার্যক্রম চলছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বলেন, “জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, মধ্যমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং স্বল্পমেয়াদি বার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।”