Published : 12 Aug 2025, 09:29 PM
জুলাই গণভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চাঁনখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুইজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য গ্রহণ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এরা হলেন শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের সমাজকর্মের সহযোগী অধ্যাপক আঞ্জুয়ারা ইয়াসমিন এবং গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা নিহত মেহেদী হাসান জুনায়েদ ওরফে মুস্তাকিমের বাবা শেখ জামাল হাসান।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ মঙ্গলবার প্রথমে আঞ্জুয়ারা ইয়াসমিনের সাক্ষ্য নেয়।
দুপুরের পর শেখ জামাল হাসানের সাক্ষ্য গ্রহণ করে একই ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর দুই সদস্যের বেঞ্চ।
বেলা ১২টার দিকে আঞ্জুয়ারা ইয়াসমিনের সাক্ষ্য নেওয়া শুরু হয়। তিনি গত বছরের ৫ অগাস্টে তার বাসার ১০ তলার ছাদ থেকে দেখা একটি ঘটনার বিবরণ দেন।
তিনি বলেন, ৫ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। বাসার জানালা খুলে দেখেন পুলিশ টহল দিচ্ছে এবং মানুষকে বলছে–কারফিউ চলছে, কেউ যেন ঘর থেকে বের না হয়।
এরপর বাসার ১০ তলার ছাদে ওঠেন জানিয়ে তিনি বলেন, ওইদিন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছিল। তিনি তার ছাত্রদের ফোন করে জানতে পারেন, তাদের শহীদ মিনারে জমায়েত হতে দিচ্ছে না পুলিশ। ছাদ থেকে তিনি দেখছিলেন ছাত্ররা সবাইকে বাসা থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।
“ওই সময় পুলিশের গাড়ি এলে আন্দোলনকারী ছাত্ররা হোসেনী দালান রোড, নাজিমুদ্দিন রোডসহ আশেপাশে সরে যায়। তখন পুলিশ বিভিন্ন দিকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে দেখতে পাই চানখাঁরপুল নিমতলী বাখরখানি দোকানের সামনে একটি ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেছে।”
তিনি এই ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও করেছেন এবং ভিডিওটি ওই সময় ট্রাইব্যুনালে দেখানো হয়।
এই শিক্ষিকা বলেন, তিনি পরে জানতে পারেন ওইদিন পুলিশের গুলিতে তার কলেজের অনেক ছাত্রছাত্রী আহত হয়েছে।
এ ঘটনার জন্য আঞ্জুয়ারা ইয়াসমিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তৎকালীন পুলিশের মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের বিচার দাবি করেন।
বেলা আড়াইটার দিকে শুরু হয় শেখ জামাল হাসানের সাক্ষ্য।
৫ অগাস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তারা পরিবারের সবাই গেন্ডারিয়ার পৈত্রিক বাসায় ছিলেন। তার পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী সোনিয়া জামাল, মেয়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নাফিসা নাওয়াল (১৮) এবং ছেলে মেহেদী হাসান জুনায়েদ ওরফে মুস্তাকিম (১৪)।
জামাল বলেন, সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে জুনায়েদ তার বন্ধু সিয়ামকে নিয়ে বের হয়ে যায়। তার স্ত্রী ও মেয়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে যায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিতে। তিনি একা বাসায় থেকে যান।
“বেলা ১টা ৪৫ মিনিটে আমার শ্যালক আসিফ মোবাইলে আমাকে জানায়, আমার ছেলে জুনায়েদ চানখাঁর পুলে নবাব কাটারার সামনে মেয়র হানিফ ফ্লাই ওভারের ঢালে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের পিছনের রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
“এটা শুনে আমার বিশ্বাস না হওয়ায় আমি পাশে ধূপখোলা মঠে গিয়ে ছেলের খোঁজ করি। সেখানে না পেয়ে আজগর আলী হাসপাতালে খোঁজ করি। কিন্তু কোথাও পাইনি। পরে ধূপখোলা মাঠে গিয়ে বসে পড়ি।”
তিনি বলেন, ওই সময় তার ভাতিজি শম্পা তাকে ফোন করে বাসায় যেতে বলেন। ওই সময় তিনি কান্নার শব্দ শোনেন। তাড়াতাড়ি বাসায় দিয়ে দেখেন তার ভাই আব্দুর রহমানের ফ্ল্যাটে জুনায়েদের নিথর দেহ পড়ে ছিল। তখনও তার দেহ থেকে রক্ত ঝরছিল।
তার বাম চোখের ওপর গুলি লেগে মাথার পেছনে গর্ত হয়ে বের হয় যায়, বলেন জামাল।
তিনি বলেন, জুনায়েদের বন্ধুদের কাছে শুনেছেন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিয়ামসহ অন্যরা জুনায়েদকে রিকশায় করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে আমি রাস্তায় রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরি। রিয়েল স্টেট কোম্পানিতে একটা চাকরি করতাম, এখন কোনো কাজ করতে পারি না। আমার স্ত্রী পাগলের মতো জীবযাপন করে। মেয়ে তার ভাইয়ের জন্য প্রায় রাতেই ঘুম থেকে জেগে ওঠে চিৎকার দিয়ে।”
তিনি তার ছেলের হত্যার জন্য তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা থানার এডিসি আজহারুল ইসলাম, মো. ইমরুল ও আরশাদসহ সংশ্লিষ্ট সবার শাস্তি দাবি করেন।
সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বুধবার ফের দিন রেখে ট্রাইব্যুনাল দিনের কার্যক্রম শেষ করে।
এদিন এ মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামি শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল মো. সুজন, কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন ও কনস্টেবল নাসিরুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
বাকি চার আসামি ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম এবং রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল পলাতক রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, বি এম সুলতান মাহমুদসহ আরও কয়েকজন প্রসিকিউটর।
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে শোনান বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত ১১ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২৫ মে ফরমাল চার্জ আকারে তা দাখিল করেন।
অভিযোগ আমলে নিয়ে সেদিন ট্রাইব্যুনাল হাবিবুর রহমানসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের দিন ৫ অগাস্ট চাঁনখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থী শহীদ আনাসসহ ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চানখাঁরপুল এলাকায় আসামিরা নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর ‘প্রাণঘাতী’ অস্ত্র ব্যবহার করে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদ, মো ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক এবং মানিক মিয়াকে গুলি করে হত্যা করে।
তদন্ত সংস্থা এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালে তদন্ত সংস্থার দেওয়া এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদনটি ৯০ পৃষ্ঠার। তদন্ত করতে সময় লেগেছে ৬ মাস ১৩ দিন।
তদন্ত প্রতিবেদনে ৭৯ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া ১৯টি ভিডিও, পত্রিকার ১১টি রিপোর্ট, ২টি অডিও, বই ও রিপোর্ট ১১টি এবং ৬টি ডেথ সার্টিফিকেট সংযুক্ত করা হয়েছে।
তাজুল ইসলাম সেদিন বলেন, “এর মধ্যে একটি অডিও কল রয়েছে হাবিবুর রহমানের, যিনি পুলিশ কমান্ড সেন্টার থেকে ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দমাতে চায়নিজ রাইফেল দিয়ে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন পুলিশ সদস্যদের। উনার এই নির্দেশের পরই প্রাণঘাতি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছেন পুলিশ সদস্যরা।”
গত বছরের জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করে বলে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অপরাধের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
পুরনো সংবাদ: