Published : 25 Jun 2026, 03:35 PM
চেক ডিজঅনারের একটি মামলায় আসামি নাসরিন সিকদার সেজে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে এসে ধরা পড়েছেন আরেক নারী।
মনোয়ারা নামের এ নারী দাবি করেন, আইনজীবী তাকে নাসরিন সাজিয়ে আদালতে নিয়ে এসেছেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ তানিয়া সুলতানা লিপির আদালতে এ ঘটনা ঘটে বলে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর কামরুজ্জামান সুমন জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, “মনোয়ারার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।”
২৯ লাখ টাকা চেক ডিজঅনারের অভিযোগে গেল বছরের ২৩ মার্চ নিবেদিতা আহমেদ তুলি নামে একজন সরকারি চাকরিজীবী আদালতে মামলা দায়ের করেন।
মামলার ধার্য দিন ছিল ১৬ জুন। সে দিন আসামি আদালতে হাজির হননি। আদালত আসামির জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। পরবর্তী শুনানির দিন রাখা হয় ২০ অগাস্ট।
তবে বৃহস্পতিবার আসামি নাসরিনের হয়ে মনোয়ারাকে আদালতে হাজির করে জামিন আবেদন করেন আইনজীবী হাম্মাদ এমদাদ হোসাইন।

যেভাবে ধরা পড়েন মনোয়ারা
শুনানিকালে তাকে এজলাসের সামনে ডেকে নেন বিচারক তানিয়া সুলতানা লিপি। এ সময়ে মনোয়ারার মুখে মাক্স পরা ছিল। বিচারক মাক্স খুলতে বলেন। কয়েক দফা বলার পরও মাক্স খুলতে রাজি হননি মনোয়ারা। পরে পুলিশের একজন নারী সদস্য তার মুখ থেকে মাক্স খুলে নেন।
সংশ্লিষ্ট আদালতের অফিস সহায়ক শাহ আলম বলেন, “যার বিরুদ্ধে মামলা তার বাসা গুলশানে। আর মামলা ২৯ লাখ টাকার। মনোয়ারার বেশভূষা দেখে সন্দেহ হয় বিচারকের। স্বামীর নাম, বাবার নাম জানতে চান। স্বামীর নামের জায়গায় বাবার নাম আর বাবার নামের জায়গায় বলেন স্বামীর নাম।”
তিনি বলেন, বিচারক তার কাছে জানতে চান, কত টাকার মামলা। মনোয়ারা বলেন, ৩০ লাখ টাকার।
“বিচারক জানতে চান এত টাকা দিয়ে কি করছেন? মনোয়ারা বলেন, ‘আর কইয়েন না, স্যার’। আপনি তাহলে কেন আসছেন। মনোয়ারা বলেন, ‘মামলা খালাস করতে আসছি’।”
অফিস সহায়ক বলেন, বিচারক তার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলে মনোয়ারা আইনজীবীর চেম্বারে রেখে এসেছেন বলে জানান। তিনি সেখান থেকে পরিচয়পত্র নিয়ে আসার কথা বলেন। তবে বিচারক তাকে যেতে দেননি। মনোয়ারাকে স্বাক্ষর করতে বললেও তিনি দিতে পারেননি, টিপসই দেন। এরই মাঝে এজলাস ছেড়ে বেরিয়ে যান আইনজীবী হাম্মাদ এমদাদ হোসাইন।
পরে বিচারক মনোয়ারাকে আসামির কাঠগড়ায় আটকে রাখার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন।
মনোয়ারা নিজের ছবি দিয়ে নাসরিন সিকদার নামে জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি করেছেন, বলেন অফিস সহায়ক শাহ আলম।
মনোয়ারা যা বলেছেন
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মনোয়ারার কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, কেন তিনি আদালতে এসেছেন। কোনো জবাব না দিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরে সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর কামরুজ্জামান সুমন মনোয়ারার সঙ্গে কথা বলেন। সত্য বললে ন্যায়বিচার পাবেন মর্মে তাকে আশ্বস্ত করেন।
পরে মনোয়ারা বলেন, তার বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে। সূত্রাপুরের কলতাবাজারে পরিবারের সঙ্গে থাকেন। বাসা-বাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি আইনজীবীদের চেম্বার পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন।
মনোয়ারার ভাষ্য, টাকা দেওয়ার কথা বলে আইনজীবী তাকে নিয়ে এসেছেন। এবারই প্রথম এসেছেন বলে দাবি করেন করেন।
কত টাকা দিবে জানতে চাইলে বলেন,"টাকার কথা কয় নাই।"
মনোয়ারা বলেন, “আমার কাজ আছে। আমাকে নিয়ে চলেন ওই আইনজীবীর চেম্বারে। তার চেম্বার আগরবাতি গলিতে (আদালতপাড়া)। অহন লন চেম্বারে যাই।"
সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে চাইলে বলেন, “আর কথা কইয়েন না। মাথা ঘোরে।”
এরপর অঝোরে কাঁদেন মনোয়ারা। বলেন,"আমি কাম করে খাই। আমার ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে বাসায়। আল্লাহর ওয়াস্তে আমারে ছাইড়া দেন। আল্লাহ আপনাদের ভালো করবে।"
যোগাযোগ করা হয় আইনজীবী এমদাদ হোসাইনের সঙ্গে। বিষয়টি জানানোর পর তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। আসামির নাম জানতে চান। আসামির নাম বলা হলে তিনি বলেন, "আমি খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি।"
এরপর ফোন কেটে দেন তিনি।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি বলেন, "ঘটনাটা শুনেছি। মামলার প্রকৃত আসামি নাসরিন সিকদার একজন বাটপার। আওয়ামী লীগের সময়ে মন্ত্রী-এমপিদের নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা প্রতারণা করে নিয়েছে। মামলার পর মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।"
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, নাসরিনের সঙ্গে নিবেদিতা আহমেদ তুলির পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় বিভিন্ন সময় ফ্ল্যাট কেনার জন্য ২৯ লাখ টাকা দেন। এর পরিবর্তে গত বছরের জানুয়ারির ২৭ তারিখ ব্র্যাক ব্যাংকের একটা দেন। পরবতীকে বাদী তার নামে সোনালী ব্যাংকে চেকটা নগদায়নের জন্য জমা দিলে অপর্যাপ্ত তহবিলে ডিজঅনার হয়।