Published : 03 Apr 2026, 11:11 PM
দিন যত গড়ায় পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে গাড়ির লাইন ততই দীর্ঘ হয়। চালকদের অভিযোগ, বেশিরভাগ পাম্পই বন্ধ পাওয়া যায়।
যে পাম্পগুলো নিরবচ্ছিন্ন তেল দিচ্ছে, সেখানে গাড়ির বিরাট লাইন। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তার কোনো ধারণা দিতে পারছেন না পাম্প মালিকেরা।
শুক্রবার ঢাকার বিজয় স্মরণীর ট্রাস্ট পাম্প, আসাদ গেটের সোনার বাংলা ও তালুকদার পাম্প ঘুরে চালকদের মুখে শোনা গেল হতাশা আর কষ্টের কথা।

আসাদগেটের সোনারবাংলা পেট্রোল পাম্প থেকে তেল ভরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কথা হয় গাড়ি চালক মো. শাকিলের সঙ্গে। তার ভাষ্য, ভোর ৫টায় আরও দুটো পাম্প ঘুরে এই পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
গাড়িগুলো মিরপুর সড়ক থেকে উল্টোপাশ দিয়ে লাইন ধরে ছিল। ভোরবেলা তিনি যে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তার লেজ ছিল ইকবাল রোডের মাঠ পর্যন্ত।
সকাল ৮টার দিকে লাইন যখন কিছুটা এগিয়েছে, ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট এসে সেই লাইন ভেঙে দিয়ে ধানমণ্ডির দিকে লাইন ধরতে বলে। এরপর শাকিলের ঠাঁই হয় ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরের মাথায়।
বেলা বাড়তে শুরু করলে গরমে ঘেমে-নেয়ে প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে তেল পেয়েছেন শাকিল।

তিনি বলেন, “সকাল বেলায় আমার গাড়ির মালিকরে কইছি, উনি আমার জন্য নাস্তা নিয়া আসছেন। কিছুক্ষণ এইখানে ছিলেন উনি। আমি বাথরুম সাইরা আসছি। এরপর আবার গাড়ি আগে বাড়ছে।”
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাকিলের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন সোনারবাংলা পাম্পের মোটরসাইকেলের সারি প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা হয়ে মোহাম্মদপুর টাউনহলের কাছাকাছি।
সেন্ট জোসেফ স্কুলের উল্টোদিকের ফুটপাথে বসে ছিলেন মোটরসাইকেল চালক আরাফাত নয়ন। তিনি বলেন, “আমার স্কুটারের ট্যাংকিতে তেল ধরেই আট লিটারের মত। এর মধ্যে ঈদের আগে কেবল একবারই ট্যাংক ফুল করতে পারছি।
“এখন দেড়দিন রিজার্ভে চালিয়ে আজকে সকাল ৭টা বাজে এসে এই লাইনে দাঁড়ালাম। সকালের দিকে একটু বাতাস ছিল। কিন্তু এরপর যে রোদ উঠল, একেবারের ভাজা ভাজা অবস্থা।”
সোনারবাংলা পাম্পে যখন বিরাট লাইন, তখন উল্টো দিকের তালুকদার পাম্পের গাড়ির কিউ লেক রোডের মাঝামাঝি জিয়া উদ্যানের সেতু পর্যন্ত গড়িয়েছে।
মোটরসাইকেলের লাইনও বিরাট লম্বা। রাস্তায় মোটর সাইকেল রেখে গাছের ছায়ায় বসে থাকতে দেখা যায় অনেক চালককে। গাড়ি চালকরাও গাড়ি বন্ধ করে পাশের ফুটপাথে বসে ছিলেন।
কিন্তু তখনও পাম্পে তেল দেওয়া শুরুই হয়নি। পাম্পে তেল পাওয়া যাবে এই আশাতেই এত বিরাট লাইন।

পাম্পের প্রবেশপথে বাঁধা দড়ির মুখে পাওয়া গেল তালুকদার পাম্পের কর্মকর্তা মো. জাবেদকে। তিনি বললেন, বৃহস্পতিবার রাতে তেল শেষ হয়েছে। ডিপোতে লরি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেখানেও অনেক সময় লাগেছে। লরি আসার পর তেল দেওয়া হবে। তবে কখন আসবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই তার কাছেও।
বৃহস্পতিবার রাতে বিজয়সরণির ট্রাস্ট পাম্পের গাড়ির লাইন মহাখালী রেলগেট পর্যন্ত পৌঁছেছিল জানিয়ে গাড়ি চালক আরিফ হাওলাদার বলেন, “সেই রাইত ১টার সময় আইসি। লাইন বিচড়াইতে বিচড়াইতে আইসা খাড়াইলাম মহাখালী রেলগেটের ওইখানে। লাইন আর আগায় না। অনেক ড্রাইভার ঘুমায়ে পড়ছে। আমারও চক্ষু লাইগা আসে, পরে না পাইরা ভাইগ্নারে ডাইকা আনলাম। সেই তেল পাইলাম সকাল ৮টায়।”
মোটরসাইকেল চালক মাসুম বিল্লাহ ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়েই তেজগাঁও সিটি পাম্প থেকে চার লিটার তেল পাওয়ার কথা জানালেন।
তিনি বলেন, “বিকেলে রমনা পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। ৫টার দিকে তেল দেওয়া বন্ধ করে দেয় তারা। এরপর একজনের কাছ থেকে শুনে তেজগাঁওয়ের সিটি ফিলিং স্টেশনে এসে দেখি তেল দিচ্ছে। এখানে ঘণ্টাখানের মধ্যে তেল পাওয়া গেল চার লিটার।”

তেলের এই সংকট কবে কাটবে? বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান রতন বললেন, “এখন আপনারা সরেজমিনে যা দেখছেন, এটা বাস্তবতা। আমরা আর কী বলব। আমাদের কাছে কোনো বাড়তি তথ্য নেই।”
এই সংকট কবে কাটবে, তার কোনো ধারণা আছে কি না জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ী বলেন, “সাপ্লাই না বাড়ালে তো আর হবে না। ২৫টা পাম্পের মধ্যে ১০টা হয়ত তেল পাচ্ছে। আবার পাম্প মালিকরা এখন হোন্ডাওয়ালাদের আতঙ্কে আছে। কখন গণ্ডগোল লাগে, মারামারি হয়- এসব নিয়ে। টানা চাাপের মুখে স্টাফরা চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে। আমার পাম্পেরই (বগুড়ায়) তিনজন স্টাফ চাকরি ছাড়ছে।”
তিনি বলেন, “আমরাও তাকিয়ে আছি কখন যুদ্ধ শেষ হবে। এই টেনশন, অনিশ্চয়তা নিয়ে আমাদেরও দিন কাটছে।”