Published : 18 Nov 2025, 12:11 AM
চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সর্বোচ্চ সাজা পেয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান কামাল। সাজা পেয়েছেন ওই সময়ের আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুনও।
আলোচিত এ রায় ঘোষণায় দিনে আন্দোলনের সময় নিহত সেই ছয়জনের একজনের স্ত্রীর দাবি, এখনও সরকারি ‘জুলাই শহীদের’ তালিকায় তার স্বামীর নামই ওঠেনি।
অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে ডিএনএ পরীক্ষায় তার স্বামীর লাশ শনাক্তও হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। তিনি ট্রাইব্যুনালে গিয়ে মামলায় স্বাক্ষ্যও দিয়ে এসেছেন। তবুও গেজেটে নাম ওঠেনি।
আন্দোলনের সময়কার চাঞ্চল্যকর ৬ জনকে হত্যার পর লাশ ভ্যানে স্তূপ করা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় নিহতদের একজন আবুল হোসেন। তার স্ত্রী লাকী আক্তার ওই ঘটনার পর আলোচিত সেই ভিডিওতে গায়ের জার্সি দেখে তার স্বামীকে শনাক্ত করেছিলেন।
সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকের কাছে তিনি দাবি করেন, প্রায় এক বছর আগে শনাক্ত হলেও স্বামীর লাশ তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এমনকি ‘জুলাই শহীদের’ গেজেটেও ওঠেনি আবুল হোসেনের নাম।
তবে বিষয়টি নজরে আসায় রোববার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল আবুল হোসেনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং তার নাম ‘জুলাই শহীদের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন।
এ নির্দেশের খবর পেয়ে লাকী আক্তার বলছেন, “এইবার হয়তো গেজেটে উঠবো, আমারে আর দৌড়াইতে হইব না।”
ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের যেদিন হাসিনা সরকারের পতন হল সেই ৫ অগাস্ট থেকে নিখোঁজ ছিলেন দিনমজুর আবুল হোসেন। ওই মাসের (অগাস্ট) শেষ দিকে আশুলিয়া থানার পাশে একটি ভ্যানের ওপর পুলিশ সদস্যদের লাশ স্তুপ করার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সেই ভিডিওতে ঢেকে রাখা একটি লাশের বের হয়ে থাকা হাত ও জার্সির রং দেখে সেটিকে আবুল হোসেনের লাশ হিসেবে শনাক্ত করেন তার স্ত্রী লাকী। এরপর কোলের সন্তান নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরে ডিএনএ পরীক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া শেষে ছয় লাশের মধ্যে একটি যে আবুল হোসেনের সেটি সাব্যস্ত করাতে সমর্থ্য হন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আশুলিয়া থানার সামনে আবুলসহ ছয়জনের লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। পরে তাৎক্ষণিক পরিচয় না পাওয়ায় অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে আবুলের লাশ আশুলিয়ার আম বাগান গোরস্থানে দাফন করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৫ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের ৮৩৪ জন ‘শহীদের’ তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করে।
এ তালিকা ধরে অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা করার কথা বলেছিল সরকার। নিহতদের পরিবারগুলোকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা এবং মাসে ২০ হাজার ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় তখন। তবে আবুল হোসেনের স্ত্রী গেজেটে নাম না থাকায় এ আর্থিক সুবিধা এখনও পাননি।

জানুয়ারিতে সবশেষ হওয়া গেজেটে এখন পর্যন্ত এ তালিকায় নাম ওঠেনি আবুল হোসেনের।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তিনজনের রায় ঘোষণার পর রাতে নিহত আবুল হোসেনের স্ত্রী লাকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার হিসেবে ঢাকায় ট্রাইব্যুনালে এসে স্বাক্ষ্য দিয়ে যান লাকী ও তার শ্বাশুড়ী (নিহত আবুলে মা)। সেই সময় উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সঙ্গেও তারা দেখা করেন।
সরকারি ‘শহীদের তালিকায়’ নাম ওঠানো ছাড়া ‘কী করে পরিবারটি স্বাক্ষ্য দিতে এল’ সে কথা তৎকালীন উপদেষ্টা জানতেও চান বলে তুলে ধরেন লাকী।
আবুল হোসেনের স্ত্রী বলছেন, একই সময় তিনি দেখা করেছিলেন তাদের পাশের গ্রামের ছেলে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সঙ্গেও। কিন্তু তবুও গেজেটে নাসম ওঠেনি তার স্বামীর।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে কখনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাপের বাড়িতে আবার কখনও কুমিল্লায় শ্বশুরবাড়িতে দুই সন্তান নিয়ে দিন কাটছে লাকীর।
তিনি বলেন, কুমিল্লা জেলা প্রশাসন থেকে তাদের পরিবারকে দুই লাখ টাকা দিয়েছে। কিন্তু নাম গেজেটভুক্ত না হওয়ায় সরকারি সাহায্য পাচ্ছেন না।
“ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট আইসে গ্যাছে রমজানে। আমতলা কবরস্থানে দাফন করছে সেইটাও আমাগো দেখাইছে। কিন্তু কবরটা বুঝায় দেয়নি। রোববার ট্রাইব্যুনাল আমাগো কাছে লাশ বুঝায় দিতে কইছে, আমরা খবরে দেখছি।”
গেজেটে নাম ওঠানোর বিষয়ে তার অভিযোগ, “ওনারা এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে ঘুরাইতেছে। ওনারা কয় আমরা লেট কইরা ফালাইছি। একেকজনের একেক রকম কথা।”
কারা এ কথা বলছে জানতে চাইলে লাকী বলেন, “ওই যে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, সচিবালয়, ডিসি অফিস, সিভিল সার্জন অফিস সব জায়গায় যাওয়া হইছে। সবাই একই কথা বলে। আবার বলে যে, হবে। হবে হবে বইলা ছয়-সাত মাস ঘুরাইয়া ফালাইছে।
“এখন আমি একটা মহিলা মানুষ দুই বাচ্চা নিয়া আর কত ঘুরি।”
তিনি বলেন, “স্বামী যখন আছিল আশুলিয়ায় ভাড়া ছিলাম। এখনতো স্বামী নাই ভাড়া দিব কে? কুমিল্লায় থাকি শ্বশুরবাড়ি, আবার কখনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাপের বাড়ি। দুইটা গ্রাম পাশাপাশিই। স্বামীহারা একটা মহিলার দুইটা ছোট বাচ্চা নিয়া আর কেমন কাটব বলেন!”
কোলের বাচ্চাকে নিয়ে অনেক বেশি ছোটাছুটির কারণে ছোট শিশুটির বিকাশ ব্যাহত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ছোট বাচ্চাটা ২০ মাস বয়স হইছে। কিন্তু এখনো হাঁটতে পারে না। ওরে নিয়া অনেক ছোটাছুটি করছি না, যখন ওর হাঁটা শেখার সময় আছিল। এখন ওর পাও দুইটা ফালাইতে সমস্যা হয়।”
জুলাই ফাউন্ডেশনে যাওয়ার কথা তুলে ধরে লাকী আক্তার বলছেন, “ওনারা বলছে ‘আমাদের হাতে কোনো কিছু নাই, আপনারা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন’। তারা বলে, মন্ত্রণালয় যদি ক্লিয়ারেন্স দেয় তাহলে তারা কিছু হয়তো দিবে। তবুও ওইখানে সব কাগজপাতি জমা দিয়া আসছি। ওনারা যেভাবে বলছে আমরা সেভাবেই সচিবালয়ে কাগজ জমা দিছি, পরে ডিসি অফিসে ডাকল ওইখানেও কাগজ জমা দিছি। কিন্তু নামটা গেজেট হয় নাই।”
সংবাদমাধ্যমে তার স্বামীর পরিচয় প্রকাশের পর সেই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাসহ অনেকেই তাদের বাসায় এসেছিলেন জানিয়ে লাকী বলেন, “সেই সময়তো অনেকেই আসছিল। কিন্তু এখনতো কেউ নাই।”
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রোববার আবুলের লাশ আশুলিয়ার আমবাগান কবরস্থান থেকে তুলে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছে।
একইসঙ্গে তার নাম জুলাই শহীদদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির নির্দেশও দেয় ট্রাইব্যুনাল।
লাকি আক্তারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ রোববার এই আদেশ দেন বলে সাংবাদিকদের জানান প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম।
লাকী বলেন, “আমি শুরুর থেকে বলতাছি স্বামীর একটা হাড্ডি পাইলেও আমি নিয়া যাবো, কিন্তু প্রসেস করতে করতেই তো এক বছর চলে গেল। তবুও শেষ পর্যন্ত কোর্ট অর্ডার দিছে গতকালকে। এটা ঢাকার ডিসি আমাদের বুঝাই দিব বলে আমাদের বলছে। কোর্ট গেজেটে নামও তুলতে বলছে বলে আমরা খবরে দেখছি।”
ভ্যানে লাশের স্তূপ: জার্সি দেখে নিখোঁজ স্বামীকে শনাক্ত করলেন স্ত্রী