০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

সরকারের তালিকায় থাকলেও জরিপে বাদ পড়েছে বর্মণ ও কোচ জনগোষ্ঠী

উত্তরাঞ্চলের বর্মণদের কাউকে কাউকে জরিপে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।

আয়েন উদ্দীন আয়েন উদ্দীন

রুপক নকরেক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 01 Nov 2026, 10:45 PM

Updated : 01 Nov 2026, 10:45 PM

সরকারি গেজেটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্পষ্ট স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর’ আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ’ থেকে বাদ পড়েছে বর্মণ ও কোচ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ।

এমনকি জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দেওয়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রত্যয়নপত্র দেখানোর পরও দেশের উত্তরাঞ্চলের বর্মণদের কাউকে কাউকে জরিপে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

একদিকে জনগোষ্ঠীর সিংহভাগকে জরিপের বাইরে রাখা, অন্যদিকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিচয় মুছে ‘বাঙালি’ তকমা জুড়ে দেওয়ায় বর্মণদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত জরিপের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়তে যাচ্ছে বর্মণরা।

বিবিএস পরিচালিত এই জরিপের মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয় গত ১ অক্টোবর। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর গণনা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। তবে বর্ধিত এই সময়েও উত্তররাঞ্চলের বর্মণ ও কোচদের অনেক মানুষ গণনার বাইরে রয়ে গেছেন তুলে ধরে জরিপের মেয়াদ প্রয়োজনে আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর আবেদন করেছে বাংলাদেশ কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপে ওই সংগঠনের সভাপতি দিনবন্ধু বর্মণ বলেন, “সরকারি গেজেটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে আমাদের স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও প্রত্যয়নপত্র সংক্রান্ত ভুল বোঝাবুঝি এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক বর্মণ ও কোচ পরিবার এখনও গণনার বাইরে রয়ে গেছে। তাই আমাদের দাবি, জরিপের মেয়াদ প্রয়োজনে আরও অন্তত সপ্তাহখানেক বাড়ানো হোক।

“জরিপের শেষদিন ৩০ অক্টোবর সময় বৃদ্ধির এই অনুরোধ ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ: ২০১৫’-এর প্রকল্প পরিচালক ফারহানা সুলতানার কাছে আবেদন করেছি এবং যার প্রতিলিপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং কর্মকর্তাদেরও পাঠানো হয়েছে।”

বর্মণদের পরিচয় বিতর্ক: ইতিহাস, গেজেট ও বিরোধ

হিন্দু বর্ণপ্রথায় ‘বর্মণ’ বা ‘রায়বর্মণ’ মূলত ক্ষত্রিয় বা যোদ্ধা শ্রেণির একটি সুপরিচিত পদবি। পদবির এই সাদৃশ্যের কারণে কোচ ও রাজবংশী বংশজাত বর্মণদেরও অনেক সময় সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালি হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বর্মণ পদবিধারীরা থাকলেও রাজশাহী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের বর্মণদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে দাবি করে আসছে।

বাংলাদেশ সরকারের ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০’ এবং ২০১৯ সালের সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে স্বীকৃত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকায় ‘বর্মণ’ ও ‘কোচ’—উভয়ের নামই আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রায়শই এই গেজেটের স্পষ্ট ধারা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগত না থাকায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।

এই বিভ্রান্তির পালে নতুন করে হাওয়া দিচ্ছে স্বয়ং আদিবাসী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ। বিশেষ করে এবারের জরিপ থেকে বর্মণদের বাদ পড়ার পেছনে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ফেডারেশনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে; পাশাপাশি বাংলাদেশের আদিবাসীদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদও বর্মণদের গণনার বাইরে রেখে জরিপ পরিচালনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ফেডারেশনের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি জিতেন তির্কি শুরু থেকেই বর্মণদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলছিলেন, “বর্মণ সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ নিজেদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা আদিবাসী হিসেবে দাবি করছেন। কিন্তু ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের বর্মণদের ক্ষেত্রে এই পরিচয় কতটা প্রযোজ্য, তা নিয়ে আমার প্রশ্ন রয়েছে। কেবল গেজেটে নাম থাকা বা প্রত্যয়নপত্র প্রদর্শনের ওপর নির্ভর না করে বর্মণদের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে যাচাই করা উচিত।”

একই সুরে কথা বলেছেন বাংলাদেশ জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক বিভূতী ভূষণ মাহাতো।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্মণদের নিয়ে আমাদের আপত্তির জায়গাটা হচ্ছে, তারা নিজেরাই নিজেদের আদিবাসী বলতে চায়নি বহুকাল। বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের বর্মণদের একটি অংশ অতীতে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতেন না। ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারায় যে সংরক্ষিত আদিবাসী তালিকা ছিল, প্রবীণদের কাছে শুনেছি সেখান থেকে নিজেদের নাম বাতিলের দাবি করেছিল বর্মণরা। বর্তমানে তাদের কেউ কেউ এ পরিচয় গ্রহণ করতে চাইছেন, কিন্তু কেন—তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।”

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও আদিবাসীবিষয়ক গবেষক ফারহা তানজীম তিতিল পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কোচ ও রাজবংশী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ঐতিহাসিকভাবে সনাতন হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে ‘বর্মণ’ পদবি ধারণ করেছিল। এই বর্মণদের মধ্যে কোচ ও রাজবংশীরা মিলেমিশে রয়েছে। আবার বাঙালিদের মধ্যেও ত্রিপুরা রাজ পরিবারের সন্তান বিখ্যাত সংগীতশিল্পী শচীন দেববর্মণ এবং ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণের জেলে সম্প্রদায়ের মানুষও রয়েছেন। ফলে ‘কোচ-বর্মণ-রাজবংশী’ সম্প্রদায় একই নৃতাত্ত্বিক উৎস থেকে এসেছে কি না—তা নিয়ে তাত্ত্বিক সংশয় না থাকলেও বিতর্কের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”

বর্মণদের মধ্যে আত্মপরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণ ব্যাখ্যা করে এই গবেষক আরও বলেন, “১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনে একটি বিশেষ ধারা ছিল—তালিকায় থাকা আদিবাসীরা জেলা প্রশাসকের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো অ-আদিবাসীর কাছে জমি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। তৎকালীন সময়ে এই বিধিনিষেধকে আদিবাসী বর্মণরা নিজেদের জন্য বড় একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখেছিল। তাছাড়া কেউ কেউ নিজেদের বাঙালি হিন্দু পরিচয় দিয়ে একধরনের সামাজিক স্বস্তি পেতে চেয়েছিলেন। দুইয়ে মিলে উত্তরবঙ্গের বর্মণদেরও মধ্যে আত্মপরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। তবে ওই বর্মণদেরই নতুন প্রজন্ম আবার তাদের শিকড়ের কাছে ফিরছে। রাষ্ট্রীয় গেজেটে যেখানে বিষয়টি আইনগতভাবে মীমাংসিত, সেখানে আদিবাসী সংগঠনগুলোর উচিত নতুন করে বিতর্ক উসকে না দিয়ে ইতিবাচক সমাধানে যাওয়া।”

বর্মণদের বসতি নিয়ে বিভ্রান্তি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ীও দেশে সরকারিভাবে স্বীকৃত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ।

চলমান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জরিপের ‘ফুল কাউন্ট জরিপ তথ্যসংগ্রহ নির্দেশিকা’ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫০টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তালিকার ২ নম্বরে রয়েছে ‘কোচ’ এবং ১৫ নম্বরে স্থান পেয়েছে ‘বর্মণ’। সরকারি এই নথিতে বর্মণদের প্রধান বসতি হিসেবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও গাজীপুর এবং কোচদের ক্ষেত্রে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও উত্তরাঞ্চলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও ময়মনসিংহের বর্মণ এবং কোচ জনগোষ্ঠীর মানুষদের জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া এই জরিপে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না।

জরিপ পরিচালনার এই কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠনের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুকান্ত বর্মণ। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির শিক্ষার্থী সুকান্ত বর্মন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জরিপের শুরুটাই হয়েছে চরম ভুলের ওপর ভিত্তি করে। তাদের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বর্মণদের কেবল গারো, কোচ ও হাজং অধ্যুষিত গাজীপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে পাওয়া যাবে। অথচ ২০২২ সালের জনশুমারির আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বলছে—দেশে বসবাসরত মোট ৪৪ হাজার ৬৭১ জন বর্মণের মধ্যে ময়মনসিংহে রয়েছে মাত্র ২ হাজার ৭৩৩ জন এবং ঢাকা বিভাগে (মূলত গাজীপুরে) ৯ হাজার ৮২২ জন। বর্মণদের সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ২১ হাজার ২০৫ জনের বসবাস রাজশাহী বিভাগে এবং ৭ হাজার ৬৪৬ জন বাস করে রংপুর বিভাগে। এছাড়া খুলনায় ২ হাজার ৬১৫ জন, সিলেটে ৪৭২ জন, চট্টগ্রামে ১৭৪ জন এবং বরিশাল বিভাগে ৪ জন বর্মণ রয়েছে। জনশুমারির এই তথ্যকে পাশ কাটিয়ে পরিসংখ্যান ব্যুরো অদ্ভুত নির্দেশনা দেওয়ার কারণেই বর্মণদের গণনার বাইরে ঠেলে দিয়ে মাঠপর্যায়ের জরিপ শেষ করা হয়েছে।”

প্রত্যয়নপত্র থাকার পরেও মিলেছে ‘বাঙালি’ তকমা

উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে রংপুর বিভাগে, জেলা প্রশাসকের (ডিসি) প্রত্যয়নপত্র থাকা সত্ত্বেও বর্মণদের ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ হিসেবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। আর যাদের ডিসির প্রত্যয়নপত্র নেই, তাদের জরিপ থেকে সরাসরি বাদ দেওয়া হয়েছে।

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মেহেরপুর গ্রামের বাসিন্দা জবা রানী বর্মণ নিজেকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য দাবি করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, তার কাছে জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়নপত্র থাকা সত্ত্বেও জরিপ কর্মীরা তাকে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেননি; বরং লিখেছেন ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ বলে।

এ বিষয়ে ওই এলাকার তথ্যসংগ্রহকারী বিসু কিস্কুর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, পরিসংখ্যান ব্যুরোর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ীই এটা করেছেন।

তিনি বলেন, “আমাকে ওপর থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আমি সেভাবেই কাজ করেছি। বলা হয়েছিল—যাদের প্রত্যয়নপত্র নেই, তারা গণনায় আসবে না। আর যাদের প্রত্যয়নপত্র আছে, তাদের গণনায় নিতে হবে। তবে শুধু একটি পরিবার নয়, আমি যত বর্মণের তথ্য পেয়েছি, সবার ক্ষেত্রেই ট্যাবে মন্তব্য হিসেবে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র বদলে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ লিখেছি। এমনটাই আমাদের প্রতি নির্দেশ ছিল।”

মাঠ পর্যায়ে তথ্যসংগ্রহে গাফিলতি

ঠাকুরগাঁও সদরের রাহুল বর্মণ ও রাণীশংকৈলের রতন চন্দ্র বর্মণও অভিযোগ করেন, অন্তর্ভুক্তির নামে কেবল বর্মণদের ক্ষেত্রেই সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রতন চন্দ্র বর্মণ বলেন, “অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রত্যয়নপত্র থাকা বাধ্যতামূলক ছিল না। শুধু আমাদের ক্ষেত্রেই শুরুতেই ডিসির কাগজ দেখতে চাওয়া হয়। যাদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে কাগজ ছিল না, তাদের সরাসরি গণনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।”

এদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চৌটাকী গ্রামে বসবাসরত ১০-১২টি কোচ আদিবাসী পরিবারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ওই এলাকার তথ্যসংগ্রহকারী শাহানাজ পারভীনের কাছে নাম অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ জানিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাননি স্থানীয় কোচ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি অবকাশ রায়।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের পাড়ায় গণনাকারী না আসায় আমরা নিজে থেকেই উনাকে ফোন ও মেসেজ দিই। কিন্তু উনি কোনো উত্তর দেননি।”

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তথ্যসংগ্রহকারী শাহানাজ পারভীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ওই এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করেছিলাম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী লোকজন কোথায় থাকে। স্থানীয়রা যাদের বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা কেবল তাদের তথ্য নিয়েছি। কেউ আমাদের কোচদের কথা বলে দেয়নি।”

সমন্বয়হীনতা ও বিপরীতমুখী বক্তব্য

রংপুর বিভাগীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মেনেই বর্মণদের ক্ষেত্রে প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ হিসেবে তথ্য নেওয়া হয়েছে। তবে এভাবে লেখার ফলে মূল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তালিকা থেকে তারা বাদ পড়বেন কি না—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জরিপ থেকে তথ্য বাদ পড়বে না। তবে জাতিগতভাবে তারা তালিকা থেকে ছিটকে যাবেন কি না, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান বিভাগই স্পষ্ট বলতে পারবে।”

একই ধরনের বক্তব্য দেন পঞ্চগড় জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. এনামুল হক।

তিনি দাবি করেন, “আটোয়ারীতে কথা বলে দেখেছি, বর্মণদের অনেকেই নিজেদের বাঙালি বর্মণ হিসেবে পরিচয় দেন। তাই যাদের ডিসির প্রত্যয়নপত্র ছিল, তাদের ক্ষেত্রে খানা হিসেবে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ না লিখে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ লেখার নির্দেশনা ছিল।”

তবে বিপরীত চিত্র তুলে ধরেন ঠাকুরগাঁও জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ফয়সাল হাসান।

তিনি বলেন, তার জেলায় ডিসির প্রত্যয়নপত্রধারী বর্মণদের সরাসরি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবেই অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা এসেছে এবং সেভাবেই তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

সার্বিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ’ প্রকল্পের পরিচালক ফারহানা সুলতানার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যাদের জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়নপত্র আছে, কোনো ধরনের যাচাই ছাড়াই তাদের জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর যাদের প্রত্যয়নপত্র নেই, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতি মাঠপর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে তবেই নেওয়া হয়েছে।”

অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ছাড় থাকলেও বর্মণদের জন্য প্রত্যয়নপত্রের কড়াকড়ি করা হয়েছে কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রকল্প পরিচালক বলেন, “বর্মণদের মধ্যে কেউ বাঙালি, আবার কেউ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। চাকমা, মারমা বা গারোদের ক্ষেত্রে এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই।”

বিবিএসের নির্দেশিকায় বর্মণদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “তালিকাটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৈরি, বিবিএসের নয়। মাঠপর্যায়ে বর্মণদের নিয়ে কিছু বিতর্ক তৈরি হওয়ায় এই প্রত্যয়নপত্রের শর্ত প্রযোজ্য হয়েছে।”

তবে কোচ জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রত্যয়নপত্রের শর্ত নেই বলে দাবি করেন তিনি।

বর্মণদের দাবির পেছনে সুযোগ সন্ধানের অভিযোগ

বাংলাদেশ কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠনের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুকান্ত বর্মণ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জরিপ চলাকালীন ১৫ অক্টোবর বর্মণদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়ে আমি পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের বরাবর একটি চিঠি দিয়েছিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ অক্টোবর পরিসংখ্যান ব্যুরোতে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। আমি চেয়েছিলাম বর্মণ সম্প্রদায়ের আরও কয়েকজন প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে, কিন্তু প্রকল্প পরিচালক আমার আবেদন নাকচ করে দেন।

“বৈঠকে উপস্থিত পাঁচজন আদিবাসী নেতার প্রত্যেকেই একযোগে বর্মণদের বিপক্ষে অবস্থান নেন। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সরকারি তালিকাতেও নাকি বর্মণদের নাম ভুলবশত এসেছে। আমি বিগত জরিপগুলোর তথ্য, বর্মণদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও জনমিতির সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।”

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ সংক্রান্ত সরকারি জরিপে বর্মণদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিরোধিতা করার কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সভাপতি শিপন চন্দ্র সিং সর্দার।

তার দাবি, “বর্মণদের একটা বড় অংশ নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকার তো করেই না, উল্টো সরকারি গেজেট থেকে নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট পর্যন্ত করেছে। অথচ তাদেরই নতুন প্রজন্ম শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ কোটা সুবিধা পুরোপুরি ভোগ করছে। এই সুবিধা পাওয়ার জন্যই এখন মাঠে নেমেছে।”

‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ’ প্রকল্পের পরিচালক ফারহানা সুলতানার কাছে ওই বৈঠক নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বর্মণদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে অন্য সব নৃগোষ্ঠীর নেতাদের কঠিন আপত্তি রয়েছে।

তিনি বলেন, “বর্মণদের জরিপে আনা নিয়ে তারা শুরু থেকেই জোর আপত্তি জানিয়ে আসছেন এবং বৈঠকে তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তারা এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন যে, বর্মণদের তালিকায় যুক্ত করা হলে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবেন।”

কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠনের জরিপের মেয়াদ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ফারহানা সুলতানা বলেন, “এই বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।”

বর্মণদের জন্য ‘স্ব-স্বীকৃতি’র পথ অনুসরণের পরামর্শ

সরকারি গেজেটে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকায় বর্মণদের মধ্যে যারা জরিপে অংশ নিতে ইচ্ছুক, তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপে তিনি এই সংকট তৈরির জন্য মূলত উত্তরাঞ্চলের বর্মণদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, “গাজীপুরের বর্মণরা নিজেদের আদিবাসী পরিচয় ধরে রাখলেও পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে পরিচয়ের এই দ্বৈততা স্পষ্ট। কোচ ও বর্মণরা আদিবাসী ফোরামের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।”

তাই আত্মপরিচয় নিশ্চিত করতে সম্প্রদায়টির সদস্যদের ফোরামের সঙ্গে যোগাযোগ করার এবং সরকারি জরিপে অংশগ্রহণের অধিকার আদায়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

দিনাজপুর জেলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মানিক সরেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারের ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক তালিকায় কোচ ও বর্মণ উভয় সম্প্রদায়ের নাম স্পষ্টভাবেই রয়েছে। সাঁওতাল, চাকমা কিংবা গারোদের ক্ষেত্রে প্রত্যয়নপত্রের জটিলতা না থাকলে বর্মণদের ক্ষেত্রে তা কেন প্রযোজ্য হবে?”

বর্মণরা অতীতে আত্মপরিচয় নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, তা নিরসনে পরিসংখ্যান ব্যুরো ‘স্ব-স্বীকৃতি’র পথ অনুসরণ করতে পারে বলে মনে করেন মানিক সরেন।

তিনি বলেন, যারা নিজেদের আদিবাসী দাবি করে এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপে অংশগ্রহণ করতে চায়, তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হোক। আর যারা অস্বীকৃতি জানায়, তাদের বাদ রাখা হোক।